kalerkantho


নিষ্ক্রিয় সদস্যরা ‘বিষফোড়া’

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

১৮ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



নিষ্ক্রিয় সদস্যরা ‘বিষফোড়া’

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন হাজার ২০৯ কোটি টাকার লেনদেন করেছে লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ লিমিটেড। সিএসইর সদ্যোঘোষিত ৫ শতাংশ লভ্যাংশ অনুযায়ী, সিএসইর সদস্য হিসেবে লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ মুনাফা পাবে ২১ লাখ টাকা। একই বছরে মাত্র এক হাজার ছয় টাকা লেনদেন করেই সিএসই সদস্য হিসেবে নরবান সিকিউরিটিজ লিমিটেডও পাবে লভ্যাংশের ২১ লাখ টাকা। নরবানের মতো সিএসইর ১৪৮ সদস্যের অধিকাংশ সিএসইতে প্রায় লেনদেন করে না বললেই চলে। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পুঁজিবাজারের মার্কেট শেয়ারে দিন দিন তলানিতে যাচ্ছে সিএসইর অবস্থান। সিএসইর লেনদেনে কোনো ধরনের অবদান না রেখে ডি-মিউচুয়ালাইজেশন (ব্যবস্থাপনা থেকে মালিকানা পৃথক্করণ) সুবিধা নিয়ে ঠিকই বছর শেষে মোটা অঙ্কের লভ্যাংশ পকেটে পুরছে এই নিষ্ক্রিয় সদস্যরা।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পুঁজিবাজারটিকে সচল রাখতে নতুন ট্রেকহোল্ডার নিয়োগ এবং নিষ্ক্রিয়দের বাদ দিতে গেলে জোট বেঁধে সে পদক্ষেপও ঠেকিয়ে দিচ্ছে তারা। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) হস্তক্ষেপ চেয়ে প্রস্তাবনা দিয়েছে। কিন্তু সেখান থেকেও কোনো সাড়া মিলছে না। ফলে দিন দিন এই সদস্যরাই সিএসইর ‘বিষফোড়া’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

সিএসই সূত্রে জানা গেছে, লেনদেনের সুবিধার্থে সিএসইর ১৪৮ সদস্যের মধ্যে শেয়ার লেনদেন করার অনুমোদন আছে ১৩৭ সদস্যের। কিন্তু এর মধ্যে অন্তত ২০ সদস্য প্রায় লেনদেন করেই না। আরো ৫০ সদস্য লেনদেনে খুবই অনিয়মিত। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জেও (ডিএসই) সদস্য পদ আছে এমন ৪০ সদস্য ডিএসইর ১ শতাংশ লেনদেনও সিএসইতে করে না। মূলত বাকি ৩০ থেকে ৩৫টি ব্রোকারেজ হাউসের নিয়মিত ট্রেডের কারণে এখনো কোনোমতে টিকে আছে সিএসই। কিন্তু এর পরও দেশের পুঁজিবাজারের মার্কেট শেয়ারে নিজেদের দখল দিন দিন হারাচ্ছে। ২০১১ সালেও যেখানে মার্কেট শেয়ারের ১১ শতাংশ ছিল চট্টগ্রাম পুঁজিবাজারের দখলে, সেখানে বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ থেকে ৫ শতাংশে।

সিএসইর চলতি অক্টোবর মাসের লেনদেন চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে যে লেনদেন হচ্ছে তা মূলত ঘুরে ফিরে লংকাবাংলা, বি রিচ, আইসিবি, কবির সিকিউরিটিজ, ইবিএল, মিনহার, আইল্যান্ড, ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটিজ, প্রুডেন্সিয়াল, রিলাইয়েন্স, মাল্টিসিকিউরিটিজ, এসআর ক্যাপিটাল, চিটাগং ক্যাপিটাল, অ্যাসোসিয়েটেড সিকিউরিটিজের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। অন্য সিকিউরিটিজগুলোও কম হলেও লেনদেনে সক্রিয় রয়েছে।

লেনদেনে নেই যে ট্রেকহোল্ডাররা : অক্টোবর মাসের গতকাল সোমবার পর্যন্ত ১১ কার্যদিবসে অন্তত ২০টি ট্রেকহোল্ডার কোনো লেনদেনই করেনি। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে—এমকেএম সিকিউরিটিজ, ইউনিটি শেয়ার্স ট্রেড, সিলেট মেট্রোসিটি, এএম সিকিউরিটিজ, নরবান সিকিউরিটিজ, এক্সপ্রেসে সিকিউরিটিজ, নূরজাহান সিকিউরিটিজ, প্রিমিয়ার ব্যাংক সিকিউরিটিজ, ফোরমোস্ট সিকিউরিটিজ, ওয়েসিস টার্নার, ডিবিএল সিকিউরিটিজ, স্টক অ্যান্ড সিকিউরিটিজ, এনসি সিকিউরিটিজ, ফারইস্ট স্টক অ্যান্ড বন্ড, কনফিডেন্স ইক্যুইটিজ, প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজ, জালালাবাদ সিকিউরিটিজ, মার্কেন্টাইল ব্যাংক সিকিউরিটিজ, সাউদার্ন ক্যাপিটাল ও প্লাটিনাম সিকিউরিটিজ। অথচ এই ব্রোকারেজ হাউসগুলো সিএসইতে কোনো ধরনের অবদান না রেখেই লভ্যাংশের পুরো টাকাই গ্রহণ করবে।

