kalerkantho


‘অপরিকল্পিত’ উন্নয়ন পর্যটনে

মহাপরিকল্পনার অভাবে আসছে না কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ

মাসুদ রুমী   

১৪ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



‘অপরিকল্পিত’ উন্নয়ন পর্যটনে

অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে উঠছে দেশের পর্যটন খাত। দেশের প্রধান পর্যটন গন্তব্যগুলো সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় না থাকায় সেখানে অনিয়ন্ত্রিতভাবে অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার দিনে দিনে কংক্রিটের জঞ্জালে পরিণত হয়েছে। আবার পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে হুমকিতে একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনস। সুন্দরবন, কুয়াকাটাসহ অন্যান্য গন্তব্যগুলোয় নেই পর্যটক আকর্ষণের উপযোগী পরিবেশ। ফলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না পর্যটন খাত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহাপরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ পর্যটনে সেভাবে এগোতে পারেনি। তাই দ্রুত পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে জাতীয় পর্যটন পরিষদের সিদ্ধান্তের আলোকে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ শুরু করে বিটিবি। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে কনসাল্টিং ফার্ম নিয়োগের জন্য সম্প্রতি আগ্রহ ব্যক্তকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে বিটিবি। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশি-বিদেশি ১২টি প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক আবেদন করেছে। বিটিবি তা মূল্যায়নের মাধ্যমে আগ্রহী কম্পানিগুলোর মধ্যে থেকে সর্বোচ্চ সাতটি এবং সর্বনিম্ন চারটি কম্পানির সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করে টার্মস অফ রেফারেন্সের আলোকে ৪২ দিনের মধ্যে কারিগরি এবং আর্থিক প্রস্তাব আহ্বান করবে। তাদের প্রস্তাব পাওয়ার পর তা যাচাই-বাছাইয়ের পর একটি প্রতিষ্ঠানকে কনসাল্টিং ফার্ম নিয়োগে চুক্তি স্বাক্ষর করবে বিটিবি। এরপর তারা সারা দেশের পর্যটন গন্তব্যগুলো জরিপ ও সম্ভাব্যতা যাচাই করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিস্তারিত পরিকল্পনা দেবে। এমনকি তাতে স্থাপত্য পরিকল্পনাও থাকবে। এরপর জাতীয় পর্যটন পরিষদ ও মন্ত্রিসভায় তা অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।

জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব মুহিবুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে কনসাল্টিং ফার্ম নিয়োগের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে, এখন বাছাই প্রক্রিয়া চলছে। মাসখানেকের মধ্যে আমরা প্রাথমিক কাজগুলো করতে পারব। মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন হলে সুপরিকল্পিতভাবে আমাদের পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটবে বলে আশা করি।’

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উপপরিচালক এ কে এম রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া আমাদের পর্যটন খাত কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না। মাস্টারপ্ল্যান তৈরির জন্য এবার আমরা সময় রেখেছি ১২ মাস। আমরা আশা করছি, চলতি অর্থবছরের মধ্যেই মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের প্রথম ধাপের কাজ ৮০ শতাংশ শেষ হবে। বাকি কাজ পরবর্তী অর্থবছরে শেষ হবে বলে আমরা আশা করছি।’

বিটিবির এই কর্মকর্তা জানান, মাস্টারপ্ল্যানের কনসাল্টিং ফার্ম হিসেবে অংশগ্রহণকারী কম্পানিগুলোর মধ্যে শর্টলিস্ট চূড়ান্ত করতে আজ একটি সভা হবে। এরপর সংক্ষিপ্ত তালিকায় নির্বাচিত কম্পানিকে আর্থিক ও কারিগরি প্রস্তাব জমা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হবে।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক (জনসংযোগ ও বিপণন) মো. জিয়াউল হক হাওলাদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাতিসংঘ পর্যটন সংস্থা ইউএনডাব্লিউটিওর সহায়তায় ১৯৮৮ সালে মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছিল। কক্সবাজার, কুয়াকাটা নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে মাস্টারপ্ল্যান হলেও আমাদের পর্যটন খাতের পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান আজও হয়নি। এখন একটি হালনাগাদ মাস্টারপ্ল্যান হতে পারে যেখানে প্রত্যেকটি পর্যটন গন্তব্য চিহ্নিতকরণ এবং সেগুলোকে প্রডাক্ট হিসেবে রূপান্তর করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন। ২০০৭ সালে পর্যটন করপোরেশন পুরো বাংলাদেশকে ছয়টি ভাগে ভাগ করে একটি মাস্টারপ্ল্যান করেছিল। সেটি ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী সময়ে আর বাস্তবায়ন হয়নি।’

