kalerkantho


কর কমলেও আস্থা সংকট!

প্রতিদিনই বাড়ছে শেয়ার বিক্রির চাপ

রফিকুল ইসলাম   

১৯ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



কর কমলেও আস্থা সংকট!

তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে করপোরেট কর কমিয়েছে সরকার। কর কমায় কম্পানির মুনাফায় ইতিবাচক প্রভাবে উপকৃত হবে বিনিয়োগকারী। প্রত্যক্ষ প্রভাব না থাকলেও বিনিয়োগকারীরাই পরোক্ষ ফল পাবে এমন মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের।

তবে করপোরেট করে ছাড় পেলেও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও ব্যাংক খাতে সাম্প্রতিক সংকটে আস্থাহীন বিনিয়োগকারী। পুঁজিবাজারে প্রতিদিনই বাড়ছে শেয়ার বিক্রির চাপ। সঞ্চয় বা আমানতে উচ্চ সুদহারে শেয়ার বিক্রি করে বাজার ছাড়ছে অনেকে।

বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত সাধারণ কম্পানির কর ব্যবধান ১০ শতাংশ। তালিকাভুক্ত হলে ২৫ শতাংশ আর বাইরে থাকলে কর ৩৫ শতাংশ, যা অপরিবর্তিত। ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ২০১৩ সালে সরকার অনুমোদিত ব্যাংক, বীমা ও প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হলে কর ৩৭.৫ শতাংশ। আর অ-তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৪০ শতাংশ। গত অর্থবছরে তালিকাভুক্ত এই খাতের কম্পানির কর ছিল ৪০ শতাংশ ও অ-তালিকাভুক্ত কম্পানির ছিল ৪২.৫ শতাংশ। তবে আগামী অর্থবছরে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ২.৫ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়েছে। মোবাইল ফোন অপারেটর পাবলিকলি ট্রেডেড ৪০ শতাংশ আর অ-তালিকাভুক্ত ৪৫ শতাংশ। আগের বছরও করহার একই ছিল।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের অর্থনৈতির উন্নতির বিষয় তুলে ধরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তারা বলছেন, উন্নত দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে পুঁজিবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মতো বৃহৎ অর্থনীতির দেশে একটি স্থিতিশীল পুঁজিবাজার ভূমিকা রাখছে। শিল্প-কারখানা স্থাপন ও সম্প্রসারণে পুঁজির চাহিদা পুরণে দীর্ঘমেয়াদি ও শক্তিশালী মাধ্যম পুঁজিবাজার। দেশের পুঁজিবাজার অবকাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে এখন অর্থনীতিকে সাপোর্ট দিতে সম্পূর্ণভাবেই প্রস্তুত। প্রয়োজন শুধু নতুন পণ্য ও ভালো কম্পানির শেয়ারের জোগান। তবে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজারকে এগিয়ে নেওয়ার মতো কিছু নেই। ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। বাজেটে সরকারের সদিচ্ছার বিষয়টিও প্রতিফলিত হয়নি, কিন্তু আগের বছর পুঁজিবাজার নিয়ে পৃথক প্যারা সংযুক্ত ছিল, যাতে পুঁজিবাজার উন্নয়ন ও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মতামত ছিল।

সূত্র বলছে, ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ২.৫ শতাংশ করপোরেট কর ছাড়ের সুবিধায় তালিকাভুক্ত কম্পানির বিনিয়োগকারী উপকৃত হবে। কিন্তু ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংক খাতে বিনিয়োগকারীর আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। কারণ খেলাপি ঋণের প্রভাব পড়ে বিনিয়োগকারীর ঘাড়েই। বছর শেষে ব্যাংকের মুনাফা কমে যায়, এতে লভ্যাংশও কমে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণের ১০.৭৮ শতাংশ। এই খেলাপি ঋণ এ যাবত্কালের সর্বোচ্চ। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা, যা ওই সময় পর্যন্ত মোট বিতরণ করা ঋণের ৯.৩১ শতাংশ।

এদিকে গত বছরের দ্বিতীয়ার্ধের সংকটমূলক মুদ্রানীতিতে লাগাম ঋণ ঠেকাতে ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) কমালে ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দেয়। ঘাটতি অর্থ পূরণে ব্যাংক উচ্চহারে আমানত নেওয়া শুরু করলে সুদের হার এক ডিজিট ডিঙ্গিয়ে ডাবল ডিজিট হয়। উচ্চ সুদের ঋণে বিনিয়োগ থমকে যাওয়ার শঙ্কায় সিআরআর কমিয়ে ১০-১২ হাজার কোটি টাকার জোগান দেওয়া হলেও এখনো অস্থিরতা কাটেনি। ব্যাংক মালিকরা সুদের হার এক অঙ্কের নিচে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সুদের হারও বেশ চড়া।

ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বাজেটে করপোরেট কর ছাড় দেওয়া প্রসঙ্গে পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের এই সিদ্ধান্তে নানামুখী সংকটে জর্জরিত ব্যাংক খাত উন্নতি হবে। কিন্তু খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এই খাতের বিনিয়োগকারীর আস্থা সংকট দেখা দিয়েছে। কর ছাড়ে পুঁজিবাজারে সম্ভাবনার সৃষ্টি হলেও বিনিয়োগকারীর আস্থাহীনতায় সেটির প্রতিফলন হচ্ছে না। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকের ২০১৭ সালের সমন্বিত আর্থিক হিসাবে দেখা গেছে, ৫৩ শতাংশ ব্যাংকের মুনাফা কমেছে। তালিকাভুক্ত ৩০ ব্যাংকের মধ্যে ১৬টির মুনাফা হ্রাস পেয়েছে। ২০১৭ সালে ১৪টি ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) বেড়েছে। তবে ১৫টি ব্যাংক বিনিয়োগকারীদের বোনাস বা স্টক লভ্যাংশ দিয়ে নিজেদের ক্যাটাগরি টিকিয়েছে। মুনাফার সবটুকুই নিজেদের হাতে রেখে দেওয়ায় বিনিয়োগকারীর কোনো ফল আসেনি। অন্যদিকে ব্যাংক আমানতে সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় পুঁজিবাজারের মূলধন তুলে নেওয়ায় অনেকে সঞ্চয়ে ফিরছে। এতে শেয়ার বিক্রির চাপ বেশি।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বড় কম্পানির মধ্যে বেশির ভাগ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মূলধনই বেশি। বাজার মূলধনের প্রায় অর্ধেকই এই তিন খাতের। কাজেই এই খাত প্রভাবিত হলে পুঁজিবাজারেও বড় প্রভাব পড়ে। এবার তালিকাভুক্ত ৩০টি ব্যাংক, ২৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান আর ৪৭টি ইনস্যুরেন্স বা বীমা ২.৫ শতাংশ হারে কর ছাড় পাচ্ছে, যা আগামী অর্থবছরের হিসাবে কম্পানির মুনাফায় প্রভাব ফেলবে। বিনিয়োগকারীদের বেশি লভ্যাংশ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এতে সরাসরি কোনো উপকার না হলেও পরোক্ষাভাবে উপকৃত হবে বিনিয়োগকারীরাই।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করপোরেট কর ছাড়ে সরকারের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক কিন্তু এই ছাড়ের অর্থ বিনিয়োগকারীদের দেবে কি না সেটা কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার বিষয়। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়া ও তারল্য সংকটে ব্যাংক খাতে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বাড়ছেই। করপোরেট কর ছাড়ে বিনিয়োগকারীর জন্য সুখবরই তবে যদি কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকে।’

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুর রহমান মজুমদার বাজেট পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক কম্পানিগুলোর জন্য ২.৫% করপোরেট কর কমানোর সুবিধা সব লিস্টেড কম্পানির জন্য প্রদান করতে হবে। ক্রমান্বয়ে ভবিষ্যতে লিস্টেড এবং নন-লিস্টেড কম্পানির করপোরেট করহারের ব্যবধান বর্ধিতকরণেরও সুস্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘করপোরেট কর ছাড়ের ঘোষণার পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এই করহার পুঁজিবাজারের উন্নয়নের জন্য মনে হয় দেয়নি। কর কম দিলে ব্যাংক খাতের লাভ। নতুন কম্পানি বাজারে আনা ও গতিশীল করতে সব কম্পানিরই করপোরেট করে ছাড় দিতে হবে। আর তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কম্পানির কর ব্যবধান বৃদ্ধি করতে হবে।’

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে এ এম মাজেদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের এই সিদ্ধান্তে ব্যাংক ও আর্থিক খাত চাঙ্গা হবে। বিনিয়োগকারীরা সরাসরি কোনো উপকার না পেলেও পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে। একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন তিনি।



মন্তব্য