kalerkantho


প্রবৃদ্ধির সুফল পাবে ধনী, গরিব গরিবই থাকবে

বিশ্বে অর্থনৈতিক অসমতা বাড়বে

মুহাম্মদ শরীফ হোসেন   

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বিশ্বে অর্থনৈতিক অসমতা বাড়বে

নতুন বছরে অর্থনীতিতে ট্রাম্পসহ বিশ্বনেতাদের ভূমিকা চিত্রিত করা হয়েছে কার্টুনটিতে। ছবি : ফিন্যানশিয়াল টাইমস

শিল্প কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি এবং পুঁজিবাজারের উত্থানের মধ্য দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি যখন জোরালো প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে তখন ২০১৮ সাল নিয়ে সব অর্থনীতিবিদই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তবে ২০১৭ সালের হিসাব বলছে অর্থনৈতিক সাফল্যের সিংহভাগ ধনীদের পকেটেই যাচ্ছে, দরিদ্র দরিদ্রই থাকছে। গত বছর বিশ্ব শেয়ারবাজারের উত্থানে অ্যামাজনের সিইও একাই লাভবান হয়েছেন ৩৪ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বের ১ শতাংশ সম্পদশালীদের পকেটেও গেছে লাভের বড় হিস্যা। তবে এতে দরিদ্র শ্রেণি কতটুকু লাভবান হয়েছে এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনৈতিক সাফল্যের অংশ দরিদ্ররা খুব কমই পাচ্ছে, ফলে ধনী-দরিদ্র ব্যবধান আরো বাড়বে নতুন বছরে।

‘ওয়ার্ল্ড ইনইকোয়ালিটি প্রতিবেদনে’ ফরাসি অর্থনীতিবিদ থোমাস পিকেটি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘যদি ধনীদের ওপর কর বাড়ানো না হয়, তবে ধনীরা লাভের আরো বড় হিস্যা দখল কর নেবে। যে অর্থনীতি গড়ে উঠছে দরিদ্রের ঘাড়ে চড়ে।’ এতে বলা হয়, বিশ্বের ১ শতাংশ সম্পদশালীদের শেয়ার ২০৫০ সাল নাগাদ আরো ২০ থেকে ২৪ শতাংশ বাড়বে। ফলে বিশ্বের দরিদ্র অর্ধেক মানুষের সম্পদ ১০ শতাংশ থেকে কমে ৯ শতাংশেরও নিচে নেমে যাবে।

গত বছরের শেষভাগে এসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করপোরেট কর ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২১ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ কর হার ৩৯.৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৭ শতাংশ করেছেন। টেক্স পলিসি সেন্টারের হিসাব অনুযায়ী এতে ৬২ শতাংশ লাভবান হবে আমেরিকার ১ শতাংশ ধনী। আর দরিদ্রদের আয় বাড়বে ০.৪ শতাংশ। অথচ এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে অসম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের প্রতি পাঁচজন ধনীর চারজনই আমেরিকার, অথচ এ দেশটিতেই ৪ কোটি ১০ লাখ মানুষ সরকারি হিসাবে দরিদ্র। এ অবস্থায় নতুন বছরে অর্থনৈতিক সাফল্য সব ঘরে পৌঁছে দিতে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দরিদ্রবান্ধব উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন থোমাস পিকেটি।

তবে সার্বিকভাবে নতুন বছরটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় সম্ভাবনা নিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানায়, গত বছর উন্নত বিশ্ব ও উন্নয়নশীলসহ বিশ্বের তিন-চতুর্থাংশ দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, যা ২০১০ সালের পর সর্বোচ্চ। ২০১৭ সালে বিশ্ব প্রবৃদ্ধি এসেছে ৩.৬ শতাংশ, ২০১৮ সালে তা হবে ৩.৭ শতাংশ। প্রফেশনাল সেবা প্রতিষ্ঠান প্রাইসওয়াটার হাউসকুপারস (পিডাব্লিউসি) জানায়, পিপিপি হিসাবে নতুন বছরে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি হবে ৪ শতাংশ। অর্থনীতিতে নতুন যোগ হবে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। তবে নতুন বছর চ্যালেঞ্জ থাকবে অর্থনৈতিক অসমতা দূর করে সুসংহত প্রবৃদ্ধি অর্জন।

পিডাব্লিউসি জানায়, ঋণ সংকট কাটিয়ে ওঠা ইউরোজোনেরও প্রবৃদ্ধি বেড়ে নতুন বছরে ২ শতাংশ হবে। তবে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া যুক্তরাজ্যকে ভোগাবে। দেশটির প্রবৃদ্ধি হবে ১.৪ শতাংশ। পিডাব্লিউসির সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ব্যারেট কুপেলিয়ান বলেন, ‘আমরা আশা করছি ২০১৮ সালে বিশ্বে শিল্প কর্মকাণ্ড আরো বেগবান হবে। কারণ বিশ্বের শক্তিশালী তিনটি ইঞ্জিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোজোন ও এশিয়া গতিশীল রয়েছে। তবে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। ব্রেক্সিট আলোচনা যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, বড় অর্থনৈতিক দেশগুলোর নির্বাচন এবং সুরক্ষাবদী নীতি নতুন বছরের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে।

