kalerkantho


টাকার বিপরীতে চড়া হচ্ছে ডলার

শেখ শাফায়াত হোসেন   

১৯ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



টাকার বিপরীতে চড়া হচ্ছে ডলার

রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেশি হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় চাহিদা বেড়েছে ডলারের। এতে করে ডলারের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় দরও কিছুটা বেড়েছে।

তবে দর নিয়ন্ত্রণে বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়াতে বেশ কিছু ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর পরও টাকার বিপরীতে ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে ডলার।

গত বৃহস্পতিবার আমদানিতে সর্বোচ্চ ডলারের দর ছিল এইচএসবিসির, ৮৩ টাকা। ট্রাস্ট ব্যাংকের ডলারের দর ছিল ৮২.৯৮ টাকা। নগদ ডলারের দর ছিল সর্বোচ্চ বেসিক ব্যাংকের, ৮৪ টাকা। ডলারের বাড়তি চাহিদা মেটাতে চলতি অর্থবছরের চার মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে প্রায় ৪৫ কোটি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পরও চাহিদা মেটাতে ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স আহরণ বাড়িয়ে নিজস্ব উৎস সমৃদ্ধ করায় মনোযোগ দিয়েছে। এদিকে চাহিদা বৃদ্ধির চাপকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি কোনো কোনো ব্যাংক আমদানি পর্যায়ে প্রতি ডলার ৮৪ টাকা দাম ধরেছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে তা আবার ৮৩ টাকার নিচে নেমেছে।

ডলারের দর কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় রেমিট্যান্স প্রেরক ও রপ্তানিকারকরা বাড়তি টাকা পাচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে রেমিট্যান্স আরো বাড়বে আশা প্রকাশ করে বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফেদা) সভাপতি ও মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নূরুল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা বাফেদার থেকে এবং অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটগুলো থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করেছি। কোনো কোনো ব্যাংক ডলারের দর একটু বেশি কোট করে ফেলেছিল। সেটা আমরা উদ্যোগ নেওয়ায় ৮৩ টাকার নিচে চলে এসেছে। আন্ত ব্যাংক রেট থেকে এখন আর কেউ দুই টাকার বেশি বাড়িয়ে রেট নিতে পারবে না। তা ছাড়া ব্যাংকের নিজস্ব লেনদেনগুলোর রেট থেকেও আমদানি পর্যায়ে ডলারের রেট এক টাকার বেশি বাড়িয়ে নেবে না। এতে ডলারের দর দ্রুত ওঠানামার হাত থেকে রক্ষা পাবে বলে আমরা মনে করি। ’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) এক হাজার ৮৫২ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে ২৪ শতাংশ। অথচ এ সময়ে রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৭.০৩ শতাংশ। তা ছাড়া টানা দুই অর্থবছর রেমিট্যান্স কমার পর চলতি অর্থবছরে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত রেমিট্যান্সে ৬.৮৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

বিগত অর্থবছরে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় থেকে দেশে আসা ডলারের বিপরীতে আমদানি ব্যয় তেমন না বাড়ায় উদ্বৃত্ত ডলার কিনে দর স্থিতিশীল রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে এই অর্থবছরে এখন পর্যন্ত এক ডলারও কিনতে হয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের।

গত ২০১৬-১৭ অর্থবছর বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ১৯৩ কোটি ১০ লাখ ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিক্রি করেছিল ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাজার থেকে ৪১৩ কোটি ১০ লাখ ডলার কিনলেও এক ডলারও বিক্রি হয়নি। এর আগে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ৩৭৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার কেনে, বিক্রি করে ৩৫ কোটি ৭০ ডলার। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৫১৫ কোটি ডলার কিনলেও কোনো ডলার বিক্রির প্রয়োজন পড়েনি। বর্তমানে চাহিদা বাড়ার কারণে ডলারের দর ৭৮ টাকা থেকে বেড়ে আন্ত ব্যাংকেই ৮১ টাকায় উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের আন্ত ব্যাংক ডলারের দর ছিল ৮১.১৫ টাকা। এক বছর আগে (১৬ নভেম্বর ২০১৬) এই দর ছিল ৭৮.৫৮ টাকা। প্রতি ডলারের দর বেড়েছে ২ টাকা ৫৭ পয়সা। তা ছাড়া আগামী ডিসেম্বরে স্কুল-কলেজ ছুটি থাকায় অনেকেই বিদেশ ভ্রমণে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যে কারণে নগদ ডলারেরও দাম কিছুটা চড়া থাকে এই সময়।

