kalerkantho


ফেরত আসেনি ইইএফের ২০২৫ কোটি টাকা

২% সুদে ইএসএফ নামে নতুন তহবিল আসছে

আবুল কাশেম   

২১ মে, ২০১৮ ০০:০০



ফেরত আসেনি ইইএফের ২০২৫ কোটি টাকা

জমি আছে, পুকুর আছে কিংবা পরিকল্পনা আছে। কিন্তু পুঁজি নেই। আছে বিনিয়োগ ভাবনাও। কৃষি, মৎস্য ও আইটি খাতে এ শ্রেণির ব্যক্তিদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে বিনা সুদে আট বছরের জন্য সরকার থেকে টাকা দেওয়া শুরু হয়েছিল ২০০১ সালে। সেই থেকে টাকা শুধু দিয়েই যাচ্ছে সরকার। এভাবে গত ১৭ বছরে সরকার বিলি করেছে ২০২৫ কোটি টাকা। আট বছর পর টাকা ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও ফেরত আসছে না কোনো টাকা। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানে দেওয়া অর্থের বিপরীতে কাগজে-কলমে ওই কম্পানির ৪৯ শতাংশ মালিকানা আছে সরকারের। কিন্তু বিনা সুদে টাকা নিয়ে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের পর বছর ধরে লোকসান দেখানোর কারণে মালিকানা থেকেও কোনো লভ্যাংশ পাচ্ছে না সরকার। নিজের শেয়ার বিক্রি করতে গিয়ে মামলা করেও সুফল পাচ্ছে না সরকার। কারণ, সরকার নিজেই কম্পানির মালিক হওয়ায় মামলা করেও শেয়ার বিক্রি করতে পারছে না। বিলিয়ে দেওয়া টাকা ফেরত পেতে অন্য কোনো পথও আপাতত খোলা নেই সরকারের সামনে। এ অবস্থায় যে তহবিল থেকে বিনা সুদে টাকা দেওয়া হয়েছে সেই ইক্যুইটি অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ ফান্ড (ইইএফ) তহবিলই এখন বন্ধ করে দিচ্ছে সরকার। তার বদলে ২ শতাংশ সরল সুদে এন্টারপ্রেনারশিপ সাপোর্ট ফান্ড (ইএসএফ) নামে নতুন একটি তহবিল চালু করতে যাচ্ছে। এই তহবিল থেকে নেওয়া ঋণের মেয়াদও হবে আট বছর। ইএসএফ চালুর জন্য নতুন একটি নীতিমালার খসড়া তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। খসড়াটি চূড়ান্ত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ইএসএফ থেকেও উদ্যোক্তাদের মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৪৯ শতাংশ অর্থ ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। বাস্তবতার নিরিখে ঋণের পরিমাণ ৪৯ শতাংশের কমও হতে পারে। তিন কিস্তিতে এই ঋণ দেওয়া হবে। প্রথম কিস্তির অর্থ বিতরণের পর থেকে আট বছরে ছয় মাস অন্তর কিস্তিতে এই ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ঋণগ্রহীতা কম্পানির সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে কম্পানিতে সরকারের কোনো মালিকানা থাকবে না। কৃষি, আইসিটি ও মৎস্য খাতের পাশাপাশি ইএসএফ থেকে এই ঋণ সুবিধা দেওয়া হবে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পেও।

গত ১৫ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের ইইএফ ইউনিটের মহাব্যবস্থাপক পরিমল চন্দ্র চক্রবর্ত্তী স্বাক্ষরিত এসংক্রান্ত প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ সহায়তার অর্থ ফেরত না দেওয়ার প্রবণতা, যথাযথভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে ইইএফ সহায়তার অর্থ অন্যত্র সরানো, ইইএফ নীতিমালার দুর্বলতা, আইনি প্রক্রিয়ায় অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে আইনগত দুর্বলতা, সর্বোপরি নির্ধারিত ৮ (আট) বছরান্তে ছাড়কৃত ইইএফ সহায়তার অর্থের আদায়ের হার সন্তোষজনক না হওয়ায় এ প্রকল্পের সফলতাকে ম্লান করে দিয়েছে।’

ইইএফ তহবিল থেকে টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম হলো, কোনো ব্যক্তির ৫১ টাকার সম্পদ থাকলে সরকার তাঁকে ৪৯ টাকা দেবে। তাতে যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে সেখানে সরকারের শেয়ার থাকবে ৪৯ শতাংশ। সরকারের তহবিল থেকে টাকা নেওয়ার আট বছর পর ওই ব্যক্তি হয় টাকা ফেরত দেবেন, না হয় সরকারের ৪৯ শতাংশ শেয়ার কিনে নেবেন। কিন্তু যাঁরা টাকা নিয়েছেন, তাঁরা এর কোনোটিই করছেন না। যেহেতু ইইএফ থেকে টাকা দেওয়া হয়েছে মালিকানার বিপরীতে, তাই বিতরণ করা টাকাকে ঋণ হিসেবে দেখানো সম্ভব হচ্ছে না।

পরিমল চন্দ্র চক্রবর্ত্তী স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে নীতিমালার আওতায় ইইএফ থেকে টাকা দেওয়া হয়েছে, সেটির দুর্বলতার কারণেই টাকা আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার সঙ্গে স্বাক্ষরিত বিনিয়োগ চুক্তি অনুযায়ী, নির্ধারিত আট বছরের মধ্যে উদ্যোক্তা সরকারের শেয়ার কিনে না নিলে সরকার ওই শেয়ার অন্য কোথাও বিক্রি করবে।

‘বাস্তবতা হচ্ছে, প্রাইভেট লিমিটেড কম্পানি হওয়ার কারণে ইইএফের ক্ষেত্রে এ জাতীয় কম্পানির শেয়ার বিক্রি করা আইনত জটিল ও অকার্যকর। এখন পর্যন্ত মামলা দায়েরের মাধ্যমে কোনো অর্থ আদায় করা সম্ভব হয়নি’—বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ইইএফ ইউনিটের মহাব্যবস্থাপক পরিমল চন্দ্র চক্রবর্ত্তী।

শেয়ার বিক্রি করতে না পারলে ইইএফ থেকে দেওয়া অর্থ উদ্যোক্তার নামে ঋণ হিসেবে রূপান্তরের শর্ত রয়েছে বিনিয়োগ চুক্তিতে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে পূর্বশর্ত হলো উচ্চ আদালতের অনুমোদন নিয়ে কম্পানির পরিশোধিত মূলধন কমাতে হবে। এটি খুবই জটিল, সময়সাপেক্ষ ও অপ্রচলিত পদ্ধতি উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, এখন পর্যন্ত এ পদ্ধতি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, নির্ধারিত আট বছর পার হয়ে গেলেও সরকারের শেয়ার নিয়ে অর্থ ফেরত দিচ্ছেন না কেউই। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁদের কাছ থেকে অর্থ ফেরত পাওয়ার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় ইইএফ তহবিল বন্ধ করে দিয়ে কম সুদে ঋণ দেওয়ার জন্য ইএসএফ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।



মন্তব্য