kalerkantho


মার্জিন ঋণে স্বজনপ্রীতি!

‘পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরো কঠোর হওয়ার পরামর্শ’

রফিকুল ইসলাম   

২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



মার্জিন ঋণে স্বজনপ্রীতি!

পুঁজিবাজারে শেয়ার কিনতে মার্জিন ঋণে কারসাজি চলছে। নিজ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আত্মীয়-স্বজনকে ঋণ দিতে বিধিনিষেধ থাকলেও বারবারই ভাঙছে এ নীতি। ঋণ দিতে আইনগত বিধিনিষেধ থাকলেও নিয়ম মানছে না শেয়ার লেনদেনকারী ব্রোকার প্রতিষ্ঠান। আর নিয়ম ভাঙায় শাস্তিস্বরূপ জরিমানা করা হলেও থামছে না মার্জিন ঋণ জালিয়াতি।

মার্জিন হচ্ছে এক ধরনের ঋণ, সাধারণত ব্রোকারেজ হাউস বা মার্চেন্ট ব্যাংক শেয়ার ব্যবসা করতে এই ঋণ দিয়ে থাকে। শেয়ার বন্ধক হিসেবে রেখে নির্দিষ্ট হারে মার্জিন ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়। বর্তমানে মার্জিন ঋণের অনুপাত ১:০.৫ টাকা। অর্থাৎ কোনো বিনিয়োগকারীর ১০০ টাকার বিনিয়োগ থাকলে ৫০ টাকা ঋণ নিতে পারে। নগদ ও দুর্বল ভিত্তির ‘জেড’ ক্যাটাগরির কম্পানিতে এই মার্জিন ঋণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে সে নিয়ম ভাঙছে ব্রোকার প্রতিষ্ঠান।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে ধসের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছিল এই মার্জিন। যার ক্ষত এখনো শেষ হয়নি। বিনিয়োগকারী ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংক থেকে লাখ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করে। যাতে বাজারে উল্লম্ফন সৃষ্টি হয়। তবে বাজারে ধস নামলে মুনাফার বিপরীতে লোকসানে পড়ে বিনিয়োগকারী। আর ঋণে দায়গ্রস্ত হয়ে পড়ায় পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয় অনেকেই। এতে মার্জিন ঋণে লাগাম টানা হয়। বিনিয়োগকারীর ঋণাত্মক হিসাবে লেনদেন চালু রেখে ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংক লেনদেন করছে। এখনো থামেনি মার্জিন ঋণ জালিয়াতি।

সূত্র জানায়, ব্রোকার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও আত্মীয়-স্বজনদের অনৈতিক সুবিধা দিতে এই জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। কোনো কম্পানির মূল্য সংবেদনশীল তথ্য জেনে কিংবা কোনো কম্পানির শেয়ার দাম বাড়তে পারে, এমন তথ্য আগে জেনেই শেয়ার কিনতে আত্মীয়-স্বজনদের ঋণ দেয় ব্রোকার প্রতিষ্ঠান। যদিও আত্মীয়, স্বজন ও প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের ঋণ সুবিধা না দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

সূত্র জানায়, আত্মীয়-স্বজনদের মার্জিন ঋণ দিয়ে আইন ভাঙায় ২০১৭ সালে ১৩টির বেশি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। ঋণ প্রদানের নীতি ও আইন ভাঙায় নির্দিষ্টহারে জরিমানাও করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি। তবে থামেনি এই মার্জিণ ঋণ প্রদানে জালিয়াতি। চলতি বছরেরও শুরুতেও মার্জিন ঋণ প্রদানে স্বজনীপ্রীতিতে জরিমানা করা হয়েছে।

মার্চেন্ট ব্যাংক সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে পুঁজিবাজার ঊর্ধ্বমুখী হলে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসের মার্জিন ঋণে লোকসানের পরিমাণ কমেছে। নেতিবাচক ইক্যুইটির বিও হিসাব ও পোর্টফোলিওতে থাকা শেয়ার কেনাবেচা করে লোকসান পুষিয়েছে তারা। গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই মার্জিন ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ছয় হাজার ৯০০ কোটি টাকা। গত বছরের শেষে বাজার ঊর্ধ্বমুখী ও শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় মার্জিন ঋণে লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ কমেছে।

মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাবেক সভাপতি ছায়েদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মার্জিন ঋণে লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ কমে গেছে। এই মার্জিন ঋণের হিসাব বলা মুশকিল। প্রতিটি ব্রোকারেজ হাউস কিংবা মার্চেন্ট ব্যাংক থেকে তথ্য পাওয়া কঠিন। তবে এটা বলা যায় যে পরিমাণ লোকসান ছিল, সেটা থেকে অনেকটা উন্নতি হয়েছে।’

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির ২০১০ সালের ২৩ মার্চ মার্জিন নির্ধারণসংক্রান্ত নির্দেশনায় বলা হয়, শেয়ারের সমাপনী মূল্য ও নেট অ্যাসেট ভ্যালুকে (এনএভি) দুই দ্বারা ভাগ করে মার্জিন নির্ধারণ করতে হবে। এতে আরো বলা হয়, কোনো স্টক ব্রোকার পরিচালনা পর্ষদের কোনো সদস্যের নিজস্ব কম্পানি, কর্মকর্তা, ম্যানেজমেন্টের কোনো স্টাফ, তাদের পিতা-মাতা, সন্তান, বোন, জামাই ও পুত্রবধূকে মার্জিন সুবিধা দিতে পারবে না।’

