kalerkantho


ঋণের সঙ্গে প্রচারেও থাকবে চীন

আবুল কাশেম   

১৬ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



ঋণের সঙ্গে প্রচারেও থাকবে চীন

এত দিন অনেকটা নীরবে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ঋণ দিয়ে গেছে চীন। ঋণের সঙ্গে ঠিকাদারি করেই ক্ষান্ত ছিল দেশটি। তবে সে অবস্থান পাল্টাতে শুরু করেছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি। ঢাকার চীনা দূতাবাস সরকারকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, দুই দেশের সরকার পর্যায়ে যেসব প্রকল্প বাংলাদেশে বাস্তবায়ন হবে, তা এককভাবে বাংলাদেশ সরকার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে পারবে না। প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের আগে অবশ্যই চীনকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে জানাতে হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, গত ২১ মার্চ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) একটি নোট ভারবাল পাঠিয়ে ঢাকার চীন দূতাবাস থেকে চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে চারটি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রকল্প পাঁচটি হলো দেশেরকান্দি স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লাট, ন্যাশনাল আইসিটি ইনফ্রা-নেটওয়ার্ক ফর বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট (ধাপ-৩), কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে মাল্টিলেন টানেল নির্মাণ ও বাংলাদেশ-চীন ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টার প্রকল্প। ওই নোট ভারবালে চীনা দূতাবাস জানতে চায় যে এসব প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রস্তুতি আছে কি না।

ওই চিঠি পাওয়ার পর ইআরডির কর্মকর্তারা একটি আন্ত মন্ত্রণালয় সভা ডাকে। সেখানে এসব প্রকল্পের সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় জানা যায় যে ওই চারটি প্রকল্পের বেশির ভাগেরই ভিত্তিপ্রস্তর এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্থাপন করেছেন। তখন ইআরডি চীনা দূতাবাসকে জানায় যে এসব প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর প্রধানমন্ত্রী স্থাপন করেছেন, তাই নতুন করে একই প্রকল্পের আবারও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠান আয়োজনের কোনো দরকার নেই। ইআরডির ওই বক্তব্য জানার পর চীনের তরফ থেকে জানানো হয় যে দুই দেশের সহায়তায় বাংলাদেশে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে,  চীনকে না জানিয়ে ভবিষ্যতে ওই সব প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা যাবে না।

বাংলাদেশে চীনের অর্থায়নে চলমান বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে সম্প্রতি ইআরডির ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত জাং ঝুর একটি বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকের বিস্তারিত তথ্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে ইআরডি। তাতে চীনা সহায়তায় বাস্তবায়ন হওয়া প্রকল্পগুলোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন সম্পর্কে এসব তথ্য রয়েছে।

বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পের বেশির ভাগই চীনের ঋণে বাস্তবায়ন হচ্ছে। এসব প্রকল্পে অর্থায়নও হচ্ছে চীন থেকে ঋণ নিয়ে। চীনা ঋণে বাংলাদেশের দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও এ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। কারণ, চীনা অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে চীনা কম্পানিকেই কাজ দিতে হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণসহ বিভিন্ন প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়ন না করে ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগও রয়েছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে।

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে ‘দক্ষিণ এশিয়ায় বিআরআই এবং বিবিআইএনএর গুরুত্ব’ শীর্ষক সেমিনারে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান চীনা ঋণ প্রসঙ্গে বলেন, ‘নাম বলতে চাই না, এমন একটি জায়গা থেকে ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে আমি এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) বা ভারত সরকারের কাছ থেকে ঋণ নিতে বেশি পছন্দ করব।’

ইআরডির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে চলমান ও প্রস্তাবিত বিভিন্ন প্রকল্প পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছে চীনা দূতাবাস। এর মধ্যে একটি হলো ঢাকার পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশ-চীন ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টার প্রকল্প। কয়েক বছর ধরে আলোচনা হলেও এ প্রকল্পের কাজ শুরু না হওয়ার দুটি প্রধান কারণ জানিয়েছে চীন। এর একটি হলো প্রকল্প বাস্তবায়নের পর অব্যবহৃত যেসব স্টিল ও উপকরণ থাকবে, সেগুলো কী হবে—তা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেই। অন্যটি হলো—এখনো প্রকল্পটির নীল নকশা প্রণয়ন করতে পারেননি প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।

কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণ প্রকল্প সম্পর্কে প্রকল্প পরিচালক জানান, সংশোধিত নকশায় টানেলের অ্যালাইনমেন্ট বা বিন্যাস পরিবর্তন করা হয়েছে। এ প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব ডেপুটি কমিশনার অফিসে পাঠানো হয়েছে। চীনা পক্ষ জানায় যে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রকল্প এলাকায় প্রায় ১০০ ধরনের যন্ত্র আনা হচ্ছে, সেগুলো রাখতে আরো বেশি জমির দরকার হবে। চীনা পক্ষ জমি অধিগ্রহণ দ্রুততর সময়ে সম্পন্ন করার অনুরোধ জানায়।