ট্যুর অপারেটরস অব বাংলাদেশের (টোয়াব) পরিচালক ও জার্নি প্লাসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তৌফিক রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটা পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া পৃথিবীর কোনো দেশই পর্যটন খাতে পরিকল্পিত উন্নয়ন করতে পারেনি। আমাদের মাস্টারপ্ল্যান না থাকার কারণে আমরা পিছিয়ে পড়েছি, যেটুকু হয়েছে তা অপরিকল্পিতভাবে। এটি যে কেউ চাইলেই যেকোনো স্থানে ইচ্ছামতো স্থাপনা করতে পারবেন না। মাস্টারপ্ল্যানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা যেমন থাকে, যা বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়তা করে থাকে। মাস্টারপ্ল্যানেই উল্লেখ থাকবে কোন অঞ্চলে বিনিয়োগ করলে কী কী নীতি সহায়তা পাওয়া যাবে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের ইনবাউন্ড ট্যুরিজমের কি দুরবস্থা সে সম্পর্কে কর্তাব্যক্তিরা কোনো খবর রাখেন বলে মনে হয় না। এখনো পর্যন্ত আমাদের ওপর বিভিন্ন দেশের যেসব ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা সেগুলো প্রত্যাহার করা হয়নি। এর আগেও মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে কিছু কাজ হয়েছে যার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি। এবার আবার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা যেন বাস্তবায়নের জন্য করা হয় এবং এর আওতায় সব স্টেকহোল্ডারকে নিয়ে আসতে হবে। তা না হলে একেকটি গন্তব্য অপরিকল্পিত কক্সবাজারের মতো ইট-পাথরের বস্তির মতোই হবে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বাজেট কার্যক্রম ও মূল্যায়ন) ও বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের বিদায়ী সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি যখন বোর্ডে ছিলাম তখন কাজটি শুরু করেছিলাম। আশা করছি, বর্তমান সিইও কাজটি বাস্তবায়নের পর্যায়ে নেবেন। মাস্টারপ্ল্যানে যে এলাকায় পর্যটন স্থাপনা হবে সেই এলাকার উন্নয়ন ভাবনায় পর্যটনকে নিয়ে আসার জন্য একটি সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়েছিলাম। মাস্টারপ্ল্যান শুধু পর্যটন মন্ত্রণালয়, বোর্ড ও করপোরেশনের একার পক্ষে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আমাদের উন্নয়ন ভাবনায় পর্যটনকে আনতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘সব ধরনের উন্নয়নে পর্যটন খাতকে সম্পৃক্ত বা মাথায় রাখতে হবে। যেখানেই রেলপথ, আকাশপথ, নৌপথ ও সড়কপথ যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হোক সেসব পরিকল্পনায় পর্যটনের বিষয়টি মাথায় রাখা হোক। আজ পদ্মা ব্রিজ হচ্ছে। মানুষ যেন ব্রিজ হয়ে যাতায়াত ছাড়াও স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরতে পারে, নদীতীরে লঞ্চঘাট আছে সে জায়গাটা যেন পর্যটননির্ভর হয়। তা হলেই পর্যটন খাত দ্রুত এগোবে।’

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) গভর্নিং বডির সদস্য জামিউল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের পর্যটন চলছে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই। এতে না আছে ব্যবস্থাপনা না আছে কোনো শৃঙ্খলা। যে যার মত করে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে এসে তা চাপিয়ে দিচ্ছে। কোনটা আগে হবে, কোনটা পরে হবে তা নিয়ে কোনো চিন্তাও করা হচ্ছে না। ফলে এ শিল্পের জন্য পরিকল্পনামাফিক উন্নয়নকাজ করার কোনো সুযোগ নেই। আর এ জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজটির শম্বুকগতি। বছর বছর পার হয়ে যাচ্ছে কিন্তু মহাপরিকল্পনার কিছু তো হচ্ছেই না উপরন্তু স্বল্প মেয়াদ তো বটেই এমনকি সামান্য পরিকল্পনাও অনুপস্থিত থাকছে।’

তিনি বলেন, মহাপরিকল্পনার আশায় থেকে স্বল্প মেয়াদের পরিকল্পনাও থাকবে না তাও আবার পর্যটনের মতো এমন এক শিল্পের ক্ষেত্রে, যা অবিশ্বাস্য অথচ এটাই সত্য। তবে নিয়ম মানার নিয়মের মধ্যে পড়ে আটকে থাকা এই মহাপরিকল্পনার কাজটিকে গতি দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের গভর্নিং বডির ৩৬তম সভায় জোরালো তাগিদসহ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এবার বাকিটা আবারও নিয়ম মানার গ্যাঁড়াকলে না পড়লেই হলো।



মন্তব্য