kalerkantho


এক যুগ পর বিশ্বব্যাংকের বাজেট সহায়তা

আরিফুর রহমান   

৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



এক যুগ পর বিশ্বব্যাংকের বাজেট সহায়তা

এক যুগ পর মিলছে বহুজাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংকের বাজেট সহায়তা। অনেক দেনদরবারের পর শর্তসাপেক্ষে সংস্থাটির কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৭৫ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ছয় হাজার ২২৫ কোটি টাকা। বুধবার ঢাকাস্থ বিশ্বব্যাংকের কার্যালয়ে বাজেট সহায়তা নিয়ে সরকার ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে সমঝোতা হয়। তবে এক সঙ্গে নয়; তিন ধাপে মিলবে এই ঋণ।

প্রথম ধাপে দেওয়া হবে ২৫ কোটি বা দুই হাজার ৭৫ কোটি টাকা; যা আগামী ডিসেম্বরে সংস্থাটির বোর্ড সভায় অনুমোদনের কথা রয়েছে। পরের দুই ধাপে দেওয়া হবে ৫০ কোটি ডলার। এই ঋণ দিয়ে সরকার স্বাধীনভাবে অগ্রাধিকার খাতে খরচ করতে পারবে। যাতে কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না বিশ্বব্যাংকের। তবে এই টাকা পেতে বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে সরকারকে। এর আগে বিএনপি সরকারের আমলে সর্বশেষ ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা বাবদ ৩০ কোটি ডলার পেয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর গত ১২ বছরে অনেক অনুরোধ করা হলেও বাজেট সহায়তা বাবদ আর ঋণ মেলেনি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বাজেট সহায়তা বাবদ ৭৫ কোটি ডলার পাওয়ার আগে সরকারকে বেশ কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে। সেগুলো হলো ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা। অর্থাৎ একই ছাদের নিচে সব সেবা যাতে ব্যবসায়ীরা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীদের কর্মপরিবেশ উন্নত করতে ডে কেয়ার আইন চালু করতে হবে। শ্রম আইন ও কাস্টমস আইন সংশোধন করতে হবে। প্রতিবছর বাজেটে জলবায়ু তহবিলে কত টাকা রাখা হয়, সেটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা। ন্যাশনাল স্কিলড ডেভেলপমেন্ট অ্যাক্ট চালু করা। বিশ্বব্যাংকের দেওয়া এসব শর্ত মেনে নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, শর্তগুলো পূরণে কাজ চলছে। কয়েকটি শর্ত এরই মধ্যে পূরণও করা হয়েছে। বাকিগুলো শিগগিরই পূরণ করা সম্ভব হবে।

জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আজিজুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন বিশ্বব্যাংক আমাদের বাজেট সহায়তা দেওয়া স্থগিত রেখেছিল। তবে এবার তারা বাজেট সহায়তা বাবদ ৭৫ কোটি ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে। এই ঋণ পেতে আমাদের শ্রম আইন, ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু, ডে কেয়ার আইনসহ বেশ কিছু নীতি কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। আমরা এরই মধ্যে নীতি সংস্কারের কাজ শুরু করেছি।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের এই টাকা আমরা নির্দিষ্ট কোনো খাতে খরচ করব না। যেকোনো খাতেই খরচ করতে পারব। এতে তাদের কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না।’

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার কাছ থেকে বাজেট সহায়তা নেওয়া হয়, সরকার নিজের প্রয়োজনে অগ্রাধিকার খাতে ইচ্ছা অনুযায়ী খরচ করার জন্য। প্রকল্পভিত্তিক যে টাকা নেওয়া হয়, তা শুধু ওই প্রকল্পেই খরচ করতে হয়। সেখানে সরকারের কোনো স্বাধীনতা থাকে না। এবার বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে যে বাজেট সহায়তা পাওয়া যাবে, তা বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে নীতি কৌশল প্রণয়নে খরচ হবে। বিশ্বব্যাংকের ঋণ সরাসরি চলে যাবে সংযুক্তি তহবিলে। সেখান থেকে সরকার যখন চাইবে, তখনই টাকা খরচ করতে পারবে। বিশ্বব্যাংকের এই ঋণের সুদের হার হবে ২ শতাংশ। পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ৩০ বছরে বাংলাদেশ এই ঋণ পরিশোধ করতে পারবে।

বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে প্রথম মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা পাওয়ার জন্য চিঠি দেয়। কিন্তু সংস্থাটির তরফ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালে পদ্মা সেতুতে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার পর আর বাজেট সহায়তা নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর আবার আলোচনায় উঠে আসে বাজেট সহায়তার বিষয়টি। গত বছর ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক-আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভায় বিষয়টি আবার আলোচনায় উঠে আসে। এ বছর সংস্থাটির এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যানট ডিক্সন ঢাকা সফরে এসে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে বৈঠকেও বাজেট সহায়তা নিয়ে আলোচনা করেন। দুই পক্ষের নানা আলোচনার পর অবশেষে বাজেট সহায়তা বাবদ ৭৫ কোটি ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের বাজেট সহায়তার ছয় হাজার ২২৫ কোটি টাকা কোথায় খরচ হবে এমন প্রশ্নে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মূলত নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে এই টাকা খরচ হবে। তাঁরা বলেছেন, বাংলাদেশ এখন জনসংখ্যার বোনাসকাল ভোগ করছে। দেশে এখন ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা ছয় কোটির বেশি। এরা কর্মক্ষম। কর্মক্ষম মানুষের কর্মসংস্থান তৈরিতে খরচ হবে বিশ্বব্যাংকের এই ঋণ।

এদিকে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বরাবর একটি চিঠি পাঠিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ১ নভেম্বর সংস্থাটির সদর দপ্তরে পাঠানো ওই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, দারিদ্র্য বিমোচনে গত এক দশকে বাংলাদেশ অসাধারণ সফলতা অর্জন করেছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাওয়ার যে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়, বাংলাদেশ তা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচন, জিডিপির প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স, রিজার্ভসহ অর্থনৈতিক বিভিন্ন সূচকের অগ্রগতি তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দেশে চাকরির বাজারে প্রতিবছর ২০ লাখ তরুণ ঢুকছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের অভ্যন্তরে অভিবাসীর সংখ্যা বাড়ছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়লেও এখানে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হারের গতি শ্লথ। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে শুধু পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে থাকলে হবে না, রপ্তানিতে পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে হবে। নতুন নতুন পণ্য তৈরি করে তা বিদেশে পাঠাতে হবে। আমাদের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ আরো উন্নত করতে হবে। চিঠিতে অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ব্যবসা পরিবেশ সূচকে উন্নতি করতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু সংস্কারকাজে হাত দিয়েছে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে আরো অর্থায়ন দরকার। বিশ্বব্যাংকের বাজেট সহায়তার ৭৫ কোটি ডলার ঋণ মিললে দুই কোটি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে। ভবিষ্যতে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।



মন্তব্য