kalerkantho


মার্কেট শেয়ার তলানিতে

বড় বিনিয়োগকারী ধরে রাখতে পারছে না সিএসই

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বড় বিনিয়োগকারী ধরে রাখতে পারছে না সিএসই

চীনা জোট নাকি ভারতীয় জোট—কৌশলগত অংশীদার (স্ট্র্যাটেজিক ইনভেস্টর) হিসেবে কাদের বেছে নেবে, তা নিয়ে মধুর সংকটে পড়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। অথচ পাশাপাশি দেশের অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) পড়েছে অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে। মার্কেট শেয়ার তলানিতে ঠেকার পর কৌশলগত অংশীদার পেতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে সিএসই কর্তৃপক্ষকে। বড় বিনিয়োগকারীদের ধরে রাখতে পারছে না সিএসই ট্রেকহোল্ডাররা। সব মিলিয়ে সিএসইর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত অংশীদার সদস্যরা। এ অবস্থায় চীনা কনসোর্টিয়াম হারিয়ে শেষ ভরসা হিসেবে দুবাই স্টক এক্সচেঞ্জকে কৌশলগত অংশীদার বানাতে চায় সিএসই।

শেয়ারবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১১-১২ সালেও মার্কেট শেয়ারের ১১ থেকে ১২ শতাংশ ছিল সিএসইর দখলে। কিন্তু কয়েক বছরে মার্কেট শেয়ার কমতে কমতে এখন ৫ থেকে ৬ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। যে কারণে পরিচালন আয় থেকে সিএসইর সার্বিক ব্যয় নির্বাহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে চার বছর ধরেই খরচের একটা অংশ নিতে হচ্ছে এফডিআরের (ফিক্সড ডিপোজিট) মুনাফা থেকে। সিএসইর জনবলও গত তিন বছরে ৯৫ থেকে নেমে এসেছে ৮৯ জনে। সব কিছু মিলিয়ে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে সিএসই। এরই মধ্যে নতুন করে এসেছে কৌশলগত অংশীদার খোঁজার যন্ত্রণা।

ডিমিউচ্যুয়ালইজেশনের (ব্যবস্থাপনা থেকে মালিকানা পৃথক্করণ) শর্ত অনুযায়ী, সময় ৬০ শতাংশ শেয়ার ব্লক রেখে বাকি ৪০ শতাংশ শেয়ার সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে। এই ৬০ শতাংশ শেয়ারের মধ্যে ২৫ শতাংশ কৌশলগত অংশীদার এবং বাকি ৩৫ শতাংশ পাবলিক এবং অন্যান্য ইনস্টিটিউশনের কাছে। স্বাভাবিকভাবে যাদের কাছে বেশি শেয়ার থাকবে তারাই চাইবে মার্কেটকে ভাইব্রেন্ট করতে। আগামী ৮ মার্চের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, চীনের এ দুটি স্টক এক্সচেঞ্জের কনসোর্টিয়াম ৯৯০ কোটি টাকায় ডিএসইর ২৫ শতাংশ শেয়ার (প্রতিটি ২২ টাকা দরে) কিনে নেওয়ার প্রস্তাব করেছে। একই সঙ্গে ডিএসইর কারিগরি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে ৩০০ কোটিরও বেশি টাকা (৩৭ মিলিয়ন ডলার) খরচ করবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করেছে তারা। বর্তমানে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে পণ্যের বহুমুখীকরণ নেই, কৌশলগত অংশীদাররা এলে বাজারে পণ্যের ভিন্নতা বাড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ডিএসই বোর্ড এরই মধ্যে তাদের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে চীনের সেনজেন ও সাংহাই কনসোর্টিয়ামকে অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু সিএসই এখনো কৌশলগত অংশীদার নির্বাচনের ব্যাপারে সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। ডিএসইর কারণে সেনজেন ও সাংহাই কনসোর্টিয়ামকে হারানোর পর তারা এখন দুবাই স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সেই আলোচনাও এখন সিদ্ধান্তে আসার মতো নয়।

সিএসই সূত্রে জানা যায়, সেনজেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে শেয়ারপ্রতি ১৭ টাকা থেকে ওপরের দিকেই দর-কষাকষি করে আসছিল সিএসই। সেখানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) শেয়ারপ্রতি ২২ টাকা দর গ্রহণ কিছুটা হতাশই করেছে সিএসইকে। দুবাই স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে শেয়ারপ্রতি ২৫ থেকে ২৭ টাকায় দর-কষাকষি চলছিল। কিন্তু ডিএসই নিজেদের শেয়ার আরো কম দামে বিক্রি করতে সম্মত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে আরো কম দামে শেয়ার বিক্রি করতে বাধ্য হবে সিএসই। আপাতত শেয়ারপ্রতি ১৭ থেকে ২০ টাকার মধ্যে দর পেতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সিএসই কর্তৃপক্ষ। আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে বৈঠক আছে সিএসইর। বৈঠকে সিএসই কর্তৃপক্ষ সময় বাড়ানোর আবেদন জানাবে।

