kalerkantho


বিআইবিএমের কর্মশালায় বক্তারা

বৈদেশিক বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৫ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



বৈদেশিক বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার বাড়ছে

বিআইবিএম অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা কর্মশালায় বক্তারা

দেশের ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সেবায় বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থপাচার। দেশভেদে পণ্যের মূল্যে তারতম্য থাকায় আমদানি বা রপ্তানির বিপরীতে খোলা এলসি মূল্য যাচাইয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সূচক পাওয়া কঠিন। এর ফলে পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে বা কমিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার করা হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা ধরা সম্ভব হয় না। তা ছাড়া ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে পাচারকারীদের যোগসাজশের অভিযোগ পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটগুলোর লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরো বেশি সতর্ক হওয়া দরকার বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘ব্যাংকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সেবা’ শীর্ষক বার্ষিক পর্যালোচনা কর্মশালায় উপস্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদনের ওপর আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

কর্মশালায় আলোচকরা বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে অর্থপাচার। এই অর্থপাচারের বড় অংশ হচ্ছে ব্যাংকের মাধ্যমে। আমদানি-রপ্তানিতে পণ্য ও সেবার মূল্য বেশি বা কম দেখিয়ে (ওভার এবং আন্ডার ইনভয়েসিং), বহুমাত্রিক ইনভয়েসিং, পণ্য ও সেবা সম্পর্কে মিথ্যা বর্ণনা দিয়ে অর্থ পাচার হচ্ছে। একইভাবে পণ্য জাহাজীকরণের ক্ষেত্রেও পণের পরিমাণে কারচুপির মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে।

কর্মশালার উদ্বোধনকালে ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার বাড়ছে। তবে অর্থপাচার প্রতিরোধে কাজ করছে বাংলাদেশ ফাইন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। গত বছর থেকে ব্যাংকের সব কর্মকর্তাদের অর্থপাচার বিষয়ে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। এ সময় এলসি খোলার ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের সব ধরনের নথিপত্র যাচাই-বাছাই করতে ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস ভ্যালুশন অ্যান্ড ইন্টারনাল অডিট কমিশনারেটের কমিশনার ড. মঈনুল খান বলেন, ‘এক গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থপাচারের ৮০ শতাংশই বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে হচ্ছে। বর্তমানে এটা প্রতিরোধ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’

অর্থপাচার প্রতিরোধে পণ্যের মূল্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পণ্যের মূল্য বিভিন্ন রকম। যে কারণে এলসি মূল্য নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু ব্যাংকগুলো এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর কারখানা পরিদর্শন করে দেখতে পারে ওই ব্যবসায়ী বিপুল পরিমাণ অর্থের পণ্য আমদানি করার সক্ষমতা রাখে কি না। তা ছাড়া ওই ব্যবসায়ীর আগেকার লেনদেনের রেকর্ডও দেখতে পারে। কিন্তু আমরা যেসব অর্থপাচারের ঘটনা এ পর্যন্ত ধরতে সক্ষম হয়েছি তাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যাংকের গাফিলতি দেখতে পেয়েছি। কখনো কখনো ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে অর্থপাচারকারীদের যোগসাজশও থাকে বলে আমরা জানতে পেরেছি।’ কর্মশালায় উপস্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব পণ্য আমদানিতে কম শুল্ক দিতে হয়, বিশেষ করে মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল এবং খুচরা যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে বেশি মূল্য বা কম মূল্য দেখিয়ে অর্থ পাচার করা হয়। আবার সরকারি প্রণোদনা পেতে রপ্তানি পণ্যে বেশি মূল্য দেখানো হয়।

বিআইবিএমের চেয়ার প্রফেসর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বরকত-এ-খোদা বলেন, অর্থপাচার বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর কোনো দেশই অর্থপাচার শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে পারেনি। এটা সম্ভবও নয়। তবে অর্থপাচার সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে আনার চেষ্টা করা যায়। এ জন্য ব্যাংক কর্মকর্তাদের সততা, নৈতিকতা ও দক্ষতা একান্ত প্রয়োজন।

পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হেলাল আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘এলসি গ্যারান্টি ও ফি কমানোর জন্য বাংলাদেশকে ইউএন ভিয়েনা কনভেনশনের সদস্য হওয়া উচিত। কেননা আমাদের বেশির ভাগ রপ্তানি হয় ইউরোপ ও আমেরিকাতে। ভিয়েনা কনভেনশনের সদস্য হলে এসব দেশে রপ্তানি ফি কমবে এবং এলসির গ্যারান্টি নিশ্চিত হবে। কারণ বিশ্বের ৮৯টি দেশ ইউএন ভিয়েনা কনভেনশনের সদস্য।’ তিনি এলসি মূল্য যাচাইয়ে বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার সদস্য হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সদস্য হওয়ার পরামর্শ দেন ব্যাংকগুলোকে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাণিজ্য অর্থায়নে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের আধিপত্য বাড়ছে। ২০১১ সালে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রপ্তানি হয় ৭১ শতাংশ। সেই সময় রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে রপ্তানি হয়েছিল ১৮ শতাংশ। অবশিষ্ট অংশ বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ২০১৭ সালে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কমে নেমেছে ৫ শতাংশে।



মন্তব্য