কক্সবাজারের মহেশখালীতে ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং উইথ ডাবল পাইপলাইন স্থাপন’ প্রকল্পের মহেশখালীতে জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এ জন্য চট্টগ্রামে জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। মাতারবাড়ীতে ১ ও ৩ নম্বর জেটি নির্মাণ ও এক্সেস রোড নির্মাণকাজও চলছে। এ প্রকল্পের জন্য ঋণ কার্যকর করার ঘোষণা পেতে দেরি হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে বলে ওই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। চীনা এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধিও সে সময় উপস্থিত ছিলেন।

পদ্মা ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের প্রকল্প পরিচালক জানান, জমি অধিগ্রহণে সমস্যার কারণে পাইপলাইন স্থাপনে বিলম্ব হচ্ছে। চীনা পক্ষ জানায় যে আগামী সেপ্টেম্বর শেষে ঠিকাদার সরকারের কাছে প্রকল্পটি হস্তান্তর করবে। তখন চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধি জানান যে আগামী নভেম্বর মাসেই এই ঋণের মেয়াদ শেষ হবে। তাই এই সময়ের মধ্যেই সব কিছু সম্পন্ন করতে হবে।

ডিপিডিসির আওতাভুক্ত এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্প মূল্যায়ন ও নথিপত্র বিনিময়ে আরো তিন-চার মাস সময় লাগবে বলে জানিয়েছে চীনা এক্সিম ব্যাংক। প্রকল্পটি যাতে দ্রুত বাস্তবায়ন শুরু করা যায় সে জন্য আগেই খসড়া ঋণ চুক্তি চেয়েছে ঋণদাতা ব্যাংকটি। একই অবস্থা পিজিসিবির পাওয়ার গ্রিড শক্তিশালীকরণ প্রকল্পেরও।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ছয়টি পূর্ণাঙ্গ স্টেশন নির্মাণ প্রকল্পের জন্য চীনা ঋণ পেতে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে ইআরডির কাছে আবেদন পাঠানো হয়েছে। ইআরডি তা চীনা দূতাবাসকে দিয়েছে। দূতাবাস তাদের কর্তৃপক্ষকে পাঠাবে। রবিবার তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এ প্রসঙ্গে বলেছেন, চীনের সহযোগিতায় ছয়টি বিভাগীয় শহরে ছয়টি পূর্ণাঙ্গ টিভি স্টেশন হবে। দুই মাসের মধ্যেই এ বিষয়ে চীনের সঙ্গে চুক্তি হবে। এখন জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার প্রকল্প’ সম্পর্কে চীনা দূতাবাস বলেছে, এ প্রকল্প কোথায় বাস্তবায়ন হবে, তা আগে চিহ্নিত করতে হবে। এটি হলে চীন সেখানে সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখবে। আর সরকার যদি এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে আগ্রহী না হয়, সে ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে তা জানাতে বলে দূতাবাস। এ ছাড়া, ‘মেডিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট প্রকল্প’ সম্পর্কে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায় যে প্রকল্প তৈরির কাজ শিগগিরই শেষ হবে। এ প্রকল্পের ‘হ্যান্ডওভার’ অনুষ্ঠান আয়োজনে মন্ত্রণালয়কে প্রস্তুতি নিতে অনুরোধ করে দূতাবাস।

‘দ্য হাইব্রিড রাইস টেকনিক্যাল কো-অপারেশন প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করবে চীন। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি চীনা কম্পানিটি প্রকল্প তৈরির কাজ শেষ করেছে। প্রকল্প মূল্যায়ন ও পরিদর্শন করতে একটি প্রতিনিধিদল ১৪-১৯ মার্চ বাংলাদেশ ঘুরে গেছে। এ প্রকল্প নিয়ে একটি হ্যান্ডওভার অনুষ্ঠান আয়োজন করতে কৃষি মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছে চীন।

চীনা ইকোনমিক ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন ও সরকারি পাটকলগুলো আধুনিকায়নে এখনো অর্থায়ন করেনি চীন। চীনা পক্ষ জানিয়েছে, প্রেফারেন্সিয়াল বায়াস্ড ক্রেডিট বা চড়া সুদের ঋণ নিলে অল্প সময়ের মধ্যে তা নিশ্চিত করবে বাংলাদেশকে। আরো ১২টি প্রকল্প রয়েছে যেগুলোতে অর্থায়নের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করেনি চীন। ইআরডি আশা করছে, ২০১৮ সালের মধ্যে না পেলেও ২০১৯ সালে এসব প্রকল্পে অর্থায়ন করবে দেশটি।



মন্তব্য