kalerkantho


‘করভীতি’ কাটছে মেলায়

সহজ সেবায় প্রতিবছর অংশগ্রহণ বাড়ছে

ফারজানা লাবনী   

১৫ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



‘করভীতি’ কাটছে মেলায়

স্বল্প সময়ে ভোগান্তিমুক্তভাবে কর দিতে আগ্রহী সেবাগ্রহীতাদের কাছে আয়কর মেলা যেন উৎসব। ছবি : শেখ হাসান

রাজস্ব কর্মকর্তা আর করদাতার ভয়-আতঙ্ক আর লুকোচুরির সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে আয়কর মেলা। আয়কর মেলায় রাজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হাসি মুখে করদাতাদের সেবা দিচ্ছেন। আর করদাতারাও এ সেবা পেয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্মকর্তারা প্রতিবছর সেবার মান বাড়িয়ে চলেছেন। তাই মেলা থেকে সেবা নিয়ে যাওয়া বেশির ভাগ করদাতা নিজে আবারও রাজস্ব সেবা নিতে মেলায় আসছেন। পরিচিতজনদের আসতে পরামর্শ দিচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। রাজধানীর বেইলি বোডের অফিসার্স ক্লাবে এনবিআর আয়োজিত আয়কর মেলার দ্বিতীয় দিনে এমনটাই জানালেন সেবাদাতা ও গ্রহীতারা। মিরপুর ১০ নম্বর থেকে আসা রাফিয়া খাতুন মেলা শুরুর ৪০ মিনিট আগেই মেলায় এসেছেন। তিনি নির্ধারিত বুথের সামনে লম্বা লাইনে সবার সমানে দাঁড়িয়ে মেলা শুরুর অপেক্ষায় আছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার ছোট একটি ব্যবসা আছে। প্রতিবছর মেলায় এসে রিটার্ন দিয়ে থাকি। ভিড় বেড়ে গেলে সময় লাগতে পারবে। তাই সকাল সকাল এসেছি।’

রাজধানীর বাড্ডা থেকে আসা আরেক করদাতা সুমিত পাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ও আমার স্ত্রী দুজনই অবসরে আছি। মেলা শুরুর আগেই আমরা চলে এসেছি। কারণ পরে বেশি মানুষ এলে ভিড় বেড়ে গেলে রিটার্ন জমার কাজ সারতে সময় বেশি লাগবে। মেলায় বুথে যাঁরা কাজ করেন তাঁরা আন্তরিকতার সঙ্গে সহযোগিতা করেন। তাই কাজ সারতে বেশি সময় লাগে না।’

এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, আগ্রহী করদাতাদের অংশগ্রহণ প্রতিবছর বাড়ছে। ২০১০ সালে প্রথমবারের আয়কর মেলায় ৬০ হাজার ৫১২ জন মানুষ সেবা নিতে আসেন। তার পরের বছর ২০১১ সালে আয়কর মেলায় সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বেড়ে ৭৫ হাজার ১২০ জন হয়। এর পরের বছর এ সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে লাখে পৌঁছায়। ২০১২ সালে তিন লাখ ৪৬ হাজার ৮৬৭ জন, ২০১৩ সালে পাঁচ লাখ ১০ হাজার ১৪৫ জন, ২০১৪ সালে ছয় লাখ ৪৯ হাজার ১৮৫ জন, ২০১৫ সালে সাত লাখ ৫৭ হাজার ৭৫৪ জন, ২০১৬ সালে ৯ লাখ ২৮ হাজার ৯৭৩ জন আয়কর মেলায় এসে রাজস্ব সেবা গ্রহণ করেন। গত বছর এ সংখ্যা বেড়ে হয় ১১ লাখ। এনবিআরসংশ্লিষ্টরা দাবি করেন, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবারের আয়কর মেলায় সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বেশি হবে।

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আয়কর মেলায় করদাতারা একই জায়গায় অতি দ্রুত সব ধরনের রাজস্ব সেবা পেয়ে থাকেন। একজন সেবা নিয়ে যাওয়ার পর তার পরিচিতজনদের পাঠাচ্ছেন। এনবিআর থেকেও আয়কর মেলাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে আয়োজন করে থাকে। এভাবে প্রচার ও প্রসার দুটিই বেড়েছে।’

তিনি বলেন, এনবিআর ও করদাতা উভয় পক্ষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে আয়কর মেলা সফল। আশা করছি, এবারের মেলায় আসা সেবাগ্রহীতার সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। 

মেলা ঘুরে দেখা যায়, মেলায় প্রবেশের রাজস্ব কর্মকর্তা ও স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় করদাতারা রিটার্ন ফরম পূরণ, কর পরিশোধ শেষে রিটার্ন জমা দিচ্ছি। রিটার্ন জমার অল্প সময়ের মধ্যে করদাতাকে আয়কর পরিশোধের সনদ দেওয়া হচ্ছে। গত বছর আয়কর মেলায় কর দিলেই ‘ইনকাম ট্যাক্স আইডি কার্ড’ দেওয়া হয়। এ কার্ড প্রদান করদাতাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেললেও এবারে তা দেওয়া হচ্ছে না। করদাতাদের অনেকে এনবিআর কর্মকর্তা ও স্বেচ্ছাসেবকদের কাছে এবারে কেন এ কার্ড দেওয়া হচ্ছে না তা জানতে চাচ্ছেন। বিশেষভাবে তরুণ করদাতাদের এ বিষয়ে আগ্রহ বেশি।

এনবিআর সদস্য কানন কুমার কালের কণ্ঠকে জানান, ‘এবারের আয়কর মেলায় ইনকাম ট্যাক্স আইডি কার্ড দেওয়া হচ্ছে না। বিগত দিনের ধারাবাহিকতায় শুধু আয়কর পরিশোধের সনদপত্র দেওয়া হচ্ছে। এ সনদপত্র হবে কর পরিশোধের প্রমাণপত্র।’ 

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কর প্রদানে সাধারণ করদাতাদের উৎসাহিত করতে ইনকাম ট্যাক্স আইডি কার্ড প্রদানের মতো চমক দেওয়া যেতে পারে। শুধু ইনকাম ট্যাক্স আইডি কার্ড নয়, বিভিন্ন ধরনের চমকে অনেক সময় করদাতারা উৎসাহী হয়ে কর প্রদানে এগিয়ে আসেন।’

মেলায় রিটার্ন জমা দিতে আসা তরুণ ব্যবসায়ী হাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এবারে প্রথম রিটার্ন দাখিল করতে এসেছি। গত বছর আমার পরিচিত অনেকে রিটার্ন জমা দিয়ে ইনকাম ট্যাক্স আইডি কার্ড নিয়েছে। আমারও আশা ছিল রিটার্ন দিলে আমি এবারে পাব। কিন্তু মেলায় এসে দেখলাম এবারে দেওয়া হচ্ছে না।’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাধারণ মানুষ কর দিতে চায়, আয়কর মেলায় আসা করদাতাদের সংখ্যা এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে কর প্রদানের পরিবেশ সুন্দর এবং ভোগান্তিমুক্ত হতে হবে, যা অধিকাংশ সময়ে করদাতারা কর অঞ্চলে পাচ্ছে না। কিন্তু মেলায় পাচ্ছে। তাই কর অঞ্চলে না গিয়ে মেলায় আসছে। মেলার পরিবেশ কর অঞ্চলে বজায় রাখা সম্ভব হলে করদাতারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেখানেও যাবে।’



মন্তব্য