kalerkantho


১০ ধরনের সেবা মিলছে আয়কর মেলায়

কম সময়ে সহজে কর পরিশোধ

ফারজানা লাবনী   

১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



কম সময়ে সহজে কর পরিশোধ

রাজধানীতে আয়কর মেলার প্রথম দিনে গতকাল সেবাগ্রহীতাদের স্বতস্ফূর্ত উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যণীয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর অফিসার্স ক্লাব চত্বরে বড় বড় তাঁবু টানানো আছে। এসব তাঁবুতে এবং ক্লাব ভবনের মধ্যে সারি সারি বুথে রাজস্ব কর্মকর্তারা সেবা প্রদান করছেন। কর পরিশোধের জন্য এখানে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের বুথ আছে। মেলায় আগতদের প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানে এবং বিভিন্ন বুথে পৌঁছে দিতে ব্যস্ত স্বেচ্ছাসেবকরা।

তরুণ চাকরিজীবী জাহেদুর রহমান ক্লাবের প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করে খানিকটা এগোতেই কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবককে দেখতে পান। তাঁদের একজনের কাছে গিয়ে নিজের কর অঞ্চল এবং কর সার্কেল জানিয়ে কোন বুথে যাবেন তা জানতে চান। স্বেচ্ছাসেবকরা তাঁকে একটি বুথের সামনে লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে চলে যান। ২০ মিনিট অপেক্ষার পর তিনি বুথের সামনে হাজির হন। রিটার্ন দাখিল করতে এসেছেন জানালে রাজস্ব কর্মকর্তাদের একজন রিটার্ন ফরম নিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে বলেন। রাজস্ব কর্মকর্তা ফরমটি পূরণ করে জাহেদুর রহমানের হাতে দিয়ে মেলা প্রাঙ্গণে অবস্থিত ব্যাংকের বুথে যেতে বলেন। লাইনে দাঁড়িয়ে করের অর্থ পরিশোধ করেন। পে-অর্ডার নিয়ে আরেক বুথে রিটার্ন জমা দেওয়ার মিনিট পনেরোর মধ্যে সেখানে উপস্থিত রাজস্ব কর্মকর্তারা জাহেদুর রহমানকে আয়কর পরিশোধের সনদপত্র দেন।

আয়কর মেলাতে এক ঘণ্টা ৩৫ মিনিটে রিটার্ন ফরম পূরণ, কর পরিশোধ এবং রিটার্ন জমা দিয়েছেন জানিয়ে জাহেদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চাকরি পাওয়ার পর এবারে জীবনের প্রথম রিটার্ন দাখিল করলাম। আয়কর মেলাতে রাজস্ব কর্মকর্তা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় এ কাজ করতে পেরেছি। এখানে সহযোগিতা পেয়ে আমি সন্তুষ্ট। আগামীতেও আমি আয়কর মেলাতে রিটার্ন দাখিল করব।’

রিটার্ন জমা শেষে ব্যবসায়ী হামিদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কর সার্কেলে গিয়ে রিটার্ন জমা দিতে হলে আরেক জায়গায় ব্যাংকে গিয়ে কর পরিশোধ করতে হয়। এতে অনেক সময় লাগে। এসব ভোগান্তি এড়াতে নিজস্ব আইনজীবী পাঠাতাম। তাঁকে ফি দিতে হতো। এসব ঝামেলা এড়াতে আয়কর মেলায় নিজে এসে রাজস্ব কর্মকর্তা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় রিটার্ন দাখিল করি।’

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বেইলী রোডের অফিসার্স ক্লাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয়োজিত আয়কর মেলার প্রথম দিন রিটার্ন দাখিল করতে এসে অনেকে তাঁদের সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন।

প্রধান অতিথি হিসেবে সাত দিনের এ মেলার উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া।     

