kalerkantho


অন্যান্য ঋণের সুদ কমলেও ক্রেডিট কার্ডের কমে না

শেখ শাফায়াত হোসেন   

১৭ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



অন্যান্য ঋণের সুদ কমলেও ক্রেডিট কার্ডের কমে না

বেসরকারি দি সিটি ব্যাংকের ভিসা ক্রেডিট কার্ডের ঋণের সুদ মাসে ২.৫ শতাংশ। অর্থাৎ এই ব্যাংকটির ভিসা ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে ঋণ নিলে বছরে ৩০ শতাংশ হারে ১০০ টাকা সুদ দিতে হবে ৩০ টাকা। ব্যাংকটির আমেরিকান এক্সপ্রেস ক্রেডিট কার্ডের ঋণের মাসিক সুদহার ২.২৫ শতাংশ। অর্থাৎ আমেরিকান এক্সপ্রেস ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে ঋণ নিলে বছরে ১০০ টাকায় সুদ গুনতে হবে ২৭ টাকা। এ ছাড়া এই কার্ড ব্যবহার করে কিস্তিতে পণ্য কিনলে সমান মাসিক কিস্তির (ইএমআই) জন্য বার্ষিক সুদ গুনতে হবে ১৭ শতাংশ হারে। এ ছাড়া ঋণ প্রক্রিয়াকরণ ফি ও বার্ষিক ফিসহ অন্যান্য ফি এবং এর ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট বা মূসক তো রয়েছেই।

ইস্টার্ন ব্যাংকের সব ধরনের ক্রেডিট কার্ডের ঋণের সুদহার মাসিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ এই ব্যাংকটির ক্রেডিট কার্ডধারীদের ঋণের বিপরীতে বছরে সুদ গুনতে হবে ২৪ শতাংশ হারে। এই ব্যাংকটি সমান মাসিক কিস্তির ঋণে কোনো সুদ আরোপ করে না।

বিদেশি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ভিসা ও মাস্টারসহ কয়েক ধরনের ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। এই ব্যাংকটির ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকরা কার্ডের বিপরীতে কোনো ঋণ নিলে বছরে সুদ দিতে হবে ৩৬ শতাংশ।

ব্র্যাক ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের ঋণের বার্ষিক সুদহার ২৭ শতাংশ। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের ঋণের বার্ষিক সুদহার ২১ থেকে ২৩.৫০ শতাংশ (কার্ড ভেদে)।

যমুনা ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডে ১৫ শতাংশ, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ১৮ শতাংশ, ঢাকা ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডে ২৪ শতাংশ, এবি ব্যাংকের ২৫ শতাংশ, আইএফআইসি ব্যাংকের ২৭ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে ক্রেডিট কার্ডধারীদের।

সম্প্রতি দেশের শিল্প খাতে গতি আনতে সরকারের উদ্যোগে শিল্প ও প্রস্তুতকারক খাতের মেয়াদি ও চলতি মূলধন ঋণের সুদ ৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছে ব্যাংকগুলো। কোনো কোনো ব্যাংক এসএমই ও নারী উদ্যোক্তাদের ঋণের সুদও কমিয়ে ৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এই উদ্যোগ থেকে বাদ পড়েনি। সম্প্রতি আইপিডিসি ফাইন্যান্স নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ৮ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

তবে উৎপাদন খাতের ঋণের সুদ কমাতে গিয়ে ব্যাংকগুলো সব ধরনের আমানতের সুদহার কমিয়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। কিন্তু তহবিল খরচ কমিয়ে আনার এই সুফল পাচ্ছে শুধু শিল্প উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা। কিন্তু দেশের প্রায় ১০ লাখ ক্রেডিট কার্ডধারীদের ঋণের সুদের হার এখনো ২২ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল পর্যন্ত দেশে চালু ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ৯ লাখ ৮০ হাজার ৭৩৫টি। তবে ডেবিট কার্ড ও প্রিপেইড কার্ডসহ দেশের মোট চালু কার্ড ছিল এক কোটি ৩৩ লাখ ৭৩ হাজার ৬৬৭টি।

দেশে চালু ক্রেডিট কার্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সিটি ব্যাংক, ইবিএল স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও ব্র্যাক ব্যাংকের ইস্যু করা ক্রেডিট কার্ড।

তবে দীর্ঘদিন ধরেই ক্রেডিট কার্ডের ঋণের সুদহার অন্যান্য ঋণের থেকে বেশি। ক্রেডিট কার্ডের সুদহার সহনীয় মাত্রায় রাখার জন্য গত বছরে মে মাসে ক্রেডিট কার্ড নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ভোক্তা ঋণের সর্বোচ্চ সুদহারের সঙ্গে আরো ৫ শতাংশ যোগ করে ক্রেটিট কার্ডের ঋণের সুদহার নির্ধারণের সুযোগ দেওয়া হয়। তবে পরে ব্যাংকগুলোর চাপে ওই বছরের আগস্টে ওই নির্দেশনা বদলে বিদ্যমান ঋণের মধ্যে সর্বোচ্চ সুদহারের সঙ্গে আরো ৫ শতাংশ সুদ যোগ করে ক্রেডিট কার্ডের ঋণের সুদহার নির্ধারণের সুযোগ দেওয়া হয়। চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি থেকে এই নীতিমালা কার্যকর করতে বলা হয়।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অনেক ব্যাংকই চলতি মাসের ১ তারিখ থেকে বিদ্যমান অনেক ঋণের সুদহার কমিয়ে এনেছে। সেই বিবেচনায় ক্রেডিট কার্ডের ঋণের সুদহার কমিয়ে আনছে না কোনো ব্যাংকই। ক্রেডিট কার্ডে ‘মার্কেট শেয়ার’ বেশি এমন দুই ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা কেউই তাতে সাড়া দেননি।

জানতে চাইলে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ক্রেডিট কার্ড কোনো ঋণ পণ্য নয়। এটি একটি বিলাসী পণ্য। তা ছাড়া এটা দিয়ে কোনো গ্রাহককে ঋণ করতে বাধ্য করা হচ্ছে না। এটা মূলত কেনাকাটার জন্য দেওয়া হয়। এটা দিয়ে একজন গ্রাহক ৪৫ দিন পর্যন্ত বিনা সুদে ব্যাংকের টাকায় কেনাকাটা করতে পারে। কেউ যদি ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ঋণ করতে চায় তাহলে তাকে একটু বেশি সুদ দিতে হবে। সারা বিশ্বেই ক্রেডিট কার্ডের সুদহার বেশি।’

তিনি আরো বলেন, ‘ব্যাংকগুলো অনেক ধরনের ঋণের সুদহার কমিয়েছে। তার পরও কোনো কোনো ঋণের সুদহার ১৮-১৯ শতাংশ আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, বিদ্যমান ঋণের মধ্যে যেটা সর্বোচ্চ হার সেই হারের সঙ্গে ৫ শতাংশ যোগ করে ক্রেডিট কার্ডের সুদহার নির্ধারণ করতে। ব্যাংকগুলো সেটাই করছে।’



মন্তব্য