kalerkantho


এনবিআরের হালখাতায় করদাতাদের সাড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



এনবিআরের হালখাতায় করদাতাদের সাড়া

পহেলা বৈশাখ এলেই দেশজুড়ে শুরু হয় পাওনা আদায়ের হালখাতা। ঐতিহ্য অনুযায়ী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও (এনবিআর) বকেয়া আদায়ের উৎসব শুরু করেছে। এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে করদাতাদের রাজস্ব প্রদানে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

গতকাল রবিবার রাজধানীর কর অঞ্চল-৫-এ হালখাতা উৎসব অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘হালখাতা আয়োজনের মাধ্যমে আমরা করদাতাদের সম্মানিত করার চেষ্টা করছি। করদাতাদের উৎসাহিত করতে ট্যাক্স কার্ডধারীদের সিআইপিদের (বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি) মতো সুবিধা দেওয়া হবে।’

অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলের তালিকাভুক্ত করদাতারা, বিভিন্ন অংশীজন ও গণ্যমান্য ব্যাক্তিদের অনেকে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন এনবিআর সদস্য জিয়া উদ্দিন মাহমুদ (কর প্রশাসন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা), সদস্য হাবিবুর রহমান আকন্দ (ইন্টারন্যাশনাল ট্যাক্সেস)। অনুষ্ঠানে কর অঞ্চল-৫-এর কর কমিশনার শাহীন আক্তার সভাপতিত্ব করেন।  

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘ট্যাক্স কার্ডধারীদের সিআইপি সুবিধা দিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ট্যাক্সকার্ডধারীদের  সিআইপিদের মতো এয়ারপোর্ট, সচিবালয় ও বিদেশ ভ্রমণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুযোগ দেওয়া হবে। বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। রাজস্ব প্রদানে সবাইকে উৎসাহিত করতে এনবিআর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘রাজস্ব বোর্ড জোর করে কর আদায় করতে চায় না। করদাতাদের বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে দেশের উন্নয়নে অংশীদার হতে চাইলে কর দিতে হবে। সরকার করদাতাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছে তাদের (করদাতা) গুরুত্ব কত বেশি।’

মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘দেশ নির্মাণে যে অর্থের দরকার সেই অর্থের জোগানদাতা দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা। রাজস্ব ছাড়ের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে এনবিআর সহায়তা করছে। অবকাঠামো নির্মাণে এনবিআর নীতিগত সুবিধা দিচ্ছে। আমরা বৈদেশিক নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজস্ব সম্পদের ব্যবহারে মনোযোগী হচ্ছি। দেশের বড় বড় রাস্তাঘাট, অবকাঠামো আমাদের অর্থায়নেই হচ্ছে।’

বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তবে আমাদের রাজস্ব তেমন বাড়েনি। একটি দেশের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশ থাকলে দেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্য ভালো থাকে। কিন্তু আমাদের এখনো প্রবৃদ্ধি ৯-১০ শতাংশেই আটকে আছে।’

হালখাতা উৎসব নিয়ে তিনি বলেন, ‘আবহমান বাংলার অন্যতম উৎসব হচ্ছে হালখাতা। রাজস্ব হালখাতা আয়োজনের মাধ্যমে এনবিআর এ উৎসবের অংশীদার হতে পেরেছে। করদাতাদের কাছ থেকেও ভালো সাড়া পাচ্ছি। বর্তমানে বকেয়া করের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। আশা করছি, হালখাতা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অনেক বড় অঙ্কের টাকা আদায় হবে।’

এনবিআরের রাজস্ব হালখাতা অনুুষ্ঠানে এবারের প্রতিপাদ্য হলো—‘জ্ঞানভিত্তিক আলোকিত সমাজ বিনির্মাণে সর্বস্তরে রাজস্ববান্ধব সংস্কৃতি প্রচলন’। গতকাল এনবিআরের সব আয়কর ও ভ্যাট অফিসে উৎসবের আমেজে অনেক করদাতা বা তার প্রতিনিধি উপস্থিত হয়ে বকেয়া রাজস্বের চালান ও পে অর্ডার গ্রহণ জমা দিয়েছে।

রাজস্ব হালখাতায় দিনের শুরু থেকে করদাতা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতিতে কর অফিসগুলোতে ছিল উৎসবের আমেজ।

রাজস্ব সংস্কৃতির আদলে প্রতিটি রাজস্ব দপ্তরের প্রধান ফটক ও অফিস সজ্জিত করা হয়েছে। গ্রামবাংলার ঐহিত্য মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলাগাছ, কুলা, হাতপাখা, মুখোশ, হাতির গেট আর রংবেরঙের কার্টুনে সাজানো ছিল এনবিআরের প্রতিটি দপ্তর। করদাতাদের জন্য খোলা হয় হালখাতার ঐহিত্যবাহী নতুন রেজিস্টার খাতা। মাটির সানকিতে দেওয়া হয় মিষ্টি, বাতাসা, নারিকেলের নাড়ু, সন্দেশ, খৈ, কদমা, মুরালি, নিমকি, মুড়ির মোয়া, চিঁড়ার মোয়া, তিলের খাজা, সুন্দরী পাকন পিঠা, শাহি পাকন পিঠা, নকশি পিঠা, ঝিনুক পিঠা, স্পঞ্জ রসগোল্লা, দই, ডাবের পানি, তরমুজ, পেয়ারা, বরই ইত্যাদি।

২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে ‘রাজস্ব হালখাতা’ আয়োজন করে এনবিআর। গত বছর প্রথমবারের আয়োজিত রাজস্ব হালখাতায় সারা দেশে মোট ৫৬৬ কোটি টাকা বকেয়া রাজস্ব আদায় হয়। এর মধ্যে আয়কর থেকে ৩০৬ কোটি, শুল্ক থেকে ২০৭ কোটি এবং মূসক থেকে ৫৩ কোটি টাকা আদায় হয়।

বৃহৎ করদাতা ইউনিট (আয়কর) এ বকেয়া পরিশোধে এসে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এনভয় গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল সালাম মুর্শেদী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এক দিনের চিরচেনা এনবিআরের ভীতিকর পরিবেশ এখন আর নেই। আমার মনে হচ্ছে, আমি করপোরেট কালচারের একটি অফিসে এসেছি। সেখানে আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশে সবাই কাজ করছে। আজকের পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে করদাতা এবং এনবিআর হাতে হাত ধরে চলতে পারবে।’

গতকাল কর অঞ্চল-৫-এ আদায় হয়েছে ১০ কোটি ছয় লাখ টাকা। এনবিআরের অন্যান্য দপ্তরেও করতাদারা বকেয়া পরিশোধ করেছে।

কর অঞ্চল-৫-এ উল্লেখযোগ্য রাজস্ব প্রদানকারী করদাতাদের গতকালের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান হলো ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোং লিমিটেড  চার কোটি ৮৫ লাখ টাকা, চাদনী টেক্সটাইল মিল লিমিটেড এক কোটি ৮১ লাখ টাকা, প্রিমিয়ার এলপি গ্যাস লিমিটেড এক কোটি ৪০ লাখ টাকা, বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াস লিমিটেড এক কোটি টাকা এবং ইউনিভার্সেল বিজনেস মেশিন লিমিটেড এক কোটি টাকা প্রদান করে।



মন্তব্য