২০১৭ সালের লেনদেন চিত্র : সিএসই থেকে ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত লেনদেনের যে চিত্র পাওয়া যায় তাতে বছরে তিন হাজার ২০৯ কোটি টাকার লেনদেন করে লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ বরাবরের মতোই শীর্ষস্থানে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা বি রিচ লিমিটেড ২০১৭ সালে লেনদেন করে এক হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা। তৃতীয় স্থানে থাকা আইসিবি সিকিউরিটিজ এক হাজার ৫১১ কোটি টাকা লেনদেন করেছে। হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন করেছে যথাক্রমে কবির সিকিউরিটিজ, ইবিএল সিকিউরিটিজ ও মিনহার সিকিউরিটিজ।

লেনদেনের সবচেয়ে তলানিতে আছে নরবান সিকিউরিটিজ। ২০১৭ সালের ২৪৮ কার্যদিবসে এই সিকিউরিটি হাউস থেকে লেনদেন হয়েছে মাত্র এক হাজার ছয় টাকার শেয়ার। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন মাত্র চার টাকার শেয়ার লেনদেন করেই সিএসই সদস্য হিসেবে লভ্যাংশের পুরো ২১ লাখ টাকা পকেটে পুরেছে। বছরজুড়ে সাত হাজার ২৫০ টাকার লেনদেন করে এর পরেই আছে এক্সপ্রেস সিকিউরিটিজ। ১২ হাজার ৭৮০ টাকা লেনদেন করে তলানিতে তৃতীয় অবস্থানে আছে নূরজাহান সিকিউরিটিজ।

সিএসই ২০১৭-১৮ সমাপ্ত হিসাব বছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ৫ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে। এ সময় সিএসইর কর পরিশোধের পর প্রকৃত মুনাফা হয়েছে ৩২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা এবং শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে দশমিক ৫২ টাকা।

২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত চিত্র : চলতি বছরের ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত এক হাজার ৫৩৮ কোটি টাকার লেনদেন করে শীর্ষে আছে লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ। এক হাজার ১৫৬ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন করে এর পরেই আছে মাল্টিসিকিউরিটিজ লিমিটেড। তৃতীয় স্থানে থাকা আইডিএলসি সিকিউরিটিজ লেনদেন করেছে এক হাজার ৪৬ কোটি টাকার শেয়ার।

তলানিতে থাকা এক্সপ্রেস সিকিউরিটিজ লেনদেন করেছে মাত্র এক হাজার ৬৫০ টাকার শেয়ার। ফজলে সিকিউরিটিজ ছয় হাজার ২২৪ টাকার এবং নূরজাহান সিকিউরিটিজ সাত হাজার ৪২০ টাকার শেয়ার লেনদেন করেছে সিএসইতে।

সিএসই সূত্র জানায়, সিএসইকে আরো সচল করতে আগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়ালি-উল-মারুফ মতিনের সময়ে একবার নতুন ট্রেকহোল্ডার নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়। কিন্তু বোর্ড সভার দিন নিষ্ক্রিয় ট্রেকহোল্ডাররা একজোট হয়ে সভায় বিষয়টি তুলতেই দেয়নি।

২০১৭ সালে এক হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা লেনদেন করে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লেনদেনকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে বি রিচ লিমিটেড। নিষ্ক্রিয় ট্রেকহোল্ডারদের ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করে বি রিচ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিষ্ক্রিয়দের সক্রিয় করা কিংবা বাজারের উন্নয়নে নতুন ট্রেকহোল্ডার নেওয়ার অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু মেজরিটি ইস্যুতে এসব উদ্যোগ আটকে যাচ্ছে। আমরা কোটি টাকা অফিস খরচ করে বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন করে যে লভ্যাংশ পাই, সিএসইর লেনদেনে কোনো অবদান না রেখেই নিষ্ক্রিয় ট্রেকহোল্ডাররাও একই লভ্যাংশ পায়।’

সিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম মজুমদার ট্রেকহোল্ডারদের নিষ্ক্রিয়তায় হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘যারা নিষ্ক্রিয় তাদের বলেছি, আপনারা ট্রেক হস্তান্তর করেন। কিন্তু এ আবেদনে কেউ সাড়া দেয়নি। একইভাবে নতুন ট্রেকহোল্ডার নেওয়ার উদ্যোগও সফল হয়নি। বিএসইসির আইন অনুযায়ী, বছরে কমপক্ষে একবার ট্রেড করলেই ট্রেকহোল্ডারের লাইসেন্স বহাল থাকে। নিষ্ক্রিয়রা এই সুযোগটিই নিচ্ছে। বছরে ছোট একটি লেনদেন করেই নিজেদের লাইসেন্স টিকিয়ে রাখছে।’

এ কারণে দুই মাস আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিতে ট্রেক লাইসেন্স টিকিয়ে রাখতে কমপক্ষে বছরে ৪০ শতাংশ কার্যদিবসে লেনদেনের বাধ্যবাধকতার আইন করার প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে সিএসই থেকে। এ প্রসঙ্গে সিএসই ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘ডুয়েল ট্রেকহোল্ডারদের লেনদেনে কমপক্ষে ১০ শতাংশ সিএসইতে না করলে ট্রেক লাইসেন্স বাতিলের ক্ষমতা দেওয়ার আবেদনও করা হয়েছে। তবে এখনো বিএসইসি থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।’



মন্তব্য