kalerkantho


পিআরআইর গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

উন্নয়নের পরের ধাপে যেতে প্রস্তুতি পর্যাপ্ত নয়

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



উন্নয়নের পরের ধাপে যেতে প্রস্তুতি পর্যাপ্ত নয়

উন্নয়নের পরের ধাপে যাওয়ার পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই বাংলাদেশের। নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হলেও বিনিয়োগ আকর্ষণে পিছিয়ে পড়ছে। সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হলেও আমলাতন্ত্রের জটিলতা কাটছে না। যেকোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অনেক ধীর। গতকাল শনিবার রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ডুয়িং বিজনেস’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। পিআরআই নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুরের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী আমিনুল ইসলাম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের ভাইস চেয়ারম্যান ড. সাদিক আহমেদ। বক্তব্য দেন বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি ফারুক সোবহান, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি নিহাদ কবির, বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ মাসরুর রেজাসহ অন্যরা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ৭.২৮ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। এটা নিয়ে আমরা সুখী হতে পারি। কিন্তু আত্মতুষ্টি হওয়ার কিছু নেই।’ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ট্রেড লজিস্টিকে আমরা প্রতিবছর এক হাজার ১০০ কোটি টাকা হারাচ্ছি, এখন গড়ে ১০ দিন পণ্যবাহী জাহাজকে বহির্নোঙরে থাকতে হয়, যা নিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে পারব না।’ তিনি বলেন, মধ্যম আয়ের অনেক দেশ আর এগোতে পারছে না। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, মালয়েশিয়ায় মাথাপিছু আয় এক হাজার ডলারে আটকে আছে বহুদিন হয়। থাইল্যান্ডসহ বহু দেশ মধ্য আয়ের দেশে আটকে আছে। তিনি বলেন, ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ উন্নত দেশ হতে চাচ্ছে। বর্তমান অর্থনৈতিক অবকাঠামো দিয়ে বাংলাদেশও বহুদূর যেতে পারবে না। পরের ধাপে যাওয়ার জন্য বৃহত্ভাবে সংস্কার প্রয়োজন। উন্নত দেশ হতে হলে ২৪ বছরের মধ্যে দেশের মোট আয় তিন ট্রিলিয়নে উন্নীত করতে হবে, অর্থাৎ ২৪ বছরের মধ্যে আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ১০ থেকে ১২ গুণ বাড়াতে হবে।

ফারুক সোবহান বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হওয়ার জন্য ২৫০ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই প্রয়োজন, যা অনেক উচ্চাভিলাষী। বিনিয়োগ পরিবেশের বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, স্যামসাং কম্পানিকে বাংলাদেশে কারখানা করতে দেওয়া হলো না। তারা ভিয়েতনামে কারখানা করল। তাদের একটি কারখানায় দুই বছরে ৬০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করেছে, যা আমাদের মোট রপ্তানির চেয়ে বেশি। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীরা দ্রুত সিদ্ধান্ত চায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এক বছরে ২৩০ কোটি ডলারের এফডিআই আসছে। কিন্তু এ দেশে কর্মরত বিদেশিরা এক বছরে ৪০০ কোটি ডলার নিয়ে যাচ্ছে। অনানুষ্ঠানিকভাবে আরো বেশি অর্থ চলে যাচ্ছে। এ জন্য মানবসম্পদ উন্নয়নে জোর দেন তিনি। আহসান এইচ মনসুর বলেন, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় আমলাতন্ত্র আরো কার্যকর করতে হবে। তা ছাড়া নীতি সংস্কারেরও তাগিদ দেন তিনি।

ব্যারিস্টার নিহাদ কবির বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন বলে, বাংলাদেশের ট্যাক্স পলিসি কত দিন স্থির থাকবে, কত দিন বৈদেশিক নীতি অপরিবর্তিত থাকবে, আমরা এসবের কোনো উত্তর দিতে পারি না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিনিয়োগকারীরা এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরতেই থাকে। তারা এক স্থানে কোনো সমাধান পায় না। আমরা নীতি সংস্কারের কথা বলছি; কিন্তু বিডারকে আমরা যথেষ্ট ক্ষমতা দিচ্ছি না, পর্যাপ্ত জনবলও নেই। সরকার ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে কাজ করছে, কিন্তু কমপক্ষে ৫-৭টি অগ্রাধিকার দিয়ে দৃশ্যমান করতে হবে।

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ‘আমরা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট বা জনসংখ্যার বোনাসকালের কথা বলছি। কিন্তু এরই মধ্যে ১০ বছর পেরিয়ে গেছে। এখনো উচ্চশিক্ষিত ৪৭ শতাংশ বেকার। কারখানার জন্য জনবল প্রয়োজন।’ আমরা রপ্তানি বাড়াতে জোর দিচ্ছি। কিন্তু মানবসম্পদ উন্নয়নে তেমন জোর দিচ্ছি না। বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. এম মাসরুর রেজা বলেন, ডুইং বিজনেস প্রতিবেদনে যে সূচকগুলো রয়েছে তার সঙ্গে সরকারের ২৪টি মন্ত্রণালয়ও বিভাগ জড়িত। তাই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে চার শয়ের বেশি সংস্কারের প্রস্তাব সরকারকে দিয়েছি। সরকারের উচ্চপর্যায়ে সংস্কারের কথা বললেও মাঠপর্যায়ে আর আমলাতন্ত্র কাজ করে না। আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীর বলেন, সামনে নির্বাচন আসছে, এখন কী করে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি বলেন, খুলনা, বগুড়া এসব অঞ্চলে আগে মাঝারি আকারের কারখানা ছিল; কিন্তু এখন আর সেগুলো নেই। সরকার শিল্পায়নের উল্টো পথে হাঁটছে। সাবেক বাণিজ্যসচিব সোহেল আহমেদ চৌধুরী বলেন, আমলাতন্ত্রে আগের মতো দক্ষতা নেই। অর্থ মন্ত্রণালয়ে দুজন অতিরিক্ত সচিবের কাজ এখন করছেন ৯ জন। এরশাদ সরকারের আমলে নিয়োগ দেওয়া কর্মকর্তাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তাদের দিয়ে আমলাতন্ত্র চলবে কী করে।



মন্তব্য