সিএসইর জন্য কৌশলগত বিনিয়োগকারী খোঁজার পুরো কাজটাই তদারক করছেন পরিচালক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাংহাই এক্সচেঞ্জের সঙ্গে আমরাই আগে যোগাযোগ শুরু করেছিলাম। এখন দুবাই স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গেও আমাদের আলোচনা চলছে। আশা করি, সেখান থেকে সফলতা পাব।’

তবে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের মার্কেট শেয়ারের দুর্বলতা কৌশলগত অংশীদার খোঁজার ব্যাপারে একটা বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কেউ শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করলে স্বাভাবিকভাবে আগে মার্ৎকেট শেয়ার জানতে চায়। তখন বিব্রত হতে হয়। কারণ বাজার নিয়ে মিথ্যা বলার জো নেই। তখন চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক গুরুত্ব, বন্দর, প্রাকৃতিক পরিবেশের কথা তুলে ধরে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সম্ভাবনার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসি।’ কৌশলগত অংশীদার যথাসময়ে পাওয়া না গেলে সামনে অন্ধকার সময় অপেক্ষা করছে বলে তিনি জানান।

মার্কেট শেয়ার কমে যাওয়ার যন্ত্রণাও সইতে হচ্ছে সিএসই ট্রেকহোল্ডারদের। আস্থার সংকটে ভুগছে বড় বিনিয়োগকারীরা। যে কারণে ধরে রাখা যাচ্ছে না সিএসইতে। এ প্রসঙ্গে কথা হয় সিএসইর অন্যতম প্রধান ট্রেকহোল্ডার বি রিচ লিমিটেডের এমডি কাজী রফিকুল হাসানের সঙ্গে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যখনই কোনো বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিও বড় হচ্ছে তাকে আর সিএসইতে ধরে রাখা যাচ্ছে না। দু্ই বছর ধরে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে। মার্কেটের গভীরতা কম থাকায় বড় ভলিউমে শেয়ারের পর্যাপ্ত ক্রেতা কিংবা বিক্রেতা পাওয়া যায় না। এ কারণে বড় বিনিয়োগকারীরা ডিএসইমুখী হয়ে যাচ্ছে।’

কৌশলগত অংশীদার পাওয়ার ব্যাপারে এখনো আশা ছাড়ছেন না সিএসইর এমডি সাইফুর রহমান মজুমদার। এ প্রসঙ্গে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বাজার অনুসন্ধান করি; কিন্তু সেটার সুফল ভোগ করে ডিএসই। আমাদের পিছিয়ে থাকার মূল কারণ মার্কেট শেয়ার কম থাকা। তার পরও আমরা মধ্যপ্রাচ্যে যোগাযোগ করছি। আশা করছি, নির্ধারিত সময় ৮ মার্চের মধ্যে সিএসই কৌশলগত অংশীদার পেয়ে যাবে।’

সিএসইর মার্কেট শেয়ার কম থাকার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘সিএসইতে ট্রেকহোল্ডারদের একটা বড় অংশ পেশাদার নয়। তারা ব্রোকারেজ ব্যবসাটা পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গিতে চালাতে চাচ্ছে না। এক্সচেঞ্জ যখন ডি-মিউচ্যুয়ালাইজড হলো তখন যারা এক্সচেঞ্জের মেম্বার ছিলেন তাঁদের প্রাথমিকভাবে সদস্য করা হলো এবং তাঁদের একটা করে ট্রেক দেওয়া হলো। তাঁদের মধ্যে ২৫-৩০ জন বাদে বাকিরা সবাই ইন-অ্যাকটিভ। দুটি সংকট হচ্ছে, ট্রেকহোল্ডারদের বড় অংশ লেনদেন করছে না আবার ট্রেকহোল্ডারদের মধ্যে যারা ডুয়েল (সিএসই এবং ডিএসই) সুবিধা যাদের আছে তারা বছরের পর বছর ডিএসইকেন্দ্রিক হয়ে গেছে।’

সিএসইর বর্তমান অবস্থাকে অস্তিত্ব সংকটের সঙ্গেই তুলনা করছেন সাবেক সভাপতি ফখর উদ্দিন আলী আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমরা যতই বলি অমুককে আমরা আগে এনেছি, কিন্তু তাতে লাভ কী? আগে আনার পরও কেন আমরা আগে তাদের সঙ্গে চুক্তি করতে পারিনি। ডিএসই কৌশলগত অংশীদার পেয়ে গেছে। এখন আমরা যদি নির্ধারিত সময়ে অংশীদার না পাই তাহলে সিএসই আরো পিছিয়ে পড়বে।’


মন্তব্য