গত এপ্রিলে সরকারি কয়েকটি সংস্থার আমদানি ব্যয় মেটানোর চাপকে কেন্দ্র করে ব্যাংকগুলোর আমদানি পর্যায়ের ডলারের দর অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় আন্ত ব্যাংক গড় দরের চেয়ে আমদানিতে দুই টাকার বেশি ব্যবধান না রাখতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপর থেকে কয়েক মাস ডলারের দর কিছুটা কম থাকলেও সম্প্রতি আবার কিছুটা বাড়তে দেখা যায়। গত সপ্তাহের আগের সপ্তাহে কোনো কোনো ব্যাংকের আমদানি পর্যায়ের ডলারের দর ৮৪ টাকায় উঠে যায়। আন্ত ব্যাংকে যেখানে ডলারের গড় দর ছিল ৮১ টাকার নিচে। এমন পরিস্থিতিতে নৈতিক চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে সম্প্রতি এসব ব্যাংককে টেলিফোন করে কড়া বার্তা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরই মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংকের ট্রেজারি কার্যক্রমের ওপর বিশেষ পরিদর্শনও পরিচালিত হয়েছে। এর ফলে গত সপ্তাহে আমদানি পর্যায়ে সব ব্যাংকের ডলারের দর ৮৩ টাকার নিচে নেমে এসেছে।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমদানি-রপ্তানি ও রেমিট্যান্সসহ সব ধরনের বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের হয়ে দেনা-পাওনা মিটিয়ে থাকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। ফলে রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের বিপরীতে আহরণ করা বিদেশি মুদ্রাসংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো জমা রেখে বাজারদরে গ্রাহকদের সমপরিমাণ টাকা দিয়ে থাকে। একইভাবে আমদানির ব্যয় পরিশোধের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সমপরিমাণ ডলার দিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে ডলার কেনাবেচার মাধ্যমে কিছু অর্থ মুনাফা থাকে ব্যাংকগুলোর।

কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সংরক্ষিত নিত্যপণ্য আমদানির মাসিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চালের আমদানি ব্যয়। তা ছাড়া বস্ত্র খাতে ব্যবহারের কাঁচা তুলা, শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি, ভোজ্য তেল ও তেলবীজ এবং চিনির আমদানি ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।

তবে সে তুলনায় রপ্তানি আয় না বাড়ায় দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া রেমিট্যান্স প্রবাহ সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও দীর্ঘদিন ধরেই মন্দাভাব থাকায় বিদেশি মুদ্রার জোগানে চাপ রয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে (ব্যালান্স অব পেমেন্ট) ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের করা লেনদেন ভারসাম্য সারণি থেকে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বরে ইপিজেডসহ রপ্তানি খাতে বাংলাদেশ আয় করেছে ৮৫৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এর বিপরীতে আমদানি বাবদ ব্যয় হয়েছে এক হাজার ২১৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার। পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ৩৬৫ কোটি ডলার। তা ছাড়া সেবা খাতের বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০২ কোটি ৬০ লাখ ডলারে। সামগ্রিকভাবে আয়ের তুলনায় বিদেশি মুদ্রা বেশি খরচ হওয়ায় দেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ১৭৯ কোটি ১০ লাখ ডলার ঘাটতি রয়েছে।


মন্তব্য