kalerkantho


২০ মার্চ সাউথ সাউথ কো-অপারেশন সম্মেলন

অর্থায়নের খোঁজে দক্ষিণে নজর

আরিফুর রহমান   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



অর্থায়নের খোঁজে দক্ষিণে নজর

জাতিসংঘ ঘোষিত ১৫ বছর মেয়াদি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৭টি অভীষ্ট বাস্তবায়ন করতে গেলে বাংলাদেশ সরকারের বাড়তি ৯২ হাজার ৮৪৮ কোটি ডলার বা ৭৫ লাখ কোটি টাকা দরকার বলে পরিকল্পনা কমিশনের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে রাজস্ব আহরণের দিক থেকে বাংলাদেশ সবার পেছনে। একদিকে রাজস্ব আদায়ের হার কম; অন্যদিকে এসডিজি বাস্তবায়নে দরকার বিপুল টাকা; ঠিক এমন সময় সরকার ঘোষণা দিয়েছে, ২০২১ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাবে বাংলাদেশ। উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার পর বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা ও উন্নত বিশ্ব থেকে পাওয়া সুযোগ-সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে বাংলাদেশের জন্য। এমন কঠিন ও জটিল সমীকরণের মধ্যে বিকল্প অর্থায়নের খোঁজে নেমেছে সরকার। সে জন্য উন্নত বিশ্বের পেছনে না ছুটে সমঅর্থনীতির দেশগুলো থেকে কিভাবে সহযোগিতা পাওয়া যায়, সে কৌশল অবলম্বন করেছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা।

যার নাম সাউথ সাউথ কো-অপারেশন বা দক্ষিণ দক্ষিণ সহযোগিতা। ধারণাটি বিশ্বজুড়ে বেশ পুরনো হলেও এটিকে এখন বেশ গুরুত্ব সহকারে দেখছে সরকার। তাই আগামী মার্চে জাতিসংঘের উদ্যোগে অনুষ্ঠিতব্য দক্ষিণ দক্ষিণ সহযোগিতা সম্মেলনকে ঘিরে জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা। ওই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। উন্নত বিশ্বের পেছনে না ছুটে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য দক্ষিণ দক্ষিণ বা উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সরকার।

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সাউথ সাউথ কো-অপারেশন সহযোগিতা সম্মেলনের প্রস্তুতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি আন্ত মন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সহযোগিতার অর্থ হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি ও তথ্যের আদান-প্রদান।

ইআরডির ভারপ্রাপ্ত সচিব মনোয়ার আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ২০২১ সালের মধ্যেই উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যেতে চাই। ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের এসডিজির অভীষ্ট বাস্তবায়নেরও লক্ষ্য রয়েছে। এসব দিক বিবেচনা করে আমরা উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছি। উন্নয়নশীল দেশে যাওয়ার পথ যাতে আমাদের মসৃণ হয়, সে আহ্বান থাকবে দক্ষিণ দক্ষিণ সম্মেলনে।’

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসে আগামী ২০ মার্চ শুরু হবে দক্ষিণ দক্ষিণ ও ত্রিমুখী সহযোগিতা সম্মেলন। শেষ হবে ২২ মার্চ। সম্মেলনে জাতিসংঘের মহাসচিবসহ সদস্যভুক্ত সব দেশের সরকারপ্রধানের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠক করবে বাংলাদেশ। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার পর বাংলাদেশের জন্য যাতে সুযোগ-সুবিধা বন্ধ না হয়, সে অনুরোধ করা হবে সরকারের পক্ষ থেকে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হবে। যাতে করে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাওয়ার পথ মসৃণ হয় সে ব্যবস্থা করতে সবাইকে অনুরোধ করবে বাংলাদেশ। আগামী ২০৩০ সালে এসডিজির অভীষ্ট বাস্তবায়নে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সহযোগিতা চাওয়া হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ যে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে, এমন তথ্যের পুনরাবৃত্তি করে এই খাতেও সহযোগিতা চাইবে বাংলাদেশ।

ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, বড় প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের প্রস্তাব বেশ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে তাদের বিশ্বাস। ১৯৭১ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি দেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে গিয়ে টিকে গেছে। ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, উন্নত দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ আগে যে ধরনের সহযোগিতা পেত, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার পর সেই সহযোগিতার পরিমাণ ক্রমে কমছে। তা ছাড়া স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনে যেসব দেশ এগিয়ে এসেছিল, সেসব দেশও এখন অনেকটা দৃশ্যপটের বাইরে। এসব বাস্তবতায় উন্নত বিশ্বের পেছনে না ছুটে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য দক্ষিণ দক্ষিণ বা উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করেছে সরকার।

ইআরডির তথ্য বলছে, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তি আদান-প্রদানে বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি উদীয়মান অর্থনৈতিক দেশকে চিহ্নিত করেছে। এদের মধ্যে রয়েছে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা) অন্যতম। এ ছাড়া হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত, দক্ষিণ কোরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, এসব দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা জোরদার করতে পারলে দ্রুত দেশের অর্থনৈতিক চেহারা পরিবর্তন হয়ে যাবে। তবে এর আগে এসব দেশের সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবস্থা নিতে হবে।

ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, দক্ষিণ দক্ষিণ ও ত্রিমুখী সহযোগিতাকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমত রয়েছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা। পারস্পরিক সহযোগিতা করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সব দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা। এ ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি আইনি কাঠামো ও নীতিমালা, অবকাঠামোর অপ্রতুলতা ও অদক্ষতা, সাধারণ জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, পারস্পরিক জ্ঞানের আদান-প্রদানের ব্যবস্থাপনা এবং নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ারও প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এসব বাধা কাটিয়ে উঠতে পারলে এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে পারলে দক্ষিণ দক্ষিণ সহযোগিতা কৌশল বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তৈরি পোশাক খাতের ওপর আর নির্ভরশীল হয়ে না থেকে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে চায় সরকার। রপ্তানি বাড়াতে নতুন কয়েকটি দেশও চিহ্নিত করা হয়েছে। সরকার আশা করছে, উন্নয়ন সহযোগিতায় বৈচিত্র্য আসবে। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তির বিকাশ, বেকার তরুণদের কাজে লাগানোসহ নানাভাবে লাভবান হবে বাংলাদেশ। ইআরডি থেকে তৈরি করা রূপরেখায় সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে বাণিজ্য সম্প্রসারণের ওপর। এতে বলা হয়েছে, পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে হলে সবার আগে প্রয়োজন উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন। ভৌগোলিকগত কারণে অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে পারলে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের বাণিজ্য বহুগুণ বাড়বে। এ ছাড়া প্রযুক্তিগতভাবে যেসব দেশ এগিয়ে আছে, তাদের কাছ থেকে সহযোগিতা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিদেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে রূপরেখায়।



মন্তব্য