kalerkantho


বিশ্ব অর্থনীতিতে গতি ফিরেছে

মুহাম্মদ শরীফ হোসেন   

২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বিশ্ব অর্থনীতিতে গতি ফিরেছে

এ বছর বাণিজ্য বাড়লেও অর্থনীতিতে ছায়া ফেলেছে যুদ্ধ ও ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট নীতি

উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জিডিপি প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে ২০১৭ সালে এগিয়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। তবে ২০১৬ সালের ধারাবাহিকতায় থেমে ছিল না প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক বিভেদ। এর মধ্যে অর্থনীতিতে বড় ছায়া ফেলেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একরোখা নীতি, যা বিশ্বজুড়ে মুক্ত বাণিজ্য আলোচনায় নতুন দেয়াল তৈরি করেছে। তবে অতিদারিদ্র্য কমছে, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়াচ্ছে এবং মূলধন হিসেবে মানবসম্পদের গুরুত্ব আরো বেড়েছে।

বেশির ভাগ দেশের প্রবৃদ্ধি জোরদার হয়েছে : আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানায়, এ বছর উন্নত বিশ্ব ও উন্নয়নশীলসহ বিশ্বের তিন-চতুর্থাংশ দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, যা ২০১০ সালের পর সর্বোচ্চ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীনের অর্থনীতি বেগবান হয়েছে। অর্থনীতিতে গতি ফিরেছে ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় দেশগুলোরও। যদিও যুদ্ধের পাশাপাশি জ্বালানির দর পড়ে যাওয়ায় বড় অঙ্কের রাজস্ব ঘাটতিতে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। তবে আরো ভালো সুখবর হচ্ছে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও রাশিয়ার মতো কয়েকটি দেশ মন্দা থেকে রক্ষা পেয়েছে।

বাণিজ্য বেড়েছে : বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের আমদানি-রপ্তানিও বেড়েছে। ফলে ২০০১ সালের পর ২০১৭ সালে এসে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বিশ্ববাণিজ্য। নেদারল্যান্ডস ব্যুরো ফর ইকোনমিক পলিসি জানায়, বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) বিশ্ববাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি এসেছে ৫.১ শতাংশ, যা ছয় বছরে সর্বোচ্চ। আইএমএফ জানায়, ২০১৭ সালে বিশ্ববাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি হবে ৪.২ শতাংশ, যা তিন বছরে প্রথমবারের মতো বিশ্ব প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যাবে। বিশ্ব প্রবৃদ্ধি হবে ৩.৬ শতংশ।

আরো সহজ হলো ব্যবসা : ১৫ বছর আগে একটি ব্যবসা শুরু করতে যে সময় লাগত এখন লাগছে তার অর্ধেক। বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বে ১৮৬ দেশে ব্যবসা সহজীকরণে প্রায় ৩ হাজার ২০০ সংস্কার হয়েছে। ফলে এ বছর একটি ছোট বা মধ্যম মানের ব্যবসা শুরু করতে বিশ্বে গড়ে সময় লেগেছে ২০ দিন। যেখানে ২০০৩ সালে সময় লাগত ৫২ দিন।

বেকারত্বের বোঝা : অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্বে জিডিপি প্রবৃদ্ধি আয়ে এখন বড় ভূমিকা রাখছে মানব মূলধন, বিশেষ করে তরুণরা। বলা হচ্ছে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পাশাপাশি মানুষের প্রচেষ্টা এখন বিশ্বের বড় সম্পদ। এ মানুষই হচ্ছে বিশ্বের সম্পদের প্রায় ৬৫ শতাংশ। তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে বিশ্বের ৬০ শতাংশ তরুণই বেকার, যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সের মধ্যে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারা আফ্রিকায় এ বেকারত্ব বাড়ছে। একটি দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতির জন্য তরুণদের চাকরি আবশ্যক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দুর্ভিক্ষকবলিত ৮ কোটি মানুষ : বিশ্বের ৪৫ দেশে ৮ কোটি ৩০ লাখ মানুষের জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য সহায়তা প্রয়োজন, যা ২০১৫ সালের চেয়ে এ বছর বেড়েছে ৭০ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্যের সবচেয়ে বেশি অভাব যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে। নারী, শিশুসহ ইয়েমেনের ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্য নেই। এর মধ্যে ৩০ লাখের বেশি শিশু খাদ্যের অভাবে মারা যাচ্ছে। ইয়েমেন, লিবিয়া, সিরিয়াসহ যুদ্ধকবলিত মধ্যপ্রাচ্যে খাদ্য সংকট একটি বড় সমস্যা। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী আগামী ১৫ বছরে বিশ্বে খাদ্য চাহিদা বাড়বে ২০ শতাংশ।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির শক্তি : বিশ্বে জ্বালানির বিকল্প চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়তে বড় ভূমিকা রাখছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালে বিশ্বে নতুন যোগ হওয়া জ্বালানি উেসর দুই-তৃতীয়াংশই এসেছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে, যা ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো ঘটল। এ বছর সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে ৫০ শতাংশ, যা অন্য যেকোনো জ্বালানির উৎপাদন প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে। গবেষণায় বলা হয়, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে কর্মসংস্থান হবে ৩ কোটি ৬০ লাখ।

ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট নীতি : আমেরিকা ফার্স্ট নীতি অবলম্বন করে বিশ্ব অর্থনীতিতে ছায়া ফেলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর অনীহাতেই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় মুক্ত বাণিজ্য আলোচনা থমকে পড়েছে, ভেস্তে গেছে জলবায়ুবিষয়ক সম্মেলন। ট্রাম্পের মুক্তবাণিজ্য চুক্তিবিরোধী বক্তব্য, মেক্সিকো ও চীনবিরোধী নানা কথা ও সর্বোপরি ইমিগ্রেন্টদের প্রতি বৈরী মনোভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। যদিও আমেরিকার অর্থনীতির জন্য ট্রাম্প এখনো কোনো মন্দের কারণ হননি।

ব্রেক্সিট : ২০১৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত গণভোটে ব্রিটেনবাসী ইউরোপ ছাড়ার পক্ষে তাদের রায় দেয়। এতে ইউরোজোন থেকে পুঁজির বহির্মুখী প্রবাহ বেড়ে যায়। অনেক বহুজাতিক কম্পানি তাদের ইউরোপীয় কার্যালয় লন্ডন থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। তবে ব্রেক্সিটের নেতিবাচক প্রভাব ব্রিটেনের অর্থনীতিতে যতটুকু পড়বে আশা করা হয়েছিল ২০১৭ সালে তা সেভাবে দেখা যায়নি। যদিও ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী ফিলিপ হ্যামন্ড বলেন, দেশের অর্থনীতিতে ব্রেক্সিট এখনো ‘অনিশ্চয়তার কালো মেঘ’ হয়ে ঝুলে আছে, যা দ্রুত পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

বিটকয়েনের নাটকীয় উত্থান : ২০১৭ সালের শুরুতে প্রতিটি বিটকয়েনের দাম ছিল ১ হাজার ডলারেরও নিচে। বছর শেষ মাস ডিসেম্বরে এ ডিজিটাল মুদ্রার দাম ওঠে রেকর্ড ১৯ হাজার ৫০০ ডলার। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, এ বছর বিটকয়েনের দাম বেড়েছে ১৭০০ শতাংশ। শুধু ডিসেম্বরেই দাম বেড়েছে ৮০ শতাংশ। অনেকটা ঝড়ের গতিতে বাজারে ঊর্ধ্বমুখী হওয়া বিটকয়েনকে এখন অনেকেই ভবিষ্যতের মুদ্রা হিসেবে ভাবতে শুরু করেছেন। সর্বশেষ গত ২৭ ডিসেম্বর বিটকয়েনের দর ১৬ হাজার ৩০ ডলার হয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জাগরণ : যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ অনেক দেশের বিজ্ঞানীরাই মানুষের বুদ্ধিমত্তা নকল করে রোবট তৈরিতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, সফলতাও আসছে। এ বছর রোবট সোফিয়াকে সৌদি আরবের নাগরিকত্ব প্রদান তার উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এ ছাড়া ভারী শিল্প প্রযুক্তিতে কাজ করছে রোবট। রেস্টুরেন্ট-শপিং মলে মানুষকে স্বাগত জানাচ্ছে রোবট, চিকিৎসাক্ষেত্রে রোবটিক সার্জারির অগ্রগতি এবং ক্যান্সার শনাক্তকরণ ও হার্টের পরিস্থিতি বুঝতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার হচ্ছে। এ ছাড়া স্বচালিত গাড়িও ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলক রাস্তায় নামিয়েছে অনেক কম্পানি। ফলে বিশ্বের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যে একটি বড় ভূমিকা থাকছে তা এখন অনেকটাই স্পষ্ট। রয়টার্স, এএফপি, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ।



মন্তব্য