রাজধানীতে সরেজমিনে দেখা যায়, আয়কর মেলা শুরুর নির্ধারিত সময় ছিল সকাল ১০টা। কিন্তু মেলার প্রথম দিনেই অনেক করদাতা সকাল ৯টার আগে মেলা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন। নির্দিষ্ট বুথের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে তাঁরা মেলার কার্যক্রম শুরুর অপেক্ষায় থাকেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ও বাড়তে থাকে। সারি সারি বুথের ওপরে লেখা আছে কোথায় কী সেবা দেওয়া হচ্ছে। বুথে সেবা দিতে রয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক ও রাজস্ব কর্মকর্তারা। তাঁদের সহযোগিতা নিয়ে করদাতারা সহজে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে পারছেন। মেলায় অনলাইনেও রিটার্ন দাখিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ জন্য করদাতাদের ইউজার আইডি এবং পাসওয়ার্ড দেওয়া হচ্ছে। এই ইউজার আইডি এবং পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে মেলায় নির্ধারিত বুথে গিয়ে রিটার্ন পূরণ, কর পরিশোধ এবং রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন তাঁরা। ভবিষ্যতেও এ ইউজার আইডি এবং পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে যেকোনো করদাতা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসে রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন। এবারে পুরনো পদ্ধতিতে হাতে লিখে রিটার্ন পূরণ করে ই-পেমেন্টেও কর পরিশোধ করা যাচ্ছে। মেলায় হঠাৎ অসুস্থ হলে এখানে চিকিৎসা নেওয়া যাবে। নামাজের ব্যবস্থা আছে। এখানে বিভিন্ন ধরনের খাবার বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিনা মূল্যে মেলায় প্রবেশ করা যাবে।

এবারের আয়কর মেলায় করদাতাদের ১০ ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো—আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন জমা, রিটার্ন জমার জন্য কর অঞ্চলভিত্তিক আলাদা বুথ, নতুন ইলেকট্রনিক কর শনাক্তকরণ নম্বর (ইটিআইএন), পুরনো টিআইএনের বদলে নতুন ইটিআইএন দেওয়া, কর পরিশোধে ই-পেমেন্টের সুযোগ, মুক্তিযোদ্ধা, নারী, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ করদাতার জন্য আলাদা বুথ, সোনালী, জনতা ও বেসিক ব্যাংকের বুথের মাধ্যমে কর পরিশোধের সুযোগ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (ইআরডি) বিভিন্ন সংস্থার তথ্য জানার জন্য আলাদা বুথ, মেলা প্রাঙ্গণে আয়কর রিটার্ন, ইটিআইএন আবেদন ফরম ও চালান ফরম সরবরাহ করা হবে, করদাতার জন্য সহায়তা কেন্দ্র এবং ফটোকপি সুবিধা আছে। এবারের মেলায় কর বিষয়ক সব ধরনের সেবার পাশাপাশি অডিও ভিজ্যুয়াল পদ্ধতিতে করদাতাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও আছে।

রাজধানীসহ দেশের সব বিভাগীয় শহরে গতকাল ১৩ নভেম্বর শুরু হওয়া সপ্তাহব্যাপী এই মেলা হবে। এ ছাড়া সব জেলা শহরে চার দিন কর মেলা হবে। এ ছাড়া ৩২টি উপজেলায় দুই দিন করে এবং এর বাইরে যেসব উপজেলা পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ভালো এমন ৬৮ উপজেলায় বা গ্রোথ সেন্টারে এক দিন মেলা হবে।

গতকাল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, জনগণকে আরো বেশি সেবা দিতে সরকারকে আয় বাড়াতে হবে। দেশে গত কয়েক বছরে করদাতার সংখ্যা বেড়েছে। তবে এ সংখ্যা যথেষ্ট নয়। ১৬ কোটি মাসুষের এই দেশে এ সংখ্যা অনেক কম। করদাতার সংখ্যা বাড়লে জনগণের ওপর করের ভার কমবে।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আয়কর মেলায় জনগণ উৎসাহ নিয়ে কর দিচ্ছে, রিটার্ন দাখিল করছে। রাজস্ব কর্মকর্তারা এখানে যেভাবে আন্তরিকতা নিয়ে সেবা দিচ্ছেন একই সেবা রাজস্ব দপ্তরেও দিতে হবে। তিনি বলেন, এনবিআরের সেবার মানে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। মান আরো বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এনবিআর প্রযুক্তিনির্ভরতায় সেবা প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করছে।

‘উন্নয়ন ও উত্তরণ, আয়করের অর্জন’—এ স্লোগান সামনে রেখে আয়কর মেলার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘আয়কর প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচার ও ধারাবাহিক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ।



মন্তব্য