kalerkantho


ভোজ্য তেলে ভিটামিন কারসাজি

৩১টি নমুনার মধ্যে ১৭টিতে সঠিক মাত্রায় ‘এ’ পায়নি বিএসটিআই

শওকত আলী   

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ভোজ্য তেলে ভিটামিন কারসাজি

রিফাইনারি ও মোড়কজাতকারী কম্পানিগুলোর জন্য ভোজ্য তেলে সঠিক মাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ নিশ্চিতকরণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু ব্যবসায়ীরা এ বিষয়টিতে কান দিচ্ছে না। সম্প্রতি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) বাজারজাতকৃত ভোজ্য তেলে ভিটামিন ‘এ’-এর উপস্থিতি আছে কি না, তা পরীক্ষা করে। বোতলজাত ও ড্রামের ৩১টি নমুনা পরীক্ষা করে তারা। এর মধ্যে ১৭টি নমুনাতেই ভিটামিন ‘এ’-এর সঠিক উপস্থিতি পায়নি প্রতিষ্ঠানটি।

বিএসটিআই সূত্রে জানা গেছে, বোতলজাতকারী ভোজ্য তেলের ১৪টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ১২টিতে সঠিক মাত্রায় ভিটামিন থাকলেও দুটিতে ভিটামিনের সঠিক মাত্রার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। আর ড্রামের ১৭টি নমুনা পরীক্ষা করে এর ১৫টিতে ভিটামিনের সঠিক মাত্রা পাওয়া যায়নি। শুধু তা-ই নয়, এই ১৫টির মধ্যে আবার ১২টিতে কোনো প্রকার ভিটামিন ‘এ’ মেশানোই হয়নি বলে এ পরীক্ষায় উঠে এসেছে। অর্থাৎ মোট ৩১টি নমুনার মধ্যে পাঁচটিতে পরিমাণের চেয়ে কম ভিটামিনের উপস্থিতি এবং ১২টিতে ভিটামিন ‘এ’-এর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

সয়াবিন তেলে ভিটামিন ‘এ’-এর পরিমাণ থাকার কথা ১৫-৩০ পিপিএম। ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবজনিত সৃষ্ট অপুষ্টি এবং স্বাস্থ্যগত জটিলতা নিরসনে সরকার ভোজ্য তেলে ভিটামিন ‘এ’সমৃদ্ধকরণ আইন, ২০১৩ এবং বিধিমালা, ২০১৫-এর মাধ্যমে ভোজ্য তেলে ভিটামিন ‘এ’ ফর্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর এই আইন সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে শিল্প মন্ত্রণালয়, বিএসটিআই এবং প্রকল্প সহযোগী হিসেবে গেইন বাংলাদেশ কাজ করছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাজার মনিটরিংয়ে কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকায় ব্যবসায়ীরা আসলে যা খুশি তা-ই করছে, যা খুবই দুঃখজনক। অর্ধেকের বেশি পরিমাণ নমুনাতে ভিটামিনের সঠিক উপস্থিতি না থাকায় মনিটরিং প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছে। জানা গেছে, সঠিক পরিমাণে ভিটামিন মেশালে প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ২০-৪০ পয়সা পর্যন্ত খরচ পড়ে।

বাজারে থাকা সব প্রকার ভোজ্য তেলের বাংলাদেশ মান সংশোধন, কারখানা পরিদর্শন এবং বাজার সার্ভেইল্যান্সের মাধ্যমে বিএসটিআই নিয়মিত এটা মনিটর করে থাকে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসটিআইয়ের পরিচালক (সিএম) প্রকৌশলী এস এম ইসহাক আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা এটা চাইলেই করতে পারে। আসলে তাদের সদিচ্ছার পুরোপুরি অভাব রয়েছে। তা না হলে এ অবস্থা তৈরি হতো না। কারণ প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ খরচ পড়ে ৪০ পয়সা।’

এর পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে পারলে বিষয়টি সমাধানে আরো দ্রুত কাজ করা যেত বলে জানান তিনি। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিরুদ্ধে মামলা চলমান থাকার কারণে বর্তমানে ভ্রাম্যমাণ আদলতের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

গত ২৮ নভেম্বর বিষয়টি নিয়ে বিএসটিআই ভবনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক মো. সাইফুল হাসিব ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে দেন। সে সময় তিনি বলেন, ভোজ্য তেলের মান এবং ভিটামিনের পরিমাণ ঠিক রাখার জন্য সাধারণ ড্রামের পরিবর্তে ফুডগ্রেড ড্রামে ভোজ্য তেল সরবরাহ করতে হবে। এ ছাড়া ড্রামের পরিবর্তে ধীরে ধীরে কনটেইনারে তেল সরবরাহের ব্যবস্থা নিতে হবে।

তবে সম্প্রতি ভোজ্য তেলে ভিটামিন ‘এ’ ফর্টিফিকেশন প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী কমিটি একটি বৈঠক করে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে ভোজ্য তেল বাজারজাত করার জন্য সাধারণ ড্রাম ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। কারণ সাধারণ ড্রামে মানের নিয়ন্ত্রণ যেমন হয় না, তেমনি তেলগুলোকে বাজারজাত করেছে, সেটা বোঝার কোনো উপায় নেই। তাই বিস্তারিত লেবেলিংসহ দ্রুত কিভাবে ফুডগ্রেড ড্রামে ভোজ্য তেল সরবরাহের ব্যবস্থা করা যাবে, সেটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম প্রধান ও ‘ফর্টিফিকেশন অব এডিবল অয়েল ইন বাংলাদেশ (ফেজ-২)’-এর প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ তাসারফ হোসেন ফরাজী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি। ব্যবসায়ীদের আর সাধারণ ড্রাম ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। ফুডগ্রেড ড্রাম ব্যবহার করতে হবে। এর জন্য আমরা সব বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান ও রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে সভা করব। সিদ্ধান্ত মোতাবেক এ মাসেই শিল্পমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানেই সব ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হবে।’

এর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন পড়লে আইন সংশোধনের ব্যবস্থাও করা হবে বলে জানান এই প্রকল্প পরিচালক। উল্লেখ্য, ২৬টি রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দিয়েছে বিএসটিআই। এর ৫০ শতাংশই এখন রাইস ব্রান ওয়েলের।

ভিটামিন এ-সমৃদ্ধকরণ আইন, ২০১৩ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ভোজ্য তেলে নির্ধারিত মাত্রার কমে ভোজ্য তেলে ভিটামিনসমৃদ্ধ করা ছাড়া বিক্রয়, সংরক্ষণ, সরবরাহ, বিপণন বা বাজারজাত করতে পারবে না। এর ব্যত্যয় ঘটলে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সর্বনিম্ন ৫০ হাজার থেকে সবোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং সর্বনিম্ন ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বাজার মনিটরিংয়ে বিএসটিআই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ারের কথা বলা আছে।


মন্তব্য