kalerkantho


সাক্ষাৎকারে জনতা ব্যাংকের সিইও মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ

তৃণমূল থেকে সব স্তরে সেবার মান বাড়বে

মোশতাক আহমদ   

৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



তৃণমূল থেকে সব স্তরে সেবার মান বাড়বে

গত চার বছরের মধ্যে ২০১৭ সালে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করেছে জনতা ব্যাংক। পরিচালনা পর্ষদের সময়োপযোগী নির্দেশনার ফলেই পরিচালন মুনাফা অর্জনসহ সার্বিক ফলাফল ইতিবাচক হয়েছে। আগামীতে ব্যাংকটিতে সেবার মান বাড়াতে নতুন নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ডিপোজিটের পরিমাণ ৬৫ হাজার কোটি টাকা থেকে আগামী তিন বছরে ৮৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হবে। বাড়ানো হবে গ্রামীণ উদ্যোক্তা, কৃষিভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও মুক্তিযোদ্ধাদের ঋণপ্রবাহ।

রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটিকে নিয়ে এসব পরিকল্পনার কথা জানান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ। গত বছরের ৫ ডিসেম্বর তিনি সিইও হিসেবে ব্যাংকটির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে জনতা ব্যাংক নিয়ে নানা পরিকল্পনার কথা জানান।

আব্দুছ ছালাম আজাদ বলেন, সাবেক এমডি বিদায় নেওয়ার পর গত বছরের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে আমি জনতা ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব নিই। এরপর ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে এমডি হিসেবে যোগ দিই। দায়িত্ব গ্রহণের পর ত্বরিত গতিতে খেলাপি ঋণ আদায়সহ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পথচলার রূপরেখা তৈরি করেছি। সে আলোকে বিভাগভিত্তিক সম্মেলন করে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জাগিয়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে বিপুল সাড়াও পেয়েছি।

তিনি বলেন, ২০১৭ সালে জনতা ব্যাংক ১ হাজার ১৭১ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করেছে। গত চার বছরের মধ্যে এ বছরই সর্বোচ্চ মুনাফা করেছে ব্যাংকটি। ২০১৭ সালে ১ হাজার ৫০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এ মুনাফা। এটি ২০১৬ সালের তুলনায় ১৬৫ কোটি টাকা বেশি।

পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের দিকনির্দেশনা কঠোরভাবে পরিপালনের ফসলই আজকের এই অর্জন দাবি করে তিনি বলেন, ব্যাংকের শ্রেণীকৃত ঋণ আদায়ের বিষয়ে অডিট কমিটির কাছে শাখা ব্যবস্থাপকদের সরাসরি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে কেইস টু কেইসভিত্তিক বড় বড় ঋণগ্রহীতার সঙ্গে আলোচনা করা হয়। বিভাগীয় পর্যায়ে শাখা ব্যবস্থাপক সম্মেলনে বিভাগীয় প্রধানসহ শাখা ব্যবস্থাপকদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়। পরিচালনা পর্ষদের সময়োপযোগী নির্দেশনার ফলেই পরিচালন মুনাফা অর্জনসহ সার্বিক ফলাফল ইতিবাচক হয়েছে।

শুধু মুনাফাই নয়, ‘আমরা ব্যাংকের সব স্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠাসহ শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ হ্রাস এবং শ্রেণীকৃত ঋণমুক্ত শাখার সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও কাজ করেছি। সেই ধারাবাহিকতায় আমরা শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ কমাতে সক্ষম হয়েছি এবং ১১৫টি শাখাকে শ্রেণীকৃত ঋণমুক্ত করতে সক্ষম হয়েছি।’

ঋণের বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে তিনি বলেন, সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঋণই বড় কিছু গ্রাহকের কাছে কেন্দ্রীভূত হয়ে গেছে। জনতা ব্যাংকও এর ব্যতিক্রম নয়। বড় গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় বাড়িয়ে ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমাদের ওপর ঋণের বোঝা কমানোর জন্য বড় গ্রাহকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। জনতা ব্যাংকের পুনর্গঠিত ঋণের মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠানের টাকা খেলাপি হয়ে গেছে। এরই মধ্যে ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তারাও উচ্চ আদালতে রিট করেছে।

পুনর্গঠন করা অন্য সাতটি গ্রুপের ঋণের মধ্যে দু-তিনটি কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে। ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোও ঋণ নিয়মিত করেছে। ঋণ পুনর্গঠন করা কয়েক গ্রাহক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পুনঃতফসিল চেয়ে আবেদন করেছিল। জনতা ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ ক্ষেত্রে কোনো আবেদন জানানো হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃতফসিলের সুযোগ দেবে না বলে পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে আমরা জেনেছি।

তিনি বলেন, সোনালী ব্যাংক হলমার্ক নিয়ে কিংবা জনতা ব্যাংক বিসমিল্লাহ্ কেলেঙ্কারি নিয়ে সমালোচিত হয়েছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কিছু ঘটনায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সমালোচিত। কিন্তু বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পর্ষদ ও ব্যবস্থাপকসহ পদচ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। এ থেকে অন্য ব্যাংকগুলোকে শিক্ষা নিতে হবে। তবে সরকারি ব্যাংকগুলোয় আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বচ্ছতা এসেছে। আমরা প্রতি মাসেই জনতা ব্যাংকের এডি রেশিও পর্যালোচনা করছি। ফলে আমরা ব্যাংকের প্রকৃত তথ্য জানতে পারছি। ওভার এক্সপোজারে যাচ্ছি না।

আব্দুছ ছালাম আজাদ বলেন, গত বছর জনতা ব্যাংক একটি ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছে। এখান থেকে আমরা নতুন বছর শুরু করতে চাই। নতুন বছরে ব্যাংকের অভ্যন্তরে আর্থিক সুশাসন নিশ্চিত করে সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও কার্যক্রমে বৈচিত্র্য আনা হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য ব্যাংকের তুলনায় জনতা ব্যাংক যে ব্যতিক্রম, সেটি প্রমাণ করা হবে। বিগত দিনের ভাবমূর্তির তুলনায় ভবিষ্যৎ ভাবমূর্তি উন্নত করা হবে।

পুনঃতফসীলকৃত ঋণ আদায় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্রাঞ্চ থেকে হেড অফিস পর্যন্ত আয় বাড়ানো হবে। এলসি, এটি আর, এক্সপোর্ট, এটিএম বুথ বাড়িয়ে সেবার মান ধরে রাখা হবে। সার্ভিস প্যাটার্ন ধরে রাখা হবে। গ্রামীণ উদ্যোক্তা বাড়ানো হবে। কৃষিভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও মুক্তিযোদ্ধাদের ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি করা হবে।

তিনি জানান, বর্তমানে ব্যাংকের ডিপোজিট আছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা, এটাকে আগামী তিন বছরে ৮৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হবে। ক্লাসিফিকেশন ঋণ সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা হবে।

১৯৮৩ সালে সিনিয়র অফিসার হিসেবে যোগ দিয়ে মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ জনতা ব্যাংকে ক্যারিয়ার শুরু করেন। তিনি প্রতিদিন তিন-চার কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে অফিস করতেন। এ ছাড়া অফিসে যেতে তাঁকে ভ্যানে ও নদী পার হতে নৌকায় উঠতে হতো। তিনি এর আগে একই ব্যাংকের ডিএমডি, বিভিন্ন শাখার প্রধানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া তিনি প্রধান কার্যালয়সহ বিভিন্ন শাখা ও ডিপার্টমেন্টের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।



মন্তব্য