kalerkantho


ভারতের সাত রাজ্যে পণ্য পরিবহন সুবিধা

বাড়তি চাপ সামাল দিতে সক্ষম চট্টগ্রাম বন্দর

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বাড়তি চাপ সামাল দিতে সক্ষম চট্টগ্রাম বন্দর

দেশের প্রধান চট্টগ্রাম বন্দর এবং মোংলা বন্দরের মাধ্যমে ভারতের সাত রাজ্যে পণ্য পরিবহনে একটি খসড়া চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ফলে জাহাজের মাধ্যমে পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর কিংবা মোংলা বন্দরে এনে সেখান থেকে সড়কপথে ভারতের সাত রাজ্যে—আসাম, মেঘালয়, অরুণাচল প্রদেশ, ত্রিপুরা, মণিপুর, নাগাল্যান্ড ও মিজোরামে নেওয়া যাবে।

যদিও চুক্তিটি কবে থেকে বাস্তবায়িত হবে এবং ভারতের সাত রাজ্যে বছরে কী পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা যাবে, এর কোনো ধারণা মেলেনি। এর পরও চট্টগ্রাম বন্দর মনে করছে, এখনই পণ্য পরিবহনের বাড়তি চাপ সামাল দিতে পারবে।

তবে বন্দর ব্যবহারকারী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চুক্তিটি কার্যকর করার আগে চট্টগ্রাম বন্দর ও মোংলা বন্দরের সক্ষমতা যাচাই করে কী পরিমাণ পণ্য বাড়তি ওঠানামা করতে পারবে তা জানা জরুরি। কারণ বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের খোলা পণ্য ও কনটেইনার ওঠানামার সক্ষমতা প্রায়ই পূর্ণ, আগামী দুই বছরের মধ্যে নতুন কোনো জেটি ও টার্মিনাল চালু হবে না। তাই সক্ষমতা বাড়ানো নিশ্চিত করেই ধাপে ধাপে বাড়তি চাপ সামাল দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

অর্থনীতিবিদ ড. মঈনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম ও মোংলার বর্তমান সক্ষমতা দিয়েই ভারতের বাড়তি কার্গো ওঠানামা করা সম্ভব হবে। সক্ষমতা বাড়াতে সরকার ইতিমধ্যে পায়রা সমুদ্রবন্দর এবং চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় বে টার্মিনাল নির্মাণ করছে। ফলে আগামীর চাপও মোকাবেলা করা সম্ভব।’

কী পরিমাণ কার্গো বাড়তি ওঠানামা করতে হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে ড. মঈনুল ইসলাম বলেন, এমন না যে হঠাৎ করেই বিপুল কার্গো ওঠানামা হবে। এটি ধাপে ধাপে বাড়বে। ফলে তেমন অসুবিধার সৃষ্টি করবে না। এই চুক্তি অনেক আগেই করা উচিত ছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, এটি একটি ভালো চুক্তি। চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ-ভারত দুই পক্ষই লাভবান হবে।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি ও পোর্ট ইউজার্স ফোরামের সভাপতি মাহবুবুল আলম মনে করেন, ‘এটি অবশ্যই ইতিবাচক ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত। ভারতের সাত রাজ্যে সমুদ্রবন্দর নেই বলে তারা আমাদের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে উপকৃত হবে; বিপরীতে আমরাও রাজস্ব পাব।’

দেশের প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পাশের দেশগুলোকে বন্দর ব্যবহারের জন্য উপযোগী করতে অতি দ্রুত বে টার্মিনাল চালু, আধুনিক যন্ত্রপাতি যোগ করে বন্দরের ধারাবাহিক অগ্রগতিকে ধরে রাখা এবং চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য আসা-যাওয়ার প্রধান সড়ক চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়ক আট লেন করা এবং নৌ, রেলসহ বিকল্প যোগাযোগগুলো নিশ্চিত করার জোর তাগাদা দেন তিনি।

বন্দর চেয়ারম্যান কমোডর জুলফিকার আজিজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সর্বশেষ অর্থবছরে কনটেইনারে ১২ এবং সাধারণ পণ্যে ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিশেষ কিছু কৌশল কাজে লাগিয়ে এই বাড়তি প্রবৃদ্ধি আমরা সামাল দিচ্ছি। ফলে ভারতের সাত রাজ্যে পণ্য পরিবহনের সুযোগ সামাল দেওয়া কঠিন কিছু নয়। তবে পণ্য পরিবহনের আগাম ধারণা পেলে আমাদের প্রস্তুতি নিতে সুবিধা হবে। পণ্য পরিবহনের সুযোগ দিলে চট্টগ্রাম বন্দর লাভবান হবে, বেশি রাজস্ব আয় হবে।’

তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ধরে রাখতে নতুন জেটি টার্মিনাল নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য আমরা নতুন স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে বে টার্মিনালে পণ্য ওঠানামার ব্যবস্থা করছি। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের কাজ শুরু হয়েছে। আর নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) কি গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি যোগ করে পুরোদমে চালু করা হচ্ছে।’

ট্রানজিট প্রদানের জন্য গঠিত জাতীয় কোর কমিটির ২০১১ সালের খসড়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত, নেপাল ও ভুটানকে ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ টন (দুই মিলিয়ন টন) কার্গো হ্যান্ডলিং করবে। এই দুই মিলিয়ন টন পণ্য অর্থাৎ প্রায় দুই লাখ একক কনটেইনারের অর্ধেক চট্টগ্রাম বন্দর ও বাকি অর্ধেক মোংলা বন্দর হ্যান্ডলিং করবে। তখনকার বন্দর চেয়ারম্যান কমোডর আনোয়ারুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘বিদ্যমান ব্যবস্থায় উক্ত পরিমাণ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা অনায়াসেই সম্ভব। কারণ চট্টগ্রাম বন্দরের ৪০ শতাংশ ক্ষমতা অব্যবহৃত রয়েছে।’

কিন্তু ২০১১ সালের পর সাত বছর পেরিয়ে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ৩০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনার পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে গেছে এই প্রবৃদ্ধি। জার্মানির হামবুর্গ পোর্ট কনসালট্যান্সি (এইচপিসি) প্রণীত মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, চট্টগ্রাম বন্দরে ২০১৮ সালে কনটেইনার ওঠানামা হবে প্রায় ২৪ লাখ একক; ২০১৯ সালে হবে ২৬ লাখ ৬৬ হাজার একক এবং ২০২০ সালে হবে ২৯ লাখ একক কনটেইনার। আড়াই বছর পরের সেই পূর্বাভাস বা লক্ষ্যমাত্রা ২০১৭ সালেই পূরণ করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। শুধু তা-ই ই নয়, বিশ্বের একশটি শীর্ষ সমুদ্রবন্দরের তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান এখন ৭০তম।

মহাপরিকল্পনার পূর্বাভাস বলছে, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ওঠানামা প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে সক্ষমতা চলতি ২০১৮ সালের আগেই পূর্ণ হবে। এই সময়ের মধ্যে নতুন টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু না হলে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে আর এতে সংকটে পড়বে চট্টগ্রাম বন্দর। বন্দরের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত জাহাজগুলো বন্দরে ভিড়তে পারবে না। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রকল্পগুলো অত্যন্ত দ্রুত বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। বার্থ অপারেটর ও টার্মিনাল অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী মনে করেন, ‘অবশ্যই বন্দরের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়েই মন্ত্রিসভা এই ইতিবাচক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারতের বিভিন্ন ধরনের পণ্য ওঠানামা করতে পারলে আমাদের দক্ষতা-গতিশীলতা বাড়বে, সেই সঙ্গে বন্দরের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।’

তিনি মনে করেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে ভারত তাদের পণ্য পরিবহন ধাপে ধাপে বাড়াবে; রাতারাতি নয়। সেই সঙ্গে আমাদের সক্ষমতাও বাড়বে। ফলে চাপ সামাল দেওয়া কঠিন কিছু নয়।’

চট্টগ্রাম বন্দর ট্রাফিক বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, ভারত চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে পণ্য পরিবহন করছে অনেক আগেই। বন্দর ব্যবহার করে নেপালেও পণ্য নিয়েছে অনেকবার। ফলে নতুন করে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারে কোনো বাধা নেই। তবে ভারতের পণ্যবাহী জাহাজগুলো চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে ভিড়তে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে কি না; জেটি-টার্মিনাল বিশেষভাবে বরাদ্দ রাখা হবে কি না—এমন বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলে বিষয়টি ভিন্ন; অন্যথায় চাপ সামাল দেওয়া কোনো বিষয় নয়।

 

 



মন্তব্য