কমিশন সূত্র জানায়, আত্মীয়-স্বজন ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঋণ দিয়ে আইন ভঙ্গ অনেকটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। কমিশনের নিয়মিত পরিদর্শনের ভিত্তিতের আইন ভঙ্গ দৃশ্যমান বা ধরা পড়লে জরিমানা করা হয়। ২০১৭ সালে ইন্ডিকেট সিকিউরিটিজ কনসালট্যান্টস লিমিটেড, ফখরুল ইসলাম সিকিউরিটিজ লিমিটেড, আজম সিকিউরিটিজ লিমিটেড, সায়া সিকিউরিটিজ, এসবি সিকিউরিটিজ লিমিটেড, শার্প সিকিউরিটিজ লিমিটেড, এম সিকিউরিটিজ, মিরর ফাইন্যান্সসিয়াল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, হারুন সিকিউরিটিজ লিমিটেড, ওয়াইফাং সিকিউরিটিজ লিমিটেড ও অ্যাসোসিয়েটেড ক্যাপিটাল সিকিউরিটিজ লিমিটেড মার্জিন ঋণে নীতিমালা ভেঙেছে।

অনৈতিকভাবে ও সীমার অতিরিক্ত মার্জিন ঋণ সুবিধা দেওয়ায় ২০১৭ সালে ১৭ জানুয়ারি অ্যালায়েন্স সিকিউরিটিজ ও ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডকে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করে কমিশন। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের মার্জিন প্রদানে কমিশনের এক নির্দেশনা ভঙ্গ করেছে অ্যালায়েন্স সিকিউরিটিজ। ঋণচুক্তি ব্যতিরেকে মার্জিন ঋণ প্রদান ও অনুমোদিত সীমার অতিরিক্ত ঋণ প্রদান করে আইন ভঙ্গ করেছে।

ইন্ডিকেট সিকিউরিটিজ এক পরিচালককে মার্জিন ঋণ প্রদান করে। ফখরুল ইসলাম সিকিউরিটিজ কর্মচারীও তাদের আত্মীয়দের ঋণ দেয়। পরিচালক ও তাদের আত্মীয়দের ঋণ প্রদান ও মার্জিন ঋণ নগদ হিসেবে প্রদান করে আজম সিকিউরিটিজ। নগদ হিসেবে ঋণ প্রদান ও ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে ঋণ দেয় সায়া সিকিউরিটিজ। পরিচালক ও তাদের আত্মীয় এবং কর্মচারীদের ঋণ প্রদানের মাধ্যমে মার্জিন ঋণ নীতিমালা ভাঙে এসবি সিকিউরিটিজ লিমিটেড। নগদ ও ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ারেও ঋণ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পরিচালক ও কর্মচারী এবং তাদের আত্মীয়দের ঋণ ও নগদ ঋণ দেয় শার্প সিকিউরিটিজ লিমিটেড। পরিচালক, আত্মীয় ও ডিলার হিসেবে ঋণ প্রদান করে এম সিকিউরিটিজ। মিরর ফাইন্যান্সসিয়াল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের নির্বাহী কর্মকর্তার আত্মীয়দের ঋণ দেয়। আর হারুন সিকিউরিটিজ লিমিটেড নগদ হিসেবে মার্জিন ঋণ প্রদান করেছে। ওয়াইফাং সিকিউরিটিজ লিমিটেড পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কর্মচারী ও তাদের আত্মীয়দের মার্জিন ঋণ প্রদান করে। মিরর ফাইন্যান্সসিয়াল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড নন-মার্জিন ‘জেড’ ক্যাটাগরির কম্পানিকে ঋণ দেয় আর অ্যাসোসিয়েটেড ক্যাপিটাল সিকিউরিটিজ নন-মার্জিন ‘জেড’ ক্যাটাগরির কম্পানিকে ঋণ দেয়। ক্যাশ হিসাবে মার্জিন ঋণ দেয়।

কমিশনের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্রোকার প্রতিষ্ঠান কোনো কম্পানির মূল্য সংবেদনশীল তথ্য আগে জেনে অনৈতিকভাবে মুনাফা লুটতে চায়। যার জন্য পরিবার কিংবা আত্মীয়-স্বজনদের মার্জিন ঋণ সুবিধা দিয়ে শেয়ার কিনে রাখে। আর পরবর্তী সময়ে এই শেয়ার দাম বৃদ্ধি পেলে মুনাফা লোটে। মার্জিন ঋণ প্রদানে ব্যত্যয় ও অনিয়ম রোধে কমিশন সর্বদায় তৎপর। নীতিমালা বা আইন ভঙ্গ করলেই জরিমানা করা হয়ে থাকে।

বাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মার্জিন ঋণ ২০১০ সালে বাজার উল্লম্ফনে ভূমিকা রেখেছিল। তবে বর্তমান সময়ে মার্জিন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম-নীতি মানছে না ব্রোকার প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে এই অনিয়ম বেশি। মার্জিন ঋণের কারসাজি বন্ধ করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরো কঠোর হতে হবে। যদিও এখন অনিয়ম ধরতে পারলে জরিমানা করছে। এটি আরো বাড়াতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানে দ্বিতীয়বার এই অনিয়ম পেলে কঠোর হওয়ার প্রয়োজন।’


মন্তব্য