kalerkantho


বেড়েই চলেছে ডলারের দর

শেখ শাফায়াত হোসেন   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বেড়েই চলেছে ডলারের দর

চলতি অর্থবছরের জুলাই শেষে আন্ত ব্যাংক ডলারের দর ছিল ৮০.৬৬ টাকা। গত জানুয়ারি শেষে এই দর বেড়ে হয়েছে ৮২.৯০ টাকা। এই সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে ২.৭৭ শতাংশ।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, আন্ত ব্যাংক দরের সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ডলারপ্রতি আরো প্রায় দেড় টাকা বেশি রাখছে আমদানি পর্যায়ের গ্রাহকদের কাছ থেকে। গত বৃহস্পতিবার ডলারের আন্ত ব্যাংক দর ছিল ৮২.৯২ টাকা। অন্যদিকে আমদানি পর্যায়ে ব্যাংকগুলোর ডলারের দর ছিল সর্বোচ্চ ৮৩.৪০ টাকা। বিদেশি ওরি ব্যাংকের ডলারের দর ছিল আন্ত ব্যাংক দরের থেকেও কম, ৮২.৩৫ টাকা।

একই দিন বিদেশ গমনেচ্ছুদের কাছে নগদ ডলার বিক্রি সর্বোচ্চ দর হেঁকেছে ইউনিয়ন ব্যাংক। এই ব্যাংকটির ডলারের দর ছিল ৮৫.২০ টাকা। ওই দিন বেশির ভাগ ব্যাংকেরই নগদ ডলারের দর ছিল ৮৪ থেকে ৮৫ টাকার মধ্যে। সর্বনিম্ন দর ছিল ইস্টার্ন ব্যাংকে, ৮৩ টাকা।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং দেশের বৈদেশিক লেনদেনে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় ডলারের চাহিদা বাড়ছে। চাহিদা পূরণ করতে পর্যাপ্ত ডলারের জোগান দিতে গিয়ে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। যে কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের দরে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

একই সঙ্গে সামনে ডলারের দর আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। ডলারের দর নিয়ে বাজারে যাতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি না হয় এ লক্ষ্যে আজ রবিবার বিদেশি মুদ্রায় লেনদেনে নিয়োজিত অথরাইজড ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোকে নিয়ে বৈঠকে বসছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বৈঠকে কোনো ব্যাংক যাতে প্রতিদিনের উদ্ধৃত দরের বেশি দরে ডলার বিক্রি না করে সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে কয়েকটি ব্যাংকের স্বীকৃত বিলের পাওনা পরিশোধের বিষয়টিও রয়েছে। তা ছাড়া ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক বাণিজ্যসংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলির মেয়াদ তিন বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করারও একটি প্রস্তাব রয়েছে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে।

বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফেদা) চেয়ারম্যান সোনালী ব্যাংকের সিইও ও এমডি মো. ওবায়েদ-উল্লাহ আল মাসুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডলারের দর বৃদ্ধির প্রধান কারণ আমদানি বৃদ্ধি। ব্যাংকগুলোতে ঋণপত্র খোলার তুলনায় নিষ্পত্তি কম। চাহিদার তুলনায় জোগানের স্বল্পতার কারণে দর বাড়ছে। এটা বাজারের ওপর নির্ভর করে। আমরা বাফেদার পক্ষ থেকে বিদেশি মুদ্রার বাজার প্রতিনিয়ত নজরে রাখছি।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ২৬ শতাংশ। যেখানে রপ্তানি আয় বেড়েছে মাত্র ৭.৭৮ শতাংশ।

এই সময়ে খাদ্য (চাল ও গম) আমদানি বেড়েছে ২১২ শতাংশ। শিল্প স্থাপনের প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বেড়েছে ৩৫ শতাংশের মতো। জ্বালানি তেলের আমদানি বেড়েছে ২৮ শতাংশ এবং শিল্পের কাঁচামালের আমদানি বেড়েছে ১৫ শতাংশের বেশি।

জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৭৬ কোটি ৭০ লাখ ডলারে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৯ গুণ (৯০০ শতাংশ) বেশি। সাধারণত চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ঘাটতি তৈরি হলে দেশকে ঋণ করে ওই ঘাটতি মেটাতে হয়।

তবে রেমিট্যান্সপ্রবাহে বর্তমানে বেশ কিছুটা প্রবৃদ্ধির ধারা বিরাজ করছে। জুলাই-জানুয়ারি সময়ে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে প্রায় ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে তিন হাজার ২৭৬ কোটি ডলারের বেশি বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে। ডলারের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর কাছে ১৫০ কোটির বেশি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে ব্যাংকের মতো মানি এক্সচেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ডলারের দর বেড়েছে। জানা গেছে, গত সপ্তাহে বিভিন্ন মানিচেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলোতে এক ডলার বিক্রি হয়েছে প্রায় ৮৫ টাকায়।

অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখত বলেন, ‘পদ্মা সেতু, মেট্রো রেলসহ বেশ কিছু বড় প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব প্রকল্পের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানিতে অনেক খরচ হচ্ছে। গত বছর বন্যায় উত্পাদন ব্যাহত হওয়ায় খাদ্যশস্য আমদানি অনেক গুণ বেড়েছে। তা ছাড়া দেশের শিল্প খাতে বিনিয়োগেও কিছুটা গতি এসেছে; কিন্তু সে তুলনায় রপ্তানি আয় না বাড়ায় ডলারের চাহিদা বেড়ে এর দরকে একটু একটু করে বাড়িয়ে তুলছে।’

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে কোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয় কিনা এমন আশঙ্কা থেকে অনেকেই বিদেশে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন—এমন ধারণা রয়েছে কারো কারো মধ্যে। এই ধারণা কিছুটা সঠিক বলে মনে করলেও ডলারের দর বৃদ্ধির পেছনে এটাকে মুখ্য কারণ বলে মনে করেন না বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক জায়েদ বখত।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ডলারের দর বাড়লে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে আমদানীকৃত পণ্যের দামও বেড়ে যায়। তবে এ ক্ষেত্রে রপ্তানিকারক ও প্রবাসে অবস্থানরত রেমিট্যান্স প্রেরণকারীরা ডলা প্রতি কিছু বাড়তি অর্থ পান।



মন্তব্য