kalerkantho


চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে ধস

এম সায়েম টিপু   

১৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে ধস

চামড়া ও চামড়াজাত শিল্পে রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও প্রবৃদ্ধিতে ধস নেমেছে। দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এই খাতকে ২০১৭ সালে বর্ষপণ্য ঘোষণা করা হলেও তেমন অগ্রগতি নেই। সংশ্লিষ্টদের দাবি, রপ্তানি আয় ধরে রাখতে শিগগিরই সাভারের চামড়া পল্লীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), অবকাঠামোসহ শ্রমিকদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এটা করা না গেলে আসছে ঈদুল আজহার পর অনেক ট্যানারি কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

গত অর্থবছরের (২০১৭-১৮) রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে রপ্তানি আয় হয়েছে ১০৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। এ আয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২১.৩৪ শতাংশ কম। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩৮ কোটি ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রপ্তানিতে আয় হয়েছিল ১২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

খাতওয়ারি চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শুধু চামড়া রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১৮ কোটি ৩১ লাখ ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৩.৭১ শতাংশ কম। চামড়াজাত পণ্য থেকে আয় হয়েছে ৩৩ কোটি ৬৮ লাখ ডলার। এ আয়ও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৭.৬৩ শতাংশ কম। তবে চামড়ার জুতা রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলেও এর আগের অর্থবছরের চেয়ে ৫.৩৩ শতাংশ বেশি আয় হয়েছে। এ সময় জুতা থেকে আয় এসেছে ৫৬ কোটি ৫৬ লাখ ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আয় হয়েছিল ৫৩ কোটি ৬৯ লাখ ডলার।

জানা যায়, বিশ্বে চামড়াজাত পণ্যের বাজার  ২২ হাজার কোটি ডলারের বেশি। এ বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব খুবই কম। এ ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা পরিবেশগত ক্ষতি ও নেতিবাচক শ্রম পরিবেশ। তবে সরকারের নীতিনির্ধারকরাও এর প্রতি গুরুত্ব দেয়। সেই অনুসারে রাজধানী থেকে সাভারের চামড়া পল্লীতে ট্যানারি স্থানান্তরও করা হয়। তবে ২০০৩ সালে সাভারের চামড়াশিল্পের কাজ শুরু হলেও সিইটিপি এখনো পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে রাজধানী থেকে সাভারের ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের কথা থাকলেও আদালতের নির্দেশনায় ২০১৭ সালের এপ্রিলে হাজারীবাগের ২২২টি কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই সব কারখানার মধ্যে ১১৫টি ট্যানারি আংশিক বা কেউ পুরোপুরি চালু করতে পেরেছেন। এখনো উৎপাদনে যেতে পারেনি ৭০টি কারখানা। এর ফলে কোরিয়া ও ইতালির অনেক ক্রেতা আমাদের দেশ থেকে চামড়া নেওয়া বন্ধ করে দেয়। তাদের এখনো ফেরানো যায়নি। অন্যদিকে সিইটিপির কাজ শেষ না হওয়ায় পরিবেশের দোহাই দিয়ে আসছে না ইউরোপের ক্রেতারা।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং চীনের মধ্যে শুরু হয়েছে বাণিজ্য যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র চীনের পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করায় আমাদের কাঁচা চামড়ায় দেশটি দাম কম দিতে চায়। এ ছাড়া সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে সরকার মালিকানা হস্তান্তর না করায় তাদের ব্যাংকঋণ পেতে নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। ফলে আসন্ন কোরবানির ঈদে চামড়া সংগ্রহে ব্যবসায়ীরা সংকটের আশঙ্কা করছেন।

দেশের অন্যতম জুতা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বে গ্রুপের চেয়ারম্যান শামসুর রাহমান বলেন, ‘চীন বাংলাদেশ থেকে চামড়া আমদানি করে। ওই চামড়া থেকে জুতা তৈরি করে তারা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দেয়। তাই চলমান বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে বাংলাদেশের জুতা রপ্তানি কিছুটা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে কাঁচা চামড়া রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা থাকলেও সার্বিকভাবে চামড়া খাতে মূল্যসংযোজন করা গেলে দেশের রপ্তানি আয় আরো বাড়বে।’ কেননা দেশে যেসব চামড়াজাত প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে বিনিয়োগ করেছে তারা তাদের উৎপাদন দিগুণ করবে। একই সঙ্গে স্থানীয় কাঁচা চামড়ার দামও বাড়বে বলে তিনি আশা করেন।

বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন মহাসচিব টিপু সুলতান বলেন, ‘সাভারের ট্যানারি পল্লীতে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট কাটলেও সেখানকার রাস্তাঘাটের অবস্থা বেহাল। সিইটিপি এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। গড়ে ওঠেনি কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ফলে আসন্ন কোরবানির ঈদের সময় থেকে অনেক ট্যানারি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’

এ ছাড়া তিনি আরো বলেন, ‘এটা সরকারের নির্বাচনের বছর : সরকারের জন্যও একটা স্পর্শকাতর সময়। আমরা মনে করি, চামড়া পল্লীর এমন বেহাল দশা আগামী জাতীয় নির্বাচনে বড় ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। তাই শ্রমিকের জন্য আবাসন থেকে শুরু করে তাদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া এখনই জরুরি সময়।’



মন্তব্য