kalerkantho


চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারে পণ্য পরিবহন

ইলেকট্রনিক তালায় বাড়তি ব্যয় ৪৫০ কোটি টাকা

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

১৮ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



ইলেকট্রনিক তালায় বাড়তি ব্যয় ৪৫০ কোটি টাকা

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বেসরকারি ডিপোতে আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনারে ‘ইলেকট্রনিক তালা’ লাগানোর আবারও উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর জোর দাবির মুখে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে কার্যক্রম স্থগিত করেছিল। গত ২৬ জুন নতুন করে এক আদেশ দিয়েছে এনবিআর।

ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বলছে, নতুন আদেশের ফলে প্রতিটি কনটেইনারে প্রথমবার তালা লাগাতে (৪৮ ঘণ্টার জন্য) ৬০০ টাকা করে গুনতে হবে। এরপর প্রতি ঘণ্টার জন্য ৫০ টাকা বিল গুনতে হবে। এতে করে শত শত কোটি টাকার বাড়তি ব্যয় হবে।

বন্দর ব্যবহারকারীরা জানান, এনবিআর ঘোষিত নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি কনটেইনারের একটি করে এই ইলেকট্রনিকস তালা লাগাতে হবে। বন্দর থেকে বের হওয়ার সময় বন্দর গেটে এবং কনটেইনার ডিপো থেকে বের হওয়ার সময় সেই গেটে তালা লাগাতে হবে। প্রতি তালা লাগাতে আমদানি ও রপ্তানিকারককে দিতে হবে ৬০০ টাকা করে। সে হিসাবে মাসে পাঁচ লাখ ১৮ হাজার বক্স পরিবহনে তালা লাগাতে খরচ হবে ৩১ কোটি টাকা। সে হিসাবে বছরে খরচ হবে ৩৭২ কোটি টাকা। চলতি বছর কনটেইনার পরিবহন বেশি হওয়ায় এই খরচ দাঁড়াবে কমপক্ষে সাড়ে ৪০০ কোটি টাকা। এই পুরো টাকাই দিতে হবে সংশ্লিষ্ট আমদানি-রপ্তানিকারককে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এমনিতেই চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের ওজন স্কেল নিয়ে ব্যবসা হারানোর ঝুঁকিতে আছেন, এর ওপর এই ইলেকট্রনিক তালা লাগানো হলে শত শত কোটি টাকা আমাদের পকেট থেকে চলে যাবে। অর্থাৎ এই বাড়তি টাকা পণ্য পরিবহন ব্যয়ে যুক্ত হবে। আর তা শেষ পর্যন্ত পরিশোধ করতে হবে ভোক্তাকেই।’

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার সভাপতি ও কেডিএস গ্রুপ চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান বলছেন, ২০২১ সালে ৫০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারকে বিব্রত করতে স্বার্থান্বেষী মহল তৎপর কি না খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রাইভেট একটি সংস্থাকে প্রস্তাবিত সেবাদানের মনোপলি ঠিকাদারি দেওয়া হলে বন্দরের দক্ষতা অর্ধেকে নেমে আসবে এবং জাতীয় নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে। তাই অনতিবিলম্বে ব্যবসা-বিনিয়োগ পরিপন্থী এই বিধিমালা বাতিল করা হোক।

জানা গেছে, বিদেশ থেকে আসা আমদানি কনটেইনার এবং বিদেশে যাওয়া রপ্তানি পণ্যভর্তি কনটেইনারে নিরাপত্তার জন্য একটি ‘বুলেট সিল’ বা তালা লাগানোর নিয়ম চালু আছে। সেই তালা চট্টগ্রাম বন্দর পৌঁছা পর্যন্ত সিলগালা করা থাকে বলে চুরির সুযোগ থাকে না। বন্দরে আসার পর কাস্টমস কায়িক পরীক্ষার সময় সবার উপস্থিতিতে তালাটি ভাঙা হয়। পরীক্ষা শেষে আরেকটি তালা লাগিয়ে বেসরকারি কনটেইনার ডিপো কিংবা আমদানিকারকের কারখানা পর্যন্ত নেওয়া হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সব পণ্যের ক্ষেত্রে এই নিয়মটি চালু না করে শুধু বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগামী কনটেইনারগুলোতে ‘ইলেকট্রনিক তালা’ লাগানোর কার্যক্রম শুরু করছে।

বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কে কাভার্ড ভ্যান বা লরি বা ট্রাকে পণ্য পরিবহনের সময় পণ্য ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। কিন্তু সেই রুটে পণ্য পরিবহনে ইলেকট্রনিক তালা লাগানোর নির্দেশনা নেই। শুধু চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত ১৬টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে পণ্য পরিবহনে এই তালা লাগানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ২৬ জুন এসংক্রান্ত এসআরও এনবিআর থেকে দেওয়া হলেও কবে নাগাদ সেটি চালু হবে উল্লেখ নেই।

কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডার সভাপতি নুরুল কাইয়ুম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০ শতাংশ কনটেইনার পরিবহনে ইলেকট্রনিক তালা লাগানো হচ্ছে বাকি ৮০ ভাগ কনটেইনারের কী হবে? আর আমরা কোনো প্রতিষ্ঠানের হয়ে এই ভাড়া আদায় করতে পারব না।’

ইলেকট্রনিক তালা লাগানোর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রপ্তানিকারকরা। প্রতিক্রিয়ায় তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সহসভাপতি মোহাম্মদ নাছির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী লক লাগাতে হয় সেটি আমরা অগ্রাধিকার দিয়ে করে আসছি।

কারণ এই তালা তো কারো প্রয়োজন নেই। এখন নতুন এই লক বা তালা কারো ব্যক্তিগত স্বার্থে বা কাউকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার জন্য করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। আমরা সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে বিষয়টি জানাব, সফল না হলে পরবর্তী কর্মসূচি দেব।’

জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য নিয়ে মোট কনটেইনারের মধ্যে বড় একটি অংশ ওঠানামা হয় বেসরকারি কনটেইনার ডিপোর মাধ্যমে। রপ্তানিকারকের কারখানা থেকে পণ্য বেসরকারি এসব ডিপোতে এনে ভর্তি করে সিলগালা করা হয়, পরে সেটি বন্দরে নিয়ে জাহাজে তুলে বিদেশের নির্দিষ্ট গন্তব্যে ক্রেতার কছে পাঠানো হয়। আর আমদানি পণ্যের কনটেইনার বিদেশ থেকে সিলগালা হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে নেমে সেটি বেসরকারি ডিপোতে পাঠানো হয়। যেটাকে বুলেট লক বলা হয়।



মন্তব্য