kalerkantho


২% সুদে ১০ হাজার কোটি টাকা চায় বিজেএমসি

আবুল কাশেম   

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



২% সুদে ১০ হাজার কোটি টাকা চায় বিজেএমসি

পাটশিল্পের উন্নয়নে ২ শতাংশ সুদে ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল চেয়েছিল বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আদলে এ তহবিল চায় তারা। অর্থ মন্ত্রণালয় বাজেট থেকে এ পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দিতে রাজি হয়নি। বরং বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে কিছু করতে পারবে কি না, তা জানতে চেয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। পাট দিবসের এক দিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, নিদেনপক্ষে ৮ থেকে ৯ শতাংশ সুদ ছাড়া কোনো তহবিলের জোগান দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

পাট মন্ত্রণালয় ও তাদের অধীন বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) চাওয়ার তালিকায় আছে আরো অনেক কিছু। পাটশিল্পের লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ সুদমুক্ত ব্লকড অ্যাকাউন্টে রাখা, পাটকে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য হিসেবে ঘোষণা করা এবং পুরনো কলগুলো আধুনিকায়নে ২০ শতাংশ হারে নগদ অনুদান দেওয়া। এর মধ্যে পাটকে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিলে পাট ও পাটপণ্য রপ্তানিতে ২০ শতাংশ নগদ সহায়তা দিতে হবে অর্থ মন্ত্রণালয়কে। এ জন্য এ বিষয়ে সম্মতি দিচ্ছেন না অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা।

দীর্ঘদিন ধরে পাট মন্ত্রণালয় থেকে এসব বিষয়ে বৈঠক আয়োজন, দফায় দফায় চিঠি পাঠালেও তার কোনো সুরাহা না হওয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতি ক্ষোভ দেখা দিয়েছে তাদের। অন্যদিকে বছর বছর বিজেএমসিকে নগদ টাকা দেওয়ার পরও লোকসান কমাতে না পারা, শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন দিতে না পারার ব্যর্থতায় সংস্থাটিকে ‘ভয়ংকর প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে মনে করে অর্থ মন্ত্রণালয়।

৫ মার্চ বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম প্রকাশ্যে অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করে বলেন, ‘মাননীয় অর্থমন্ত্রী, তিনিই আসলে পাটের বিরোধী। তাঁর কাছে পাটের কিছু গেলেই মানসিকভাবে তিনি মনে হয় এটা অপছন্দ করেন। যার কারণে তাঁর কর্মকর্তারা পাটকে কৃষিপণ্যের তালিকায় তুলতে টালবাহানা করছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের পাটের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও আমাদের দেশের ভেতরেও অনেক ষড়যন্ত্র আছে। আমার বিশ্বাস, বিশ্বব্যাংকের কিছু প্রেতাত্মা আমাদের অর্থ মন্ত্রণালয়ে এখনো বসে আছে’—যোগ করেন মির্জা আজম।

জবাবে ৭ মার্চ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, বিজেএমসি বন্ধ করে দিতে আনুষ্ঠানিকভাবে পাট মন্ত্রণালয়কে বলেছি; কিন্তু তারা সংস্থাটির খপ্পরে পড়েছে। বিজেএমসিকে প্রতিবছর ৪০০ বা ৫০০ কোটি টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। তার পরও তারা সন্তুষ্ট নয়। তারা টাকার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। বিজেএমসির ব্যবস্থাপনা ভয়ংকর। তাই আমি এটি অপছন্দ করি। পাটকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রথম পরামর্শ হলো, বিজেএমসি বন্ধ করে দেওয়া।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও পাট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, গত বছর বাজেটের আগে পাটশিল্পের জন্য ২ শতাংশ সুদে ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করতে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দেয় পাট মন্ত্রণালয়। পরে এ বিষয়ে জুলাই মাসে পাটমন্ত্রী মুহা. ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিকের সভাপতিত্বে ‘পাটবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটি’র বৈঠকের আলোচনা হয়। তখনই বাংলাদেশ ব্যাংক জানায় যে কম সুদে এত বড় তহবিল গঠন করতে হলে সরকারকে বাজেট থেকে অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। যেমন দেওয়া হয়েছে পুঁজিবাজারে ক্ষতিগ্রস্তদের উন্নয়নের জন্য ৯০০ কোটি টাকার তহবিল। না হলে পাট খাতের জন্য এখন যে ২০০ কোটি টাকার পুনরর্থায়ন তহবিল আছে, সেটাকে ৫০০ কোটিতে উন্নীত করার প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে রাজি হননি পাট মন্ত্রণালয় ও বিজেএমসির কর্মকর্তারা।

বারবার অর্থ বরাদ্দ চাওয়ার পরও না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বিজেএমসির একজন কর্মকর্তা বলেন, ১৯৮৮ সালে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল গঠন করা হয়। এখন এই তহবিলের আকার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এ তহবিল থেকে ২ শতাংশ সুদে ঋণ পেয়ে বস্ত্র, তৈরি পোশাক, চামড়া, পাদুকা, সিরামিক ও প্লাস্টিক খাত কাঁচামাল আমদানি করে। পাটশিল্প দেশের কৃষকদের কাছ থেকে পাট কেনায় এ সুবিধা পাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, পাট মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের বিষয়ে মতামত জানতে চেয়ে গত ১৫ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চিঠি দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। জবাবে গত ৫ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক ফিরতি চিঠি দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে বলেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গঠিত পুনরর্থায়ন তহবিলে বর্তমানে ৫ শতাংশ সুদ আরোপ করার বিধান আছে। এ তহবিলের আওতায় ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে তহবিল খরচ ও ব্যাংকের প্রশাসনিক ব্যয় অন্তর্ভুক্তির আবশ্যিকতা থাকায় ৮ শতাংশ বা ৯ শতাংশ সুদহারের চেয়ে কম সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে সরকার বার্ষিক বাজেট থেকে পাট খাতের জন্য নতুন তহবিল গঠন বা এ খাতের জন্য বিদ্যমান তহবিলের ঋণের সুদ ভর্তুকি বাবদ অর্থ বরাদ্দ রাখলে গ্রাহক পর্যায়ে এক অঙ্কের সুদহারে ঋণ বিতরণ সম্ভব হতে পারে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বেশির ভাগ পাটকলই পুরনো, উত্পাদনক্ষমতাও কম। এ অবস্থায় পুরনো মেশিনপত্র বিক্রি করে নতুন মেশিনপত্র লাগাতে চায় বিজেএমসি। এ ক্ষেত্রে যে খরচ হবে, তার ২০ শতাংশ অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুদান ও ৫০ শতাংশ কম সুদে ঋণ চায় সংস্থাটি। বাকি ৩০ শতাংশ পুরনো মেশিনপত্র বিক্রি করে সংস্থান করা হবে।


মন্তব্য