kalerkantho


করপোরেটে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে

ফারজানা লাবনী   

৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



করপোরেটে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে

অফিসে সময়মতো উপস্থিত হতে হয়। কাগজে-কলমে ছুটি বিকেল ৫টা থাকলেও অধিকাংশ দিন কাজ সেরে ফিরতে রাত হয়। কর্মক্ষেত্রে রয়েছে কঠোর জবাবদিহি। করপোরেট খাতের এমন সব শক্ত নিয়ম-কানুন আর পরিশ্রমের চাকরিতেও গত পাঁচ-সাত বছরে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েই চলেছে। দক্ষতা প্রমাণ করায় পদোন্নতি পেয়ে শীর্ষ পদগুলোতে অবস্থান পাকাপোক্ত করছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের তথ্যানুসারে, গত তিন বছরে প্রায় ৯ লাখ নারী সম্মানজনক কর্মক্ষেত্রে যোগ দিয়েছে। ব্যাংক-বীমা খাতে যোগ হয়েছে দেড় লাখ নারী। সেবা ও শিল্প খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রধান নির্বাহী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রায় পাঁচ থেকে সাত হাজার নারী কাজ করছে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত ১০ বছর আগেও একটি করপোরেট হাউসে মোট কর্মরতদের মধ্যে নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ছিল একেবারে নগণ্য। ১০০ জনে দুই-একজন পাওয়া যেত না; কিন্তু এখন শিক্ষিত ও যোগ্য নারীর সংখ্যা বাড়ছে। তারা চ্যালেঞ্জ নিতে পিছ পা হয় না। করপোরেট হাউসে এখন ১০০ জনে নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা গড়ে ৩৫-৪০ জন। আমার বিশ্বাস ভবিষ্যতে করপোরেট খাতে নারীর অংশগ্রহণ আরো বাড়বে।’

দেশের প্রথম সারির জুতা উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের চেয়ারম্যান মঞ্জুর এলাহি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুধু আমার প্রতিষ্ঠান নয়, আমার চেনা-জানা অনেক নামকরা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ওপরের দিকের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নারীর সংখ্যা বাড়ছে। তাদের দক্ষতায় শুধু প্রতিষ্ঠান নয় দেশের অর্থনীতিও লাভবান হচ্ছে।’

বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের এমডি রূপালী চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একসময় এ দেশের করপোরেট খাতে নারীর অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে। আমি একজন সাধারণ কর্মচারী হিসেবে করপোরেট হাউসে যোগ দিই। তখন আমার চারপাশে দুই-একজনের বেশি নারী সহকর্মী খুঁজে পেতাম না। তাদের অনেকেই পারিবারিক কারণে চাকরি ছেড়ে চলে গেছে। আমি অনেক পরিশ্রম করে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে আজ বার্জার পেন্টসের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের এমডি পদে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছি। তবে আশার কথা হলো আগের সে পরিস্থিতি এখন আর নেই।’

তিনি বলেন, ‘এখন ইন্টারভিউ দিতে আসা প্রার্থীদের মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশিই থাকে উচ্চশিক্ষিত নারী। নিয়োগও পাচ্ছে প্রায় সমান সমান। অনেক সময় যোগ্যতা প্রমাণ করায় করপোরেট খাতে পুরুষের তুলনায় বেশি নারীকে নিয়োগ দিতে বাধ্য হচ্ছি।’

রূপালী চৌধুরী বলেন, ‘করপোরেট খাতে যোগ্য না হলে টিকে থাকা যায় না। তবে অনেক সময় যোগ্যতা প্রমাণ করার পরও নারীকে তার প্রাপ্য সম্পূর্ণ দেওয়া হয় না। নারীরা এ বিষয়ে আগের চেয়ে সচেতন হচ্ছে।’

স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক বা বিশেষায়িত কোনো ব্যাংকের প্রথম নারী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেলেন লুনা শামসুদ্দোহা। দেশের অন্যতম বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দুই যুগের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পেলেন ফাহমিদা খাতুন। গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবিসহ বিভিন্ন মোবাইল কম্পানি, ব্যাংক, ওষুধ কম্পানি, কম্পিউটার খাত, চেইন শপ, আবাসন খাত, চামড়া খাতসহ অনেক ক্ষেত্রেই এখন নারীরা সুনামের সঙ্গে কাজ করছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ দেশের করপোরেট খাতে কর্মরত নারীদের সবাই শিক্ষিত। অনেকে বিদেশ থেকেও উচ্চশিক্ষা নিয়ে এসেছে। এতে তাদের কাজের ধরন-পদ্ধতি অনেক আধুনিক ও তথ্যনির্ভর হয়েছে। পুরুষশাসিত সমাজেও এসব নারীকে ঠকানো সহজ নয়। তাদের স্বাচ্ছন্দ্য জীবনযাপন দেখে অন্য নারীরা করপোরেট খাতে কাজ করতে আগ্রহী হচ্ছে। এভাবে করপোরেট খাতে অংশ নেওয়া নারীদের মাধ্যমে নারী সমাজের জীবনযাপনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে।’

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, ‘করপোরেট খাতের অধিকাংশ হাউসে ভালো কাজে পুরস্কার দেওয়া হয়। বেতনও ভালো। ফলে করপোরেট খাতের অধিকাংশ নারীই স্বাবলম্বী। ফলে তাদের অধিকাংশ আত্মনির্ভরশীল।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রোকেয়া আফজাল রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১৯৬২ সালে আমি ব্যাংকে যোগ দিই। সে সময়ে মুসলিম ব্যাংকে আমি প্রথম নারী ম্যানেজার হিসেবে পদোন্নতি পাই; কিন্তু পরিবারে সন্তানদের সময় দিতে গিয়ে আমি চাকরিটি ছেড়ে দিই। পরে বাচ্চারা বড় হওয়ার পর নিজেকে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করি।’

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নারীরা আগের চেয়ে এগিয়ে এসেছে এটা যেমন সত্যি নারীর প্রতিবন্ধকতা এখনো আছে এটাও সত্যি। করপোরেট হাউসের শিক্ষিত নারীদের বাধা কম এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। তারাও টিকে থাকার জন্য লড়াই করছে। তবে আশার কথা হলো এখনকার নারীরা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জ নিচ্ছে। তারা নিজের ক্যারিয়ারের বিষয়ে অনেক বেশি সিরিয়াস থাকছে।’



মন্তব্য