kalerkantho


গুজবের ফাঁদে বিনিয়োগকারী

রফিকুল ইসলাম   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



গুজবের ফাঁদে বিনিয়োগকারী

‘ক’ নামক কম্পানি নতুন প্লান্টে উৎপাদনে যাবে। বিগত বছরে ক্ষতিতে থাকলেও এবার ভালো মুনাফা করবে, শেয়ারপ্রতি আয় এবার (ইপিএস) বাড়বেই।

কম্পানির মালিকানা পরিবর্তন হচ্ছে, এতে পরিধি বাড়বে। কম্পানি সম্পর্কিত এমন গুজব কিংবা মিথ্যা তথ্য ভর করেছে পুঁজিবাজারে। কম্পানি সম্পর্কিত কোনো নতুন তথ্য ‘মূল্য সংবেদনশীল’ হিসেবে প্রকাশ করে কম্পানি। তবে কম্পানি ঘোষিত তথ্যে নির্ভর না করে অসমর্থিত সূত্রের গুজবে ঠকছে বিনিয়োগকারীরা। গুজব কিংবা অসমর্থিত তথ্যের সঠিকতা যাচাই না করেই ক্ষতির মুখে পড়ছে অনেকেই।

সম্প্রতি বিবিএস ক্যাবলস লিমিটেড, তুংহাই নিটিং ও সিঅ্যান্ডএ টেক্স লিমিটেড কম্পানি নিয়ে বাজারে গুজব ছড়ানো হয়। বিবিএস ক্যাবলস ইউনিট-২ লিমিটেড কম্পানি বিদেশি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে চুক্তি করে ১৮ আগস্ট। পৃথক কম্পানি হওয়া সত্ত্বেও বিবিএস ক্যাবলসের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে গুজব ছড়ানো হলে শেয়ার দাম আকাশচুম্বী হয়। তুংহাই নিটিং ও সিঅ্যান্ডএ টেক্সের মালিকানা পরিবর্তন হচ্ছে—এমন গুজবে বাড়ে শেয়ারের দাম।

যদিও আসলে কম্পানি দুটির মালিকানায় কোনো পরিবর্তন হয়নি। এ ছাড়া লোকসানে থাকা কম্পানির বিষয়ে গুজব ছড়িয়ে শেয়ার দাম প্রভাবিত করছে কারসাজি চক্র।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তালিকাভুক্ত কম্পানির আর্থিক সক্ষমতা বা হিসাব বিবরণী ও কম্পানির তথ্যে কান না দিয়ে গুজবের ফাঁদে পড়ছে বিনিয়োগকারীরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা ব্রোকারেজ হাউসে কারসাজি চক্রের কৌশলে ছড়ানো গুজবে পুঁজি হারাচ্ছে অনেকেই। কারসাজি চক্র নিজেরা আগে শেয়ার কিনে রেখে ক্ষতিতে থাকা, উৎপাদন বন্ধ কিংবা লভ্যাংশ দিতে না পারা কম্পানি বিষয়ে গুজব ছাড়িয়ে শেয়ার দাম বাড়াচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আগের দিন রাতেও কম্পানি সম্পর্কে গুজব ছড়ানো হচ্ছে।

পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকে নিরাপদ করতে বিনিয়োগ শিক্ষা কর্মসূচি চালু ও আইন-কানুনে পরিবর্তন এনেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিনা মূল্যে আর্থিক সাক্ষরতার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি জেনেশুনে বিনিয়োগ শিক্ষা দিচ্ছে। বিনিয়োগকারীর সুবিধার্থেই কম্পানির সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশে বাধ্যবাধকতা করা হয়েছে, যা অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সংবাদপত্রে প্রকাশ করতে হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের অফিসার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা ১৪৭ টাকা দরে বিবিএস ক্যাবলসের চার হাজার শেয়ার কেনেন। বাজার ভালো না বুঝলেও ব্রোকারেজ হাউসের তথ্যে তিনি এই শেয়ার কেনেন। শেয়ার কেনার পর এক কার্যদিবস দুই-তিন টাকা বাড়লেও পরদিন কমে যায় ১০ টাকারও বেশি। তবুও তিনি শেয়ার বিক্রি করেননি আরো বাড়তে পারে এই ভেবে। বর্তমানে ওই কর্মকর্তার শেয়ারপ্রতি লোকসান ২০ টাকারও বেশি।

কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘বিবিএস ক্যাবলস বাজারে আসার পর সবার মুখেই এই কম্পানির নাম শুনি। ব্রোকারেজ হাউসে কথা বলে শেয়ার কিনি। কম্পানিটি ভালো করবে—এমন আশা থেকেই শেয়ার কেনা, কিন্তু ফল উল্টো হয়েছে। শেয়ারপ্রতি লোকসান ২০ টাকারও বেশি। ক্ষতিতে শেয়ার বিক্রি করবেন কি না সেটা নিয়েও মনস্তাত্ত্বিক চাপে তিনি।

পুঁজিবাজারে সদ্য তালিকাভুক্ত বিবিএস ক্যাবলস লিমিটেডের লোগো ব্যবহার করে ১৮ আগস্ট বিদেশি বিনিয়োগকারীর সঙ্গে চুক্তি করে বিবিএস ক্যাবলস ইউনিট-২ লিমিটেড কম্পানি। কম্পানিটি ২২০ কেভি ভোল্টেজের তার উৎপাদন করছে ