kalerkantho


বাণিজ্য চট্টগ্রামে অনুমোদন ঢাকায়

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

২০ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



বাণিজ্য চট্টগ্রামে অনুমোদন ঢাকায়

বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী ও শীর্ষ দেশগুলোর কাছে চট্টগ্রাম বিনিয়োগের জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিদেশি সেই বিনিয়োগ আনতে সরকার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ঘিরে ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছে; এর বাস্তবায়নও চলছে।

কিন্তু সেই বিনিয়োগ অনুমোদনের অধিকাংশই এখনো ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় সুফল পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে একজন উদ্যোক্তা ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণ করতে সরকারি-বেসরকারি ৫৫টি সংস্থা-প্রতিষ্ঠানের অনুমতি নিতে হয়। এর মধ্যে ২৮টির অনুমোদনের জন্য উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীকে এখনো ঢাকায় দৌড়াতে হয়। চট্টগ্রাম থেকে অনুমোদন মেলে শুধু ২৭টির। চট্টগ্রামের অনুমোদন যত দ্রুতই মিলুক না কেন বাকি অনুমোদনের জন্য ব্যবসায়ীকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে করে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ঘিরে যে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে তার দ্রুত সুফল পাওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

প্রতিক্রিয়ায় চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘ভৌগোলিক অবকাঠামো সুবিধার কারণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ঘিরে সরকার অনেক মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এটা চট্টগ্রাম বা চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের জন্য করা হচ্ছে এমনটি নয়।

পুরো দেশের ব্যবসায়ী এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য এ সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তাহলে অনুমোদন কেন ঢাকাকেন্দ্রিক হবে?

সার্ক চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রথমেই চাইবে বন্দর সুবিধা। আর চট্টগ্রাম থেকেই সব ফাইল প্রক্রিয়া অনুমোদন করতে চাইবে। অবকাঠামো সুবিধা নিশ্চিত হওয়ার আগেই এসব অনুমোদন ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে বাস্তবায়নের সময় এসেছে।

জানা গেছে, দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় পুরোটাই চট্টগ্রাম বন্দরনির্ভর। আমদানি-রপ্তানি পণ্যের ৯৩ শতাংশ আনা-নেওয়া হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। ফলে খরচ সাশ্রয় বিবেচনায় চট্টগ্রাম ঘিরেই ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতিবছর পণ্য ওঠানামায় ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও বিগত ১০ বছরে নতুন কোনো জেটি ও টার্মিনাল নির্মিত হয়নি।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটির সদস্য এম এ লতিফ এমপি বলেন, ‘বিগত ৭-৮ বছরে বন্দরের অর্থায়নে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হয়েছে; কিন্তু বন্দরের মূল অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়নি। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর জেটি নির্মিত হয়েছে মাত্র সাতটি, প্রবৃদ্ধি যে হারে বাড়ছে তাতে হওয়া উচিত ছিল ৭০টি।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রামে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রধান অফিস থাকলেও সেগুলোকে পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। আর আঞ্চলিক অফিসগুলো থেকে জমা পড়া আবেদন অনুমোদনের জন্য ঢাকায় পাঠাতে হয়। আমদানি পণ্য ছাড় করাতে কিংবা উৎপাদিত পণ্যের গুণগতমান সনদ নিতে হয় বিএসটিআই থেকে। চট্টগ্রামে একটি আঞ্চলিক কার্যালয় থাকলেও সেখানে সংস্থার তালিকাভুক্ত ১৫৪টি পণ্যের মধ্যে ৮৫টি পণ্যের মান পরীক্ষা ও লাইসেন্স নিতে ঢাকার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।

শুধু তাই নয়, উদ্ভিদ ও উদ্ভিজ্জাত পণ্য আমদানিতে কোয়ারেনটাইন বা উদ্ভিদ সংঘনিরোধ সনদ নিতে ঢাকায় দৌড়াতে হয় ব্যবসায়ীদের। আর এসব পণ্য ব্যাংকে ঋণপত্র খোলার আগে আমদানি অনুমতি সনদ নিতে হয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঢাকা কার্যালয় থেকে। দেশে সম্ভাবনাময় জাহাজভাঙা শিল্প গড়ে উঠেছে শুধু চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূল ঘিরে। এখানকার লোহা দেশের রি-রোলিং মিলের চাহিদা মেটাচ্ছে। এই জাহাজ আমদানির অনাপত্তি থেকে শুরু করে কাটা পর্যন্ত চার ধরনের অনুমতির জন্য ঢাকায় শিল্প মন্ত্রণালয়ে দৌড়াতে হয় চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের। সমুদ্রগামী নতুন জাহাজ চলাচলের অনুমোদন, বন্দরে আসা-যাওয়াসংক্রান্ত সব জাহাজের অনুমোদন নিতে হয় নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তর থেকে। চট্টগ্রাম ঘিরেই সব লাইটার বা ছোট জাহাজের ব্যবসা, সেই জাহাজ অনুমোদনের জন্যও যেতে হয় ঢাকায়। বার্থ অপারেটর ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি এ কে এম সামশুজ্জামান রাসেল মনে করেন, ব্যবসা গতিশীলতা আনতে বিদ্যমান সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রয়োজনে প্রধান অফিস স্থানান্তর করে অগ্রাধিকার সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

জানা গেছে, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর কার্যালয় থাকলেও পণ্য রপ্তানিতে নতুন নিবন্ধনের অনুমোদন দেওয়া হয় ঢাকা থেকে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, একজন উদ্যোক্তার শিল্প-কারখানা শুরুর আগে ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে হয়। সেই ঋণ অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা চট্টগ্রামে থাকা সরকারি-বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নেই। দেশে সরকারি-বেসরকারি-বিদেশি মিলিয়ে ৫৭টি ব্যাংকের প্রায় ৯ হাজার ২০০ শাখা রয়েছে। সব ব্যাংকের প্রধান অফিস ঢাকাকেন্দ্রিক। চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলেও একটি ব্যাংকের প্রধান শাখাও চট্টগ্রামে স্থাপিত হয়নি।

জুনিয়র চেম্বার চিটাগাংয়ের প্রেসিডেন্ট গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে বড় অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং যৌথ বিনিয়োগ দ্রুত অনুমোদনের জন্য ব্যাংকের প্রধান অফিস চট্টগ্রামে স্থাপন জরুরি। ঋণ অনুমোদন নিশ্চিত করা গেলে চট্টগ্রামে বিনিয়োগে অনেক বেশি আগ্রহী হয়ে উঠবেন উদ্যোক্তারা। ’

ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম চট্টগ্রামের প্রেসিডেন্ট এস এম আবু তৈয়ব বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামকে গুরুত্ব দিয়ে অনেক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছেন দেশের অর্থনীতির স্বার্থে। তাই দেশের স্বার্থেই এবং সর্বোচ্চ রাজস্ব আয়ের প্রয়োজনে চট্টগ্রামকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। আর চট্টগ্রাম থেকেই সব সেবা দ্রুত নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। ’


মন্তব্য