kalerkantho


ভারতে বৃহত্তম ব্যাংক জালিয়াতি ঘটে সাত বছর ধরে

বাণিজ্য ডেস্ক   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ভারতে বৃহত্তম ব্যাংক জালিয়াতি ঘটে সাত বছর ধরে

দুই বছর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের আট কোটি ১০ লাখ ডলারের রিজার্ভ চুরির ঘটনা যখন উন্মোচন হয় তখনো কেউ জানত না ভারতের দ্বিতীয় বৃহৎ রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে এর চেয়ে বড় ঘটনা ঘটে চলেছে। ২০১১ সাল থেকে দীর্ঘ সাত বছরে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের (পিএনবি) মাধ্যমে ১১ হাজার ৪০০ কোটি রুপির ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। যা ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি।

২০১৬ সালে বৈশ্বিক আর্থিক লেনদেন প্রতিষ্ঠান ‘সুইফট’ সিস্টেম ব্যবহার করে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা ধরা পড়ে। তখন ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) দেশের সবগুলো আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে জানিয়ে দেয় তাদের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক যাতে সুইফটের সঙ্গে যথাযথভাবে যুক্ত করে নেয়। তখনো সাবধান হয়নি পিএনবি। আর এ সুযোগেই ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সুইফটের সঙ্গে পিএনবির নেটওয়ার্কে যে অসংগতি রয়ে গেছে সেটি কাজে লাগিয়ে ১.৮ বিলিয়ন ডলার বা ১১ হাজার ৪০০ কোটি রুপি প্রতারণার সুযোগ করে দেন।

অ্যাকাউন্ট্যান্সি ফার্ম ইওয়াইয়ের আর্থিক সেবা অংশীদার আবিজের দিওয়ানজি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ব্যাংকের যে ব্যাক-ইন্ড সফটওয়্যার ছিল সেটির সঙ্গে সুইফটের যোগাযোগটি হয়নি। পিএনবি যখন দুটি নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে ব্যর্থ হয়েছে তখনই গলদটি তৈরি হয়েছে।’

এ ঘটনা নিয়ে এখন সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত চালাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট অনেককে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে, যদিও প্রধান আসামি হীরা ব্যবসায়ী নীরব মোদি বর্তমানে সুইজারল্যান্ডে রয়েছেন বলে জানা যায়। তবে যে বিষয়টি স্পষ্ট তা হচ্ছে—অনুন্নত প্রযুক্তি, দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অপর্যাপ্ত তত্ত্বাধানের অভাবেই ঘটনাটি ঘটেছে। যদি ঘটনাটি এক বছর আগেও উন্মোচিত হতো তাহলে অন্তত ৮০০ মিলিয়ন ডলার কম লোকসান হতো।

পিএনবির অভিযোগে বলা হয়, ‘কম্পানির সাবেক কর্মকর্তা গকুলনাথ শেঠি হীরা ব্যবসায়ী নীরব মোদি এবং তাঁর সহযোগীদের বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়ার গ্যারান্টি দিয়েছিলেন। ২০১১ থেকে ২০১৭ সময়ের মধ্যে জামানত ছাড়াই ৬৫ বিলিয়ন রুপির (এক বিলিয়ন ডলার) গ্যারান্টি ইস্যু করেছিলেন। এরপর গত মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে আরো ৪৯ বিলিয়ন রুপির গ্যারান্টি ইস্যু করেন।’ মূলত এর বদৌলতে নীরব মোদি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের বিদেশি শাখা থেকে ১১ হাজার ৪০০ কোটি রুপি ঋণ গ্রহণ করেন।

আরবিআইয়ের সাবেক ডেপুটি গভর্নর আর গান্ধী বলেন, ভারতের অনেক বাংকের নেটওয়ার্কই সুইফটের সঙ্গে সুসংহতভাবে যুক্ত নয়। আর এটি করার শর্তও বেঁধে দেয়নি আরবিআই। ফলে পিএনবিতে এ সুযোগটিই নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটির নেটওয়ার্ক সুইফটের সঙ্গে একাঙ্গীভূত নয়, ফলে প্রতিদিনের রেকর্ডগুলো ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেই সুইফট সিস্টেমের সঙ্গে মেলানো হতো।

আদালতে জমা দেওয়া নথিতে ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই জানায়, হীরা ব্যবসায়ী নীরব মোদি যাতে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বিদেশি শাখা থেকে যথেচ্ছ ঋণ নিতে পারেন সে জন্য সাত বছরে প্রায় ১৫০টি গ্যারান্টি ইস্যু করেছিলেন পিএনবির মুম্বাই শাখার ডেপুটি ম্যানেজার গোকুলনাথ শেঠি। আর সেটা তিনি করেন ম্যানুয়ালি পাসওয়ার্ড দিয়ে সুইফট সিস্টেমে লগ-ইন করে। আর সেই পাসওয়ার্ড অন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বিদেশি শাখাকে শেয়ার করে।

কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক অন্য কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বিদেশি শাখাগুলোর সঙ্গে লেনদেনের জন্য এই সুইফট সিস্টেম ব্যবহার করে। প্রতিদিনের লেনদেনে এই সিস্টেমের ব্যবহার হয় না বললেই চলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে।

২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত শেঠি কর্মরত ছিলেন পিএনবির মুম্বাই শাখায়। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, গত ১২ ফেব্রুয়ারি পিএনবির পক্ষ থেকে অন্য ব্যাংকগুলোতে পাঠানো ‘কনফিডেনশিয়াল’ নোটে বলা হয়েছে, নজর এড়াতে ওই সব গ্যারান্টির কোনোটাই ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ লেনদেন ব্যবস্থা ‘সিবিএস’-এর মাধ্যমে হয়নি। তাদের অনুমোদনও দেওয়া হয়নি সিবিএস ব্যবস্থার মাধ্যমে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিএনবির এক কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকের প্রতিদিনের অভ্যন্তরীণ লেনদেন ব্যবস্থার সঙ্গে শেঠির ব্যবহার করা সুইফট সিস্টেমের কোনো যোগাযোগ নেই। লেনদেন ও ঋণের জন্য গ্যারান্টি ইস্যুর ব্যাপারে দুটিই ব্যাংকের সম্পূর্ণ আলাদা ব্যবস্থা। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার সঙ্গে এই সুইফট সিস্টেমের কোনো যোগাযোগ নেই বলে ম্যানুয়ালি পাসওয়ার্ড দিয়ে লগ-ইন করে শেঠি ও তাঁর অধস্তন কর্মচারী ওই সুইফট সিস্টেমে ঢুকে প্রচুর পরিমাণে ভুয়ো গ্যারান্টি ইস্যু করেছিলেন। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ লেনদেন ব্যবস্থার মাধ্যমে ওই সব গ্যারান্টি ইস্যু করলে সহজে ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। সেটা এড়াতেই শেঠি সুইফট ব্যবস্থার আশ্রয় নিয়েছিলেন।

এ নিয়ে ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বলেন, ‘টানা সাত বছর ধরে ব্যাংকের ইন্টারনাল ও এক্সটারনাল অডিটররা জালিয়াতি ধরতেই পারেননি। এ ক্ষেত্রে নজরদারিতে গলদ ছিল।’ রয়টার্স, ব্লুমবার্গ নিউজ, আনন্দ বাজার।

 


মন্তব্য