kalerkantho


রাজস্ব ফাঁকি রোধে এবার শুরু থেকেই ব্যবস্থা

ফারজানা লাবনী   

১৫ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



রাজস্ব ফাঁকি রোধে এবার শুরু থেকেই ব্যবস্থা

ন্যূনতম ৫০ লাখ টাকা বকেয়া আছে, এমন করদাতাদের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) তলব করা হবে। নির্ধারিত সময়ে উেস কর না দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় ও সঞ্চয়ের হিসাব খতিয়ে দেখা হবে। ৩০ লাখ টাকা বা তার বেশি ভ্যাট অনলাইনে পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সব কার্যক্রম নিবিড়ভাবে নজরদারি করা হবে। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি আইনের আওতায় আসতে এনবিআর থেকে আহ্বান জানানোর পরও না এলে, অবশ্যই তার যথাযথ কারণ জানাতে হবে। এ ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য দিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। চট্টগ্রাম বন্দরসহ বিভিন্ন বন্দরে নজরদারি বাড়াতে হবে।

বকেয়া আদায়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এনবিআরে চিঠি পাঠিয়ে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে এসব নির্দেশ বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। এনবিআর চেয়ারম্যানের দপ্তরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ চিঠি গত বৃহস্পতিবার গ্রহণ করা হয়। এসব নির্দেশ সামনে রেখে গত রবিবার এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া এনবিআরের আয়কর, ভ্যাট, শুল্ক শাখার তিন সদস্য, এনবিআর তিন গোয়েন্দা শাখার প্রতিনিধিদের নিয়ে দীর্ঘ বৈঠক করেন। বৈঠকে বকেয়া আদায়ে এসব নির্দেশনার পাশপাশি আরো নতুন নতুন কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয়। এ ছাড়া বিদায়ী অর্থবছরে কার্যকর হওয়া বিভিন্ন কৌশল চলতিবারেও অব্যাহত থাকবে।

এনবিআরে পাঠানো অর্থ মন্ত্রালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, অর্থবছরের শেষ সময়ে লক্ষ্যমাত্রায় ঘাটতি দেখা দিলে এনবিআরকে রাজস্ব ফাঁকিবাজদের কাছ থেকে বকেয়া আদায়ে বেশি নজর দিতে দেখা যায়। বহুদিনের এ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অর্থবছরের শুরু থেকে এ বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। এতে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, জাতীয় বাজেট বাস্তবায়নের স্বার্থে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হবে। দেশের উন্নয়নে সরকারের গ্রহণ করা প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। এ জন্য নিয়মিত আদায়ের সঙ্গে বকেয়া আদায়ে কঠোর হতে হবে। নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে রাজস্ব ফাঁকিবাজদের কাছ থেকে হিসাবমতো আদায় করতে হবে। কোনো রাজস্ব দপ্তর লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে জবাবদিহি করতে নির্দেশ দেওয়া হয় চিঠিতে।

আয়কর খাতে বকেয়া আদায়ে সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলের কর কমিশনারের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি রাজস্ব ফাঁকিবাজ ব্যক্তিকে তলবের পর জিজ্ঞাসাবাদ করবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলের কর কমিশনার প্রয়োজনে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের (সিআইসি) মহাপরিচালক বরাবর চিঠি পাঠিয়ে বিষয়টি জানাবেন। মহাপরিচালক জিজ্ঞাসাবাদের গুরুত্ব বিবেচনায় এনবিআর চেয়ারম্যানের অনুমতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলে সিআইসির এক বা একাধিক প্রতিনিধি পাঠাবেন। তাঁদের উপস্থিতিতে রাজস্ব ফাঁকিবাজ করদাতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলের কর্মকর্তারা আয়-ব্যয় ও সঞ্চয় সম্পর্কিত তথ্য খতিয়ে দেখবেন। তবে দীর্ঘদিনের কর ফাঁকিবাজের ক্ষেত্রে সিআইসি সব হিসাব যাচাই করবে।

বছরের পর বছর নিষ্পত্তি না হওয়া মামলায় বড় অঙ্কের রাজস্ব অনাদায়ী আছে। চলতি বছর এনবিআরের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে এসব মামলার মধ্যে যেসব বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি আইনে নিষ্পত্তি হওয়া সম্ভব, তা চিহ্নিত করবে। বিকল্প বিরোধ আইনে মামলা নিষ্পত্তিতে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যথাযথ কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানাতে হবে। ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি আইনের আওতায় না এলে তার যথাযথ কারণ এনবিআরকে জানাতে বলা হবে। এ ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য দিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে অডিটের আওতায় আনা হবে। তদন্তে আয়-ব্যয়ে মিথ্যা তথ্য ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কর আদায়ের নিরাপদ খাত হওয়ায় এনবিআরের উেস করে নির্ভরতা বাড়ছে। গড়ে আয়কর খাতের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ উেস কর থেকে আদায় করা হয়। গত বারের আগের অর্থবছরে ৬৪ হাজার ২৮ কোটি টাকার আয়কর আদায়ে ৩৩ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা উেস কর থেকে পাওয়া যায়। অনেকে রিটার্ন দাখিল না করে বা মিথ্যা তথ্যে রিটার্ন জমা দিয়ে উেস করে ফাঁকি দিয়ে থাকে। চলতিবারে  উেস কর পরিশোধে সংশ্লিষ্টদের বাধ্য করতে নিবিড় নজরদারি করা হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান উেস কর প্রদান করে না তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অডিট করা হবে। বর্তমানে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা ও ব্যাংক আমানতের সুদ আয়, সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশনে প্রচারিত বিজ্ঞাপন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে কারিগরি সেবা প্রদানকারী বা সেবা সরবরাহকারী এজন্টের ফি, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ঠিকাদারের ফিসহ ৫৬ খাত থেকে উেস কর আদায় করা হয়।

আয়-ব্যয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অনেক বড় ও মাঝারি মাপের প্রতিষ্ঠান প্যাকেজ ভ্যাটের আওতায় নামমাত্র রাজস্ব পরিশোধ করে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করতে সঠিক হিসাবে আদায়ে ভ্যাট গোয়েন্দাদের নজরদারি বাড়াতে বৈঠকে নির্দেশ দেওয়া হয়। হঠাৎ উপস্থিত হয়ে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের বেচাকেনার তথ্য যাচাই করতে বলা হয়। একইভাবে মিথ্যা ঘোষণায় বা চোরাই পথে পণ্য এনে বাজারে বিক্রি করছে, এমন পণ্য আটকে এবং দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করতে বলা হয়। বিশেষভাবে হুন্ডি পাচারকারীদের আটকে আরো বেশি অভিযান পরিচালনায় নির্দেশ দেওয়া হয়।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. সহিদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন অর্থবছরের শুরুতেই বকেয়া আদায়ে এবং রাজস্ব ফাঁকিবাজদের আটকাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কর্মপরিকল্পনা করা হয়েছে। এসব বাস্তবায়নে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতবারের চেয়ে আরো কঠোর এবং নিবিড়ভাবে কর্মকর্তারা কাজ করবেন।’



মন্তব্য