kalerkantho


উচ্চ ঝুঁকিতেও লোকসানি কম্পানিতে বিনিয়োগ

রফিকুল ইসলাম   

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



উচ্চ ঝুঁকিতেও লোকসানি কম্পানিতে বিনিয়োগ

মুনাফার মুখ না দেখলেও শেয়ারের দাম বাড়ছে পুঁজিবাজারের বছর বছর লোকসানি কম্পানির। আর্থিকভাবে এসব কম্পানি ‘ভঙ্গুর’ হয়ে পড়লেও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে শেয়ারের দাম। গত ছয় মাসে এসব কম্পানির শেয়ারের দাম ঊর্ধ্বমুখী। কোনো কম্পানিতে দ্বিগুণ আবার কোনোটিতে বেড়েছে কয়েকগুণ। শেয়ারের আয় আনুপাতের হিসাবে এসব কম্পানিতে বিনিয়োগ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বাড়তি দামে শেয়ার কিনছে বিনিয়োগকারী।

কম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ও শেয়ারের বাজারদামের ভিত্তিতে কম্পানির আয় অনুপাত বা পি/ই নির্ধারণ করা হয়। পিই অনুপাতের ধারণা অনুযায়ী সর্বশেষ বার্ষিক আয় থেকে কোনো কম্পানিতে বিনিয়োগ ফেরত পেতে সময় লাগবে পিই র‌্যাশিওর সমান। যেমন, একটি কম্পানির পিই র‌্যাশিও ৩০০। এই কম্পানিতে বিনিয়োগ করলে ফেরত সমমূলধন ফেরত পেতে সময় লাগবে ৩০০ বছর।

বাজারে তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কিছু কম্পানি বছর বছর লোকসানে থাকলেও শেয়ারের দাম বাড়ছে অস্বাভাবিকভাবে। কোনো কম্পানির শেয়ারের দাম গত ছয় মাসে দুই থেকে তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিপরীত পক্ষে কম্পানির আর্থিক হিসাবে কোনো উন্নতি আসেনি। ২০১৫ সালে যে কম্পানি বছর লোকসানে ছিল, ঠিক দুই বছর পরও একই অবস্থায় রয়েছে। ব্যবসা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। তবুও কম্পানির শেয়ারের দামে উল্লম্ফন। গত সপ্তাহের হিসাবেও দেখা গেছে, মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষে উঠে আসে দুর্বলভিত্তির ‘জেড’ ক্যাটাগরি ১০ কম্পানি।

পিই র‌্যাশিওর হিসাব অনুযায়ী লোকসানি কম্পানিতে বিনিয়োগ করলে মূলধন ফেরত পাওয়ার শঙ্কা থাকে। কারণ বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই কম্পানির ভিত্তি বা অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। যে কম্পানি লোকসানে আছে, পরবর্তী সময় আরো লোকসান করবে নাকি মুনাফা করবে সেটা জানা কঠিন। যার কোনো আয় নেই, যাতে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ ও লোকসানি তাতে বিনিয়োগ না করতে পরামর্শ সংশ্লিষ্টদের। দেখা গেছে, দুলামিয়া কটন, ইমাম বাটন, সাভার রিফ্যাক্টরিজ, সমতা লেদার, শ্যামপুর সুগার ও জিলবাংলা ধারাবাহিকভাবে লোকসানে রয়েছে।

১৯৯৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের কে অ্যান্ড কিউ। ২০১৩ সাল থেকে কম্পানিটি লোকসানে থাকলেও ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে মুনাফায় ফিরেছে। আর্থিক হিসাব বছর শেষ হয়েছে কম্পানিটির। আগের দুই প্রান্তিকে লোকসান হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তে এ বছর শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। তবে প্রথম প্রান্তিকে কম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় করেছে ০.১৪ টাকা। যদিও এই সময়ে গত বছর লোকসান ছিল ০.৩৫ টাকা। সেই হিসাবে কম্পানিটি লোকসান থেকে মুনাফায় ফিরেছে। বর্তমানে কম্পানিটির শেয়ারের দাম ১৪৩ টাকা। যদিও চলতি বছরের ১২ জুলাই কম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল ৫৭.৩ টাকা। শেয়ারের দাম প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ দাম হিসাবে কম্পানিটির পিই দাঁড়ায় ২৫৫.৩৫। অর্থাৎ এই শেয়ার কিনলে মূলধন ফেরত পাওয়া যাবে ২৫৫ বছর পর।

সূত্র জানায়, কোনো কম্পানির লোকসানে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে না পারলে দুর্বলভিত্তি হিসাবে জেড ক্যাটাগরিতে অবনমন করা হয়। নিয়মিত লভ্যাংশ দেওয়া কম্পানির শেয়ার কেনাবেচা তিন কার্যদিবসে সম্পন্ন হলেও এই ক্যাটাগরির শেয়ার কেনাবেচা সম্পন্ন হয় ৯ কার্যদিবস। আর এই কম্পানির শেয়ারের বিপরীতে কোনো মার্জিন ঋণ দেওয়া হয় না।

বছর বছর লোকসান ও শেয়ারগ্রাহককে কোনো লভ্যাংশ না দিলেও শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বাড়লে কারণ জানতে কম্পানিকে চিঠি দেয় স্টক এক্সচেঞ্জ। সাধারণত, কম্পানি সম্পর্কে কোনো সংবেদনশীল তথ্য, কম্পানির উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন প্লান্ট স্থাপন বা বছর মুনাফা বৃদ্ধি ও লভ্যাংশসংক্রান্ত তথ্যে শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পায়। আর এই সংবেদনশীল তথ্য পত্রিকার মাধ্যমে প্রকাশ করতে হয়। আর স্টক এক্সচেঞ্জকে জানানো হলে ওয়েবসাইটে তথ্যটি প্রকাশ করা হয়।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোনো কম্পানির সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের আগেই জেনে যাচ্ছে বিনিয়োগকারী। একটি সংঘবদ্ধ চক্র অতি মুনাফা ও কারসাজি করতে শেয়ার কিনে রেখে কৌশলে তথ্য ছড়িয়ে দেয়। এতে অন্য বিনিয়োগকারী শেয়ার কিনতে হুমড়ি খেলে দাম বেড়ে যায়। আবার কখনো কখনো গুজব কিংবা মিথ্যা তথ্য রটিয়েও শেয়ারের দাম বাড়ানো হয়। তবে ক্ষুদ্র বা সাধারণ বিনিয়োগকারী কম্পানি মৌলভিত্তি বা ফান্ডামেন্টালস বিবেচনা না করে গুজবে শেয়ার কিনছে। লোকসানি কম্পানিতে উচ্চ ঝুঁকি হলেও শেয়ার কিনছে।


মন্তব্য