kalerkantho


ভারী শিল্পে প্রাধান্য বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

২২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ভারী শিল্পে প্রাধান্য বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে

এক বছরের ব্যবধানে অবশেষে আনুষ্ঠানিক ভিত্তি পেতে যাচ্ছে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবস্থিত বেপজা ইকোনমিক জোন। আগামী ২৪ জানুয়ারি ১১৫০ একরের এই প্রকল্পের ভিত্তিফলক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে ইতিমধ্যেই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাস্তবায়নাধীন এই ইকোনমিক জোনটি। এই জোনে প্লট পেতে ইতিমধ্যে অন্তত ৫০টি আবেদন জমা পড়েছে। তবে তৈরি পোশাকের চেয়ে প্রযুক্তিনির্ভর এবং ভারী শিল্পকেই বিনিয়োগে প্রাধান্য দেওয়া হবে বলে বেপজা সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বেপজা সূত্র জানায়, গত বছরের ১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের ইছাখালী ইউনিয়ন চরশরৎ এলাকায় ১১৫০ একর জমি বেপজা ইকোনমিক জোনের জন্য অনুমতি দেন। এরপর থেকেই সেখানে রাস্তা ও সীমানা নির্ধারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য কনসালট্যান্ট নিয়োগের দরপত্র আহ্বান করেছে বেপজা (বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন এলাকা কর্তৃপক্ষ)। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী দুই বছরের মধ্যে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবস্থিত ‘বেপজা ইকোনমিক জোন’ পুরোপুরি বিনিয়োগ উপযোগী হয়ে উঠবে বলে আশা করছে বেপজা কর্তৃপক্ষ।

বেপজার জনসংযোগ বিভাগ জানায়, আগামী ২৪ জানুয়ারি ঢাকার বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বেপজা ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টরস সামিট ২০১৮’ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই অনুষ্ঠান থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বেপজা ইকোনমিক জোনের ভিত্তিপ্রস্তর ফলক উন্মোচন করবেন তিনি। এই উপলক্ষে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবস্থিত বেপজা ইকোনমিক জোন এলাকায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে উপস্থিত থাকবেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।

এই প্রকল্পকে নিয়ে তাই বেপজার স্বপ্ন অনেক সুদূরপ্রসারী। কারণ আয়তনে বেপজা পরিচালিত দেশের ৮টি ইপিজেডে মোট জমির (২৩০৮ একর) প্রায় অর্ধেক বেপজা ইকোনমিক জোন। প্রকল্পটিতে মোট ৮০০ থেকে ৮৫০টি প্লট করা হবে বিনিয়োগের জন্য। পুরো প্রকল্পটি ১১৫০ একরের হলেও রাস্তাঘাটসহ পরিবেশগত ছাড়ের পর শুধু বিনিয়োগের জন্য থাকবে ৪৪৬ একর জমি। এই প্লটগুলোতে অন্তত ৩০০ থেকে ৩৫০টি শিল্প-কারখানা স্থাপিত হবে বলে আশা করছে বেপজা। যেখানে মোট সম্ভাব্য বিনিয়োগ ধরা হয়েছে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার। অথচ বেপজার ৮টি ইপিজেডে এ পর্যন্ত বিনিয়োগ এসেছে ৪ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার। বেপজা ইকোনমিক জোনে সম্ভাব্য কর্মসংস্থান ধরা হয়েছে ৫ লাখ।

বেপজা সূত্র জানায়, প্রায় তিন দশক ধরে ইপিজেড পরিচালনার অভিজ্ঞতার কারণে বেপজা পরিচালিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেশি। ইতিমধ্যে যে ৫০টি আবেদন জমা পড়েছে তার অধিকাংশই বিদেশি এবং ইপিজেডেরই পুরনো বিনিয়োগকারী। গত ৬ মাসেই এই আবেদনকারীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫০টি প্লটসহ মোট প্রায় ২০০টি প্লটের চাহিদাপত্র জমা পড়েছে। বেপজার এক কর্মকর্তা জানান, আবেদনকারীদের মধ্যে যেমন লেদার ফ্যাক্টরি রয়েছে তেমনি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। ব্যাপক চাহিদার কারণেই বেপজা এখন অনেক চুজি। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে যেমন প্রাধান্য দেওয়া হবে তেমনি গার্মেন্টের তুলনায় লেদার, প্রযুক্তিনির্ভর ভারী শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নিকটবর্তী এবং চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে প্রকল্পের অবস্থানের কারণে বিনিয়োগকারীদের কাছে অর্থনৈতিক অঞ্চলটির আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি। তা ছাড়া সরকারি উদ্যোগে রাস্তা, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিতের সুযোগ থাকা এবং মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলেই সমুদ্র তীরবর্তী আলাদা সমুদ্রবন্দর সুবিধা থাকার কারণেও এটার গুরুত্ব অনেক বেশি।

ইপিজেড পরিচালনায় প্রায় ৩৩ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বেপজার অধীন আটটি ইপিজেডে ৩৮টি দেশের বিনিয়োগকারীরা ৪ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ইউএস ডলার বিনিয়োগ করেছে। এই ইপিজেডগুলোতে প্রতিষ্ঠিত ৫৮৮টি কারখানার মধ্যে ইতিমধ্যে ৪৬৪টি চালু আছে। বাকিগুলো আগামী কয়েক বছরের মধ্যে উৎপাদনে আসবে। এই কারখানাগুলোতে কর্মরত আছে প্রায় ৪ লাখ ৭৯ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের ইপিজেডগুলোয় প্লট স্বল্পতার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিগত কয়েক বছর জমি বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। স্যামসাং, সনির মতো বিশ্বখ্যাত বহুজাতিক কম্পানিকেও জমির অভাবে ফিরিয়ে দিতে হয়েছে।

বেপজা ইকোনমিক জোন দেশের শিল্পায়নে নতুন মাত্রা যোগ করবে উল্লেখ করে বেপজার মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) নাজমা বিনতে আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং অভিজ্ঞতার কারণেই দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বেপজার ওপর আস্থা রাখছেন। ইপিজেড স্থাপনে বেপজার বিশেষ দক্ষতা, পরিচালন অভিজ্ঞতা এবং পেশাগত জ্ঞান বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের কাজকে ত্বরান্বিত করবে। ইকোনমিক জোনটি চালু হলে বেপজায় আগত বিনিয়োগকারীদের চাহিদা অনুযায়ী প্লট দেওয়া সম্ভব হবে। এ কারণে বেপজার যেকোনো প্রকল্পে তাদের আগ্রহ থাকে অনেক বেশি। সব কিছু ঠিক থাকলে ২০১৯ সালের মধ্যে এই অথনৈতিক অঞ্চলে শিল্প-কারখানা স্থাপনের উপযোগী হয়ে উঠবে।’

ইপিজেডে বাংলাদেশি মালিকানাধীন বৃহত্তম এবং দেশি-বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেহেতু মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে আলাদা বন্দর হবে তাই বিনিয়োগের জন্য এই জায়গার চাহিদা হবে প্রচুর। ঝামেলা এড়াতে এখন কেউ আর জোনের বাইরে বিনিয়োগ করতে চায় না। তা ছাড়া বেপজার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে।’


মন্তব্য