kalerkantho


সোনামসজিদ স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানিতে ধস

♦ ছয় মাসে রাজস্ব ঘাটতি ১৪৩ কোটি টাকা
♦ তিন বছর ধরে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না

ইমতিয়ার ফেরদৌস সুইট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



সোনামসজিদ স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানিতে ধস

ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নেমেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দরে। ট্রাক থেকে বেপরোয়া চাঁদাবাজি, বন্দরে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়া, রাজস্ব আদায়ে কড়াকড়িসহ নানা কারণে এই বন্দর ছেড়েছেন আমদানিকারকরা। এ ছাড়া বেনাপোলের চেয়ে এখানকার ওয়্যার হাউস চার্জ বেশি হওয়ায় আমদানি-রপ্তানি দিন দিন কমছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ফলে তিন বছর ধরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না।

ভারতের সঙ্গে সহজ যোগাযোগব্যবস্থার কারণে ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই লাইমলাইটে চলে আসে সোনামসজিদ স্থলবন্দর। এই বন্দরের সঙ্গে ভারতের ফল, পেঁয়াজ ও পাথরের মোকামগুলোর দূরুত্ব সবচেয়ে কম। এ কারণে এসব পণ্য আমদানিতে এই বন্দর ব্যবহার করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন আমদানিকারকরা। রাজস্ব আয়ে বেনাপোল স্থলবন্দরের পরেই সোনামসজিদের অবস্থান হওয়ায় একসময় এই বন্দরকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর হিসেবে ধরা হতো। কিন্তু বর্তমানে সেই সুদিন আর নেই। গত তিন বছরে এই বন্দরে আমদানি-রপ্তানির হার কমেই চলেছে। ফলে রাজস্ব আয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দরের তকমা হারিয়েছে সোনামসজিদ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৪৩ কোটি চার লাখ ১২৮ হাজার টাকা কম রাজস্ব আয় হয়েছে, যা এই বন্দরের জন্য নজিরবিহীন ঘটনা। সোনামসজিদের চেয়ে ছোট বন্দরগুলোর রাজস্ব আয় এখন এখানকার চেয়ে অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

স্থলবন্দর কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এই বন্দরের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩৫ কোটি ২৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। সেখানে রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ৯১ কোটি ৮২ লাখ ২৫ হাজার টাকা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজস্ব কমার প্রধান কারণ ফল আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়া। গত তিন বছরে এই বন্দর দিয়ে ফল আমদানি শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। এ জন্য অবশ্য কাস্টমসের কড়াকড়িকে দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তাঁদের অভিযোগ হিলি, ভোমরাসহ বিভিন্ন স্থলবন্দরে ফল আমদানিতে ১০ শতাংশ পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা হচ্ছে। কিন্তু সোনামসজিদে ১০০ শতাংশ শুল্ক আদায় করছে কাস্টমস। এতে ফল আমদানিকারকরা সোনামসজিদ স্থলবন্দর ছেড়ে ওই সব বন্দর দিয়ে ফল আনছে।

সোনামসজিদ স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, শুধু কাস্টমসের কড়াকড়ির কারণে ফল আমদানি বন্ধ হয়নি। এ ক্ষেত্রে ভারতের কিছু ব্যবসায়ী ও ট্রাক মালিককেও দায়ী করেন তিনি। তাঁরা সিন্ডিকেট করে সোনামসজিদ দিয়ে শুধু পেঁয়াজ ও পাথরের ট্রাক পাঠাচ্ছেন। ফলের ট্রাকগুলোকে তাঁরা অন্য বন্দরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, এই সংকট উত্তরণে ভারতের ব্যবসায়ী ও ট্রাক মালিকদের সঙ্গে তাঁদের আলোচনা চলছে। শিগগিরই সমস্যার সমাধান হবে।

আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক তৌফিকুর রহমান বাবু জানান, যোগাযোগ সুবিধায় ফল ও পাথর আমদানিতে আমদানিকারকদের প্রথম পছন্দ ছিল সোনামসজিদ স্থলবন্দর। কিন্তু ফল ও পচনশীল পণ্য রপ্তানিতেও সিন্ডিকেট করছে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। পরিবহন সংকট তৈরি করে আমদানিকারকদের আমদানি ব্যয় বাড়াচ্ছেন তাঁরা। এতেই কমেছে বন্দর দিয়ে ফলের আমদানি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অভিযোগ করেন সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, বন্দরের বিভিন্ন সংগঠনে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব বিস্তার। শ্রমিক সংগঠন ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন হয় না। রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা এসব প্রতিষ্ঠান দখলে নিয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁদের বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে অতীষ্ঠ আমদানিকারকরা।

সোনামসজিদ স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুনুর রশিদ বন্দরে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ফলসহ পচনশীল সব ধরনের পণ্য আমদানিতে আগে ১০ শতাংশ শুল্ক ছাড় পেতেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এই বন্দরে তিন বছর ধরে এই সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছে কাস্টমস।



মন্তব্য