আইএমএফ জানায়, বিশ্ববাণিজ্যও খরা কাটিয়ে উঠেছে। ২০০১ সালের পর ২০১৭ সালে এসে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বিদায়ী বছরে বিশ্ব বাণিজ্যের ৪.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নতুন বছরে আরো বাড়বে। বিনিয়োগ বাড়বে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও। বিশ্বে জ্বালানির বিকল্প চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়তে বড় ভূমিকা রাখছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালে বিশ্বে নতুন যোগ হওয়া জ্বালানি উেসর দুই-তৃতীয়াংশই এসেছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে, যা ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো ঘটল। গত বছর সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে ৫০ শতাংশ, যা অন্য যেকোনো জ্বালানির উৎপাদন প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে। গবেষণায় বলা হয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ অব্যাহতভাবে বাড়বে। ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে কর্মসংস্থান হবে ৩ কোটি ৬০ লাখ।

প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক উদ্ভাবন ও গবেষণা হবে নতুন বছরে, যা অর্থনীতির ডিজিটাল রূপান্তরে আরো বড় ভূমিকা রাখবে। টেলিকম প্রতিষ্ঠান টেলিনর রিসার্চের বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ২০১৮ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বিগ ডাটা, ক্রিপ্টো-কারেন্সি এবং স্বচালিত বাহনের মতো প্রযুক্তিগুলো বিশ্ববাজারে চলে আসবে। টেলিনর রিসার্চের প্রধান বিয়র্ন টালে স্যান্ডবার্গ বলেন, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও শক্তি, যানবাহন এবং টেলিযোগাযোগসহ বিস্তৃত খাতে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার হবে। ২০১৮ সালের মধ্যে দৈনন্দিন ব্যবহার্য ডিভাইসগুলো একেকটি পেমেন্ট ডিভাইসে পরিণত হবে। এসব ডিভাইসের মধ্যে রয়েছে গাড়ির চাবি, ভেন্ডিং মেশিন, স্মার্টফোন, কানেকট্রেড গাড়ি, স্পোর্টস ওয়াচ ইত্যাদি। ২০১৮ সালে বেশ কয়েকটি নতুন ডিভাইস পেমেন্টব্যবস্থা বৈশ্বিকভাবে চালু করা হবে।

তবে অর্থনৈতিক অসমতার পাশাপাশি এ বছর বিশ্ব অর্থনীতিতে আরো কিছু চ্যালেঞ্জ থাকবে। বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যিনি ইতিমধ্যে মুক্তবাণিজ্য আলোচনা ও জলবায়ু তহবিল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। মূলত হোয়াইট হাউসে প্রবেশের সময় থেকেই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নামে সুরক্ষাবাদী নীতির ঘোষণা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নাফটা চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার হুমকি দেন, এশিয়ার সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য আলোচনায় অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। এ ছাড়া চীন, উত্তর কোরিয়া ও ইরানের সঙ্গে তাঁর শীতল সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য মোটেই সুখকর হবে না।

সুরক্ষাবাদী নীতির কারণে বিশ্বজুড়ে একটি বাণিজ্য যুদ্ধের স্পষ্ট ঝুঁকি রয়েছে বলেও মনে করেন বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার প্রধান রবার্তো আজেভেদো। তিনি বলেন, একটি বাণিজ্য যুদ্ধের ঝুঁকি খুবই স্পষ্ট। একটি দেশ যখন একতরফাভাবে সুরক্ষাবাদী নীতি আরোপ করবে তখন বাকি দেশগুলো তার জবাব দেবে। ফলে সার্বিকভাবে একটি বাণিজ্য যুদ্ধ তৈরি হবে। রবার্তো আজেভেদো বলেন, বাস্তবতা হচ্ছে যদি একটি বাণিজ্য যুদ্ধের সূচনা হয় তবে এতে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

উদ্বেগের আরেকটি কারণ হবে বেকারত্ব। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাব অনুযায়ী ২০০৮ সালে অর্থনৈতিক সংকট শুরু হওয়ার পর বিশ্বে ৬ কোটি ১০ লাখ চাকরি হারিয়ে গেছে। ফলে বিশ্বে বেকার হয় ২০ কোটি মানুষ। আর বেকারদের মধ্যে ৬০ শতাংশই তরুণ। যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সের মধ্যে। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় দীর্ঘ মেয়াদে যুদ্ধ ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের ৪৫ দেশে ৮ কোটি ৩০ লাখ মানুষের জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য সহায়তা প্রয়োজন, যা ২০১৫ সালের চেয়ে এ বছর বেড়েছে ৭০ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্যের সবচেয়ে বেশি অভাব যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে। নারী, শিশুসহ ইয়েমেনের ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্য নেই। এর মধ্যে ৩০ লাখের বেশি শিশু খাদ্যের অভাবে মারা যাচ্ছে। ইয়েমেন, লিবিয়া, সিরিয়াসহ যুদ্ধকবলিত মধ্যপ্রাচ্যে খাদ্য সংকট একটি বড় সমস্যা। এ সমস্যার জরুরি সমাধান নতুন বছরের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী আগামী ১৫ বছরে বিশ্বে খাদ্য চাহিদা বাড়বে ২০ শতাংশ।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৭ সালে সাইবার হামলায় হাজার হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কয়েক লাখ গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নতুন বছরে হামলার ভয়াবহতা বাড়বে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গার্টনার জানায়, সাইবার নিরাপত্তায় গত বছর ব্যয় হয়েছে ৮৬.৪ বিলিয়ন ডলার। সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সাল পর্যন্ত বিশ্বে সাইবার ক্ষতি দাঁড়াবে বছরে ৬ ট্রিলিয়ন ডলার। বিশেষজ্ঞা বলছেন, এ বছর আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিটকয়েনের মতো ভার্চুয়াল মুদ্রার দিকে বিশেষ নজর থাকবে হ্যাকারদের। রয়টার্স, এএফপি, সিএসও অনলাইন, মানিকন্ট্রোল, গার্ডিয়ান।


মন্তব্য