kalerkantho


রংপুরের গঙ্গাচড়া বেনারসি পল্লী

বেতনবৈষম্যে ম্লান ঈদ আনন্দ

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



বেতনবৈষম্যে ম্লান ঈদ আনন্দ

ঈদকে ঘিরে রংপুরের গঙ্গাচড়ার বেনারসি পল্লী যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। কারিগরদের দম ফেলারও যেন ফুরসত নেই। তাঁত বোনা যন্ত্রের খট খট শব্দে মুখরিত পুরো পল্লী। ঈদের আগেই ক্রেতাদের বাহারি রং ও নতুন ডিজাইনের শাড়ি, জামা তুলে দিতে ব্যস্ত তারা। তবে মজুরি বাড়েনি কারিগরদের। বিলুপ্তপ্রায় এই বেনারসি পল্লীকে টিকে রাখতে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া হলেও কারিগররা ন্যায্য মজুরি না পাওয়ায় পল্লী ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

২০০৫ সালে গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘণ্টা ইউনিয়নের তালুক হাবু গ্রামের ৬৭টি তাঁতি পরিবার নিজস্ব উদ্যোগে গড়ে তোলেন বেনারসি পল্লী। নিখুঁত বুনন ও মানসম্মত বেনারসি শাড়ি তৈরির কারণে এখানকার কারিগরদের কদর বাড়তে থাকে। কিন্তু পুঁজি সংকট ও বিপণন সমস্যার কারণে এই সুযোগ বেশিদিন ধরে রাখা যায়নি। বন্ধ হয়ে যায় ৫০টি তাঁত। বেকার হয়ে পড়ে প্রায় পাঁচ শতাধিক কারিগর। পথে বসে তাঁত মালিকরা। এই শিল্পের শ্রমিক-মালিকদের বাঁচাতে এগিয়ে আসে সরকার। বেনারসি পল্লী প্রকল্পের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয় দুই কোটি ৩৭ লাখ ৭২ হাজার টাকা। এ ছাড়া উত্পাদিত বেনারসি শাড়ি বিক্রি ও প্রদর্শনের জন্য ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে রংপুরে এবং ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ঢাকায় একটি প্রদর্শনী কেন্দ্র স্থাপনের কাজও শুরু হয়। এই অঞ্চলে বেনারসি শিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য ২০ জন করে আটটি গ্রুপকে মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

স্থানীয় কারিগররা জানায়, একটি বেনারসি শাড়ি তৈরি করতে খরচ হয় ছয় হাজার টাকা। সময় লাগে চার-পাঁচ দিন। বিনিময়ে তারা পায় দুই হাজার টাকা। এই শাড়িটি বাজারে বিক্রি হয় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা। নাওয়া-খাওয়া ভুলে সারা দেশের ঈদের বাজারে বেনারসি সরবরাহে দিন-রাত পরিশ্রম করছে তারা। তাঁত শ্রমিক গিয়াস উদ্দিন, জয়নাল, মাফুজার, মাজিদ, জাকির জানান, মালিকপক্ষ মজুরি হিসেবে প্রতিটি শাড়ির জন্য ৫০০ টাকা থেকে সাড়ে ৫০০ টাকা দেয়। সপ্তাহে পাওয়া যায় এক হাজার ৫০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকা। এতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। শাড়িতে সুতা তোলাসহ অন্যান্য কাজে নিয়োজিত মহিলা শ্রমিক সাবিনা, জুলেখা, জমিলা, আমেনা, সুফিয়া জানান, একটি শাড়ির সুতা তুলতে তাঁরা ২৫ থেকে ৩০ টাকা মজুরি পান। পুরো সপ্তাহে ২০টি শাড়ির বেশি সুতা তোলা সম্ভব হয় না। এ টাকায় কষ্ট করে সংসার চালাতে হয়। মালিকরা জানান, একটি বেনারসি শাড়ি তৈরিতে খরচ পড়ে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। চার থেকে পাঁচ দিন খাটুনির পর কারিগররা পান দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। সেই শাড়ি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিক্রি হয় সাত থেকে আট হাজার টাকা।

তবে রোজার মাসে বেনারসি পল্লীতে কাজের ব্যস্ততা বাড়লেও পল্লীর শ্রমিকদের ভাগ্যের খুব একটা হেরফের হয়নি। অন্যের জন্য নতুন নতুন ডিজাইনের বেনারসি তৈরির কাজে নিয়োজিত তাঁতিরা আয়ের সামান্য টাকায় নিজের সন্তানের জন্য ঈদের কাপড়ও কিনতে পারে না। অথচ তাদের সুনিপুণ হাতে তৈরি সুন্দর সুন্দর শাড়ি বিত্তবান নারীদের সৌন্দর্য বর্ধন করে আসছে। ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেই তাদের বেঁচে থাকতে হয়। তাঁত মালিকরা জানান, মহাজনদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকার কারণে উত্পাদিত বেনারসি বাজারের চেয়ে অনেক কম মূল্যে তাদের কাছেই দিতে হয়।

গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘণ্টা ইউনিয়নের তাঁত মালিক ও বেনারসি পল্লীর প্রতিষ্ঠাতা আব্দুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কাছ থেকে শাড়ি নিয়ে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করে ব্যবসা করছে ঢাকার মহাজনরা। আমরা তাদের টাকায় সুতা ও রং কেনায় তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছি। চোখের সামনেই আমাদের লাভ তারা নিয়ে যাচ্ছে। অথচ আমরা ছেলে-মেয়ে নিয়ে কোনো রকমে টিকে আছি এই পেশায়।’ ঈদ উপলক্ষে বেনারসি শাড়ি তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটালেও কারিগরদের কারো মুখে হাসি নেই। যন্ত্রের মতো তারা একনাগাড়ে কাজ করেই চলছে। ব্যস্ততা বাড়লেও বাড়েনি তাদের মজুরি।

হাবু বেনারসি পল্লীসহ গঙ্গাচড়ার বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে ১৩২ জন মালিকের প্রায় ৬০০ তাঁত রয়েছে। এখানে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পুরুষ ও ৪০০ মহিলা শ্রমিক কাজ করছে। প্রতিবছর এ পল্লী থেকে প্রায় এক হাজার পিস শাড়ি উত্পাদন করা হয়। এসব শাড়ি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হয়। অথচ এই পল্লীতে নেই কোনো আধুনিক ডায়িং মেশিন। ডায়িংয়ের কাজ ঢাকায় করানো হয় বলে তাঁত মালিকরা জানান। একটি ডায়িং মেশিনের দাম প্রায় কোটি টাকা, যা ক্রয়ের সাধ্য তাঁতিদের নেই। সংগত কারণে এখানকার তাঁতিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।



মন্তব্য