kalerkantho


ব্যবসায়ীদের দাবির পরও সিসি ক্যামেরা বসছে না বেনাপোলে

♦ অবাধে চলছে পণ্য চুরিসহ নানা অপরাধ
♦ অব্যবস্থাপনায় ব্যবসায়ীরা আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে আগ্রহ হারাচ্ছে

জামাল হোসেন, বেনাপোল (যশোর)   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ব্যবসায়ীদের দাবির পরও সিসি ক্যামেরা বসছে না বেনাপোলে

বাণিজ্যিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও সিসি ক্যামেরার আওতায় আসেনি দেশের সর্ববৃহৎ বেনাপোল স্থলবন্দর। ফলে অব্যবস্থাপনায় দিন দিন ব্যবসায়ীরা আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে আগ্রহ হারাচ্ছে। সেই সঙ্গে বন্দরের মধ্যে অনায়াসে ঘটছে পণ্য চুরিসহ হামলা চালিয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের হত্যার মতো ঘটনা।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, বন্দরে সিসি ক্যামেরা থাকলে এসব অনিয়ম অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ ব্যাপারে তাঁরা বন্দর কর্তৃপক্ষকে বিভিন্ন বৈঠকে সিসি ক্যামেরা স্থাপনে জোর দাবি জানালেও কথায় কান দিচ্ছেন না কর্মকর্তারা। বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, বিষয়টি তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছে।

বন্দর সূত্রে জানা যায়, দেশ স্বাধীনের পর বন্দরের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে এ বন্দরে চোরচক্র লেগেই আছে। এসব চোরচক্রের সদস্যরা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতা, কর্মী, ক্যাডার, সন্ত্রাসী ও লাঠিয়াল বাহিনীর সদস্য। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে সেই সরকারের প্রতিনিধিরা এ বন্দরে চুরির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। দেশের এ বৃহত্তর স্থলবন্দরে চুরি প্রতিরোধ করতে কয়েক বছর আগে শেডে বেশ কয়েকটি সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছিল। বন্দরের এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব চুরির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকায় কিছুদিন যেতে না যেতেই এসব সিসি ক্যামেরা নষ্ট করে ফেলা হয়।

বেনাপোল বন্দর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আমদানি পণ্য প্রবেশদ্বারসহ দুই কিলোমিটার বন্দর এলাকাজুড়ে কোথাও কোনো সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়নি। প্রয়োজন ছাড়া বন্দরের মধ্যে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ থাকলেও অবাধে বহিরাগতরা প্রবেশ করছেন। বন্দরের অভ্যন্তরের সড়ক ও পণ্যাগারের (শেড) বেহাল দশা। চুরি হওয়া আমদানি পণ্য কেনাবেচার জন্য বন্দরের সামনেই নামে-বেনামে শতাধিক দোকান গড়ে উঠেছে।

ব্যবসায়ীদের ধারণা, এসব অব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরে বিরাজ করায় ২০১১-১২ অর্থবছর থেকে পর পর পাঁচ বছর এখানে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হচ্ছে না।

বন্দর সূত্রে জানা যায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ১২ লাখ ৬৩ হাজার ৯৯ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছে। আর বন্দর থেকে পণ্য খালাস হয়েছে ১২ লাখ ৬১ হাজার ২৩৮ মেট্রিক টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ১৩ লাখ ৭৯ হাজার ৩৪৮ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছে। আর বন্দর থেকে পণ্য খালাস হয়েছে ১৪ লাখ চার হাজার ৩৪২ মেট্রিক টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১২ লাখ ৯৮ হাজার ৯৮৩ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছে। আর বন্দর থেকে পণ্য খালাস হয়েছে ১২ লাখ ৯৭ হাজার ২৯৮ মেট্রিক টন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৪ লাখ ৬৬ হাজার ১৬৪ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছে। আর বন্দর থেকে পণ্য খালাস হয়েছে ১৪ লাখ ৩২ হাজার ২৮১ মেট্রিক টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই-১৭ থেকে জুন-১৮ পর্যন্ত ১৭ লাখ ৪৬ হাজার ২১৫ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছে। আর বন্দর থেকে পণ্য খালাস হয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৯ মেট্রিক টন।

বেনাপোল বন্দরের নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাংলাদেশ আনসারের পিসি শহিদুল ইসলাম জানান, গত বছরের ১৬ নভেম্বর দায়িত্ব পালনের সময় চোর সিন্ডিকেটের হামলায় তাঁদের আনসার সদস্য ফিরোজ খুন হয়। বেনাপোলের আমদানিকারক হাদিউজ্জামান জানান, বন্দরে রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডে তাঁর আমদানীকৃত ৫০ লাখ টাকার পণ্য পুড়ে যায়। বন্দরে সিসি ক্যামেরার ব্যবস্থা থাকলে এসব ঘটনা হয়তো ঘটত না।

আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক জানান, বেনাপোলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বন্দর আজ পর্যন্ত সিসি ক্যামেরার আওতায় আসেনি এটা দুঃখজনক। অথচ বেনাপোল বন্দরের বিপরীতে ভারতের পেট্রাপোল বন্দরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতাধীন। রয়েছে শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত এসি ওয়্যারহাউসসহ আরো অনেক আধুনিক ব্যবস্থা। যার একটিও আধুনিক সুবিধা নেই বেনাপোল বন্দরে। প্রতিবছর পাঁচ ভাগ করে মাসুল বৃদ্ধি করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এতে লোকসানের মুখে পড়ে ব্যবসায়ীরা এ পথে বাণিজ্য কমিয়ে দিচ্ছে।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন জানান, প্রতিটি বৈঠকে উন্নয়নের ব্যাপারে বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখানে নেই কোনো নজরদারি।

বেনাপোল স্থলবন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (ট্রাফিক) আমিনুল ইসলাম জানান, বন্দরে সিসি ক্যামেরা লাগানোর পরিকল্পনা তাঁদের রয়েছে।



মন্তব্য