kalerkantho


সানেমের ত্রৈমাসিক পর্যালোচনা

ব্যাংক খাতে অদক্ষতায় বছরে ক্ষতি ১০ হাজার কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৫ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



ব্যাংক খাতে অদক্ষতায় বছরে ক্ষতি ১০ হাজার কোটি টাকা

গতকাল সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান

কয়েক বছর ধরে দেশের ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের অস্থিরতা শুরু হয়েছে। আর এসব অস্থিরতার প্রধান কারণ অদক্ষ ব্যবস্থাপনা। ফলে বাংকিং খাতে একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারি হচ্ছে। এসব কারণে গত অর্থবছরে (২০১৬-১৭) যে ক্ষতি হয়েছে এর আর্থিক মূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশের সমান। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) গবেষণায় এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির ত্রৈমাসিক পর্যালোচনা উপলক্ষে গতকাল বুধবার রাজধানীর গুলশানে হোটেল ওয়েস্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান। পর্যালোচনায়  দেশের অর্থনীতির অগ্রগতির পথে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা হয়।

ড. সেলিম রায়হান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতে কাঠামোগত অব্যবস্থাপনার ফলে এমন সংকট বেড়েই চলেছে। এ ছাড়া এ খাতে অত্যধিক মাত্রায় খেলাপি ঋণ রয়েছে, যা বর্তমানে  ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের কিছু বেসরকারি ব্যাংকের অত্যধিক মাত্রায় ঋণ দেওয়ার কারণে এডিআর (বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ ও আমানতের রেশিও) ৯০ ভাগের ওপরে দাঁড়িয়েছে। এই ধরনের অত্যধিক ঋণদানের কারণে  বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে।

এ বিষয়ে উদ্বেগের প্রকাশ করে সেলিম রায়হান বলেন, এই ঋণের একটা বড় অংশ অপচয় হচ্ছে। দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যবেক্ষণ ব্যাংকিং খাতের একটা বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দ্বারা সমর্থিত অনিয়মের কোনো দৃশ্যমান শাস্তি হয়নি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারায় এ সমস্যা আরো প্রকট আকার ধারণ করছে। রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো তাদের তহবিলের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে জমা রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সিআরআরকে ১ শতাংশ কমিয়ে সাড়ে ৫ শতাংশে আনার ফলে ব্যাংকিং খাতে একটি বড় সংকট সৃষ্টি হতে পারে।

সঞ্চয়পত্রের ওপর সুদের হার কমানো যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশে পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) চলতি অর্থবছর ৭.৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির যে প্রাথমিক হিসাব করেছে সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রেমিট্যান্স ও রপ্তানির ওপর ভর করে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, এই সূচকগুলো আগের বছরের চেয়ে ভালো হলেও উপখাতগুলোর পূর্ণাঙ্গ তথ্য না থাকার কারণে পর্যালোচনা করা যাচ্ছে না।

দেশের উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ, বিশেষত এসডিজির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য কর আদায় প্রচেষ্টা বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আরো উন্নতি করতে হবে। প্রকল্প ব্যয়ের ক্ষেত্রে, বাস্তবায়ন হার এবং খরচের গুণগত মান উভয়ই যথেষ্ট পরিমাণে বাড়ানো উচিত। প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতা এবং অপব্যবহার কমিয়ে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে খরচ করতে হবে। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, সামাজিক ক্ষেত্রের পাশাপাশি স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা খাতেও অর্থ বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধি করতে হবে।

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ফলে বাংলাদেশের কিছু আশঙ্কার কারণ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশের আনুষ্ঠানিক মর্যাদা পেলেও ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশের সুযোগ সুবিধা ভোগ করবে। পরবর্তী সময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ভারত ও চীনের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রবেশের সুবিধা হারাবে। যার ফলে দেশের মোট রপ্তানি ১১ শতাংশ কমে যাবে, যার আর্থিক আকার ৬০০ কোটি ডলারের সমতুল্য হতে পারে। এ ছাড়া, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার শুল্কমুক্ত সুবিধা, ভর্তুকি এবং মেধাস্বত্ব সম্পর্কিত অনেক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বঞ্চিত হবে। সক্ষমতা অর্জনের জন্য আগামী ৯ বছরে বাংলাদেশকে প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।



মন্তব্য