kalerkantho


নতুন জাহাজে পণ্য পরিবহন বেড়েছে

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

২১ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



নতুন জাহাজে পণ্য পরিবহন বেড়েছে

পণ্যবাহী যেসব বিদেশি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে ভেড়ে সেগুলো মানসম্পন্ন কি না, তা এত দিন যাচাই করা হতো না। ফলে ২৫ থেকে ৩০ বছরের পুরনো জাহাজ অনায়াসে পণ্য নিয়ে জেটিতে ঢোকার সুযোগ পেত। এসব জাহাজের পুরনো যন্ত্রপাতির কারণে বন্দরে পণ্য ওঠানামার দক্ষতা কম থাকত; এতে জাহাজ দুর্ঘটনার কবলে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতো। বন্দরের প্রবেশপথ বা চ্যানেল অচলের শঙ্কা থাকত।

কয়েক বছর ধরে এসব জাহাজ জেটিতে ভেড়ার পর তদারক করছে সরকারের নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তর। এতে বেশ সুফলও মিলেছে। পুরনো জাহাজ আসা অনেক কমেছে, বেড়েছে নতুন জাহাজ আসার হার। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে।

নৌ বাণিজ্য দপ্তর বলছে, গত তিন বছরে মানসম্পন্ন নয় এমন সাতটি পণ্যবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসার পর আটক করা হয়েছে; এসব জাহাজ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলার উপযোগী নয়। দপ্তরের হিসাবে, ২০১৫ সালে এ ধরনের জাহাজ আটকের সংখ্যা ছিল পাঁচটি, ২০১৬ সালে একটি, ২০১৭ সালে একটি এবং ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আটক হয়েছে একটি। তদারকির কারণে এ ধরনের নিম্নমানের জাহাজ আসা কমার প্রমাণ মিলছে উক্ত তথ্যে।

সর্বশেষ তদারকি করতে গিয়ে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ২২ বছরের পুরনো একটি কনটেইনার জাহাজ ‘পল আবরাও’ আটক করেছে নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তর। ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজটি আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার নিয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর বন্দরের এনসিটি টার্মিনালে ভেড়ে। যাচাইয়ের পর মানসম্পন্ন না হওয়ায় জাহাজটি আটক করা হয়। যদিও রপ্তানিকারকের সুবিধার্থে পণ্য নামানোর জন্য জাহাজটিকে শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

জাহাজের জরিপ কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ফয়সল আজিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জরিপের পর দেখা গেছে জাহাজটিতে তেল নিঃসরণ হচ্ছে, যা সমুদ্রের পরিবেশের জন্য চরম ক্ষতিকারক। জাহাজের হ্যাজকাভার সঠিক ছিল না। জাহাজের ব্যবস্থাপনাও মানসম্পন্ন ছিল না। সব মিলিয়ে জাহাজটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন না থাকায় আটক করা হয়।’

চট্টগ্রাম বন্দরে আসা পণ্যবাহী সব জাহাজে এই নজরদারির সক্ষমতা আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সব জাহাজকে আমরা তদারক করি না আবার করাও যায় না। ‘ইন্ডিয়ান ওশান এমওইউ’ অনুযায়ী যেসব জাহাজের বিভিন্ন ত্রুটি আছে শুধু সেগুলোই আমরা নজরদারি করি। মূলত চট্টগ্রাম বন্দরে ভালো মানের জাহাজ আসা নিশ্চিত করতে এই নজরদারি করা হচ্ছে।”

চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে ১৩ সেপ্টেম্বর জাহাজ ভেড়ার তালিকা পর্যালোচনা করে নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের তথ্যের সত্যতা মিলেছে। ওই দিন বন্দর জেটিতে থাকা ১৭টি জাহাজের মধ্যে চারটি ছিল খোলা পণ্যের জাহাজ, বাকিগুলো ছিল কনটেইনার জাহাজ। কনটেইনার জাহাজের ‘ওইএল বাংলাদেশ’ জাহাজই শুধু ১৯৯৫ সালের তৈরি অর্থাত্ ২৩ বছরের পুরনো। আর সাধারণ কার্গো জাহাজের মধ্যে ‘গ্রেট রয়েল’ হচ্ছে ২৪ বছরের পুরনো। এ ছাড়া চারটি জাহাজ ১৯ বছরের পুরনো, ৯ বছর বয়সী জাহাজ রয়েছে তিনটি, ছয় বছর বয়সী জাহাজ আছে একটি, পাঁচ বছর বয়সী দুটি, চার বছরের একটি, ২০১৭ সালের সর্বশেষ তৈরি নতুন দুটি জাহাজও পণ্য নিয়ে ভিড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে।

নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তদারকির ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে মানসম্পন্ন জাহাজ আসা বেড়েছে। বন্দরে আসা সব জাহাজের দলিল আমরা তদারক করতে পারি ঠিকই; কিন্তু লোকবলের অভাবে সশরীরে সব জাহাজে গিয়ে তদারক করা যায় না।’

তিনি বলেন, ‘তিনজন সার্ভেয়ার দিয়ে আমরা সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ জাহাজ অনেক কষ্টে তদারক করতে পারি। এখন দেশে বন্দরের সংখ্যা বেড়েছে তাই জাহাজের সংখ্যাও বাড়ছে, এ জন্য আমাদের দরকার ১২ থেকে ১৫ জন জরিপকারক। ১৯৮২ সালে অর্গানোগ্রামে ৫০০ থেকে ৬০০ জাহাজের জন্য যে জরিপকারক ছিল, জাহাজের সংখ্যা প্রায় চার হাজার হওয়ার পরও সেই সংখ্যা একই।’

চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান কমোডর জুলফিকার আজিজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন অধিক পুরনো জাহাজ বন্দরে ভেড়ে না। এক বছর আগে তৈরি সম্পূর্ণ নতুন জাহাজও এখন পণ্য নিয়ে জেটিতে ভিড়ছে। নতুন জাহাজ আসা শতভাগ নিশ্চিত করতে পারলে বন্দরের পণ্য ওঠানামার গতি আরো বাড়ত। বন্দরের প্রবেশপথ নিরাপদ থাকত, দুর্ঘটনা বা জাহাজ বিকলের হার একেবারে কমানো যেত।’

নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের তদারকির পরও কিছু আমদানিকারক কম দামে পণ্য পরিবহন করতে পুরনো জাহাজ ভাড়া করে থাকেন। কম দামে জাহাজ ভাড়া করে চট্টগ্রামে এনে পণ্য খালাস করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই তারা বিপদে পড়ে এবং আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়।



মন্তব্য