kalerkantho


সংশোধিত এডিপি অনুমোদন পাচ্ছে কাল

বিদেশি ঋণ ব্যবহারে ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি

আরিফুর রহমান   

৫ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বিদেশি ঋণ ব্যবহারে ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি

সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের টাকা খরচে ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি হলো এবারও। প্রতিবারের ধারাবাহিকতায় চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বড় প্রকল্পগুলো থেকে বৈদেশিক ঋণ কাটছাঁট করা হচ্ছে।

এবারের মূল এডিপিতে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ৫৭ হাজার কোটি টাকা পাওয়ার আশা করলেও সংশোধিত এডিপিতে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার মতো কমছে। অর্থবছরের আট মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো এখন বলছে, বছরজুড়ে এত টাকা খরচ করা যাবে না। বিদেশি ঋণের চার হাজার ৯৫০ কোটি টাকা ফেরত দিচ্ছে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। সে কারণে মূল এডিপির তুলনায় সংশোধিত এডিপিতে বিদেশি ঋণের আকার কমে দাঁড়াচ্ছে ৫২ হাজার ৫০ কোটি টাকা। অবশ্য সংশোধিত এডিপিতে বিদেশি ঋণ কমলেও রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকা কমছে না। মূল এডিপিতে যা ছিল; অর্থাৎ ৯৬ হাজার ৩৩১ কোটি টাকার পুরোটাই থাকছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, এ বছর এডিপির আকার ছিল এক লাখ ৫৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে দেওয়া হয়েছিল ৯৬ হাজার ৩৩১ কোটি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ থেকে ৫৭ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে কমছে চার হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। কমিশনের যুগ্ম প্রধান এম সাঈদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গতবারও বিদেশি ঋণ কমেছিল; কিন্তু সরকারি কোষাগার থেকে ওই ঘাটতি মেটানো হয়েছিল। সে কারণে সংশোধিত এডিপির আকার কমেনি। এবারও তা-ই হতে পারে। সরকারি কোষাগার থেকে বাড়তি টাকা দিয়ে সেটা পুষিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ সংশোধিত এডিপি অনুমোদনের জন্য আগামীকাল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় উঠছে। রাজধানীর শেরেবাংলানগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে ওই সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করার কথা রয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকাসহ উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিশ্রুত ঋণ ব্যবহারের চেয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকা খরচের দিকে বেশি ঝোঁক থাকে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর কর্মকর্তাদের। কারণ, বিদেশি ঋণ খরচ করতে গেলে নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। টাকা খরচে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হয়। যেটা সরকারি কোষাগারের টাকা খরচে ততটা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হয় না। সে কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর এডিপি সংশোধনের সময় বিদেশি ঋণ কমে যায়। এ বছর তাই হতে চলেছে। কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, নির্বাচনের বছর হওয়ায় এমপি-মন্ত্রীদের বাড়তি টাকার চাহিদা রয়েছে। এমপি-মন্ত্রীরা নিজ নিজ এলাকার উন্নয়নে ব্যস্ত। সে কারণে সরকারি কোষাগার থেকে বাড়তি ১০ হাজার কোটি টাকা চাহিদা রয়েছে এমপি-মন্ত্রীদের। সে ক্ষেত্রে তাঁদের বাড়তি পাঁচ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত দেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। ফলে এবারও মূল এডিপির আকার যা ছিল, সংশোধিত এডিপির আকার তা-ই থাকতে পারে।

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় উত্থাপনের জন্য যে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে পরিকল্পনা কমিশন থেকে সেটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সংশোধিত এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ থাকছে পরিবহন খাতে ৩৭ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২৫ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ থাকছে বিদ্যুৎ খাতে ২২ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৫ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে আছে পল্লী উন্নয়ন ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ ১৬ হাজার ৭২২ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১১ শতাংশ। এর পরে আছে ভৌত পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ খাতে ১৫ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা রাখা হচ্ছে।

এদিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় এ বছরের সংশোধিত এডিপিতে আরো ৩১১টি নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। মন্ত্রী-এমপিদের নিজ নিজ এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নে এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্পের সংখ্যা দাঁড়াবে এক হাজার ৫১১টি। বিশেষজ্ঞরা বরাবরই বলে আসছেন, নতুন প্রকল্প না নিয়ে পুরনো প্রকল্প শেষ করার দিকে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া; কিন্তু সরকার সে পথে না হেঁটে নতুন নতুন প্রকল্প অনুমোদন দিচ্ছে। এতে করে এডিপিতে প্রকল্পের জট তৈরি হচ্ছে।

ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বরাবরই বলে আসছি, নতুন নতুন প্রকল্প না নিয়ে পুরনো প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করা। নতুন প্রকল্প নেওয়ার কারণে সেসব প্রকল্পে টাকা বরাদ্দ দিতে হচ্ছে। এতে করে সব প্রকল্পের ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়া যায় না। যার ফলে প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় না। এতে প্রকল্প থেকে মানুষ সুফলও পায় না।’

কমিশন সূত্রে জানা যায়, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে দুই হাজার ৪১০ কোটি টাকা রাখা হচ্ছে বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা খাতে। চলতি বছরের অবশিষ্ট চার মাসে এই টাকা খরচ হবে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশনের উন্নয়নে। প্রতিবছরই বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা বাবদ টাকা রাখে সরকার। বিশেষ উন্নয়ন সহায়তার টাকায় ব্যাপকহারে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এদিকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের সাত মাসে এডিপিতে খরচ হয়েছে ৩৩ শতাংশ অর্থ। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৫৪ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, গতবার মূল এডিপির আকার ছিল এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে বিদেশি ঋণ সাত হাজার কোটি টাকা কমলেও সরকারি কোষাগার থেকে সে ঘাটতি মেটানো হয়।



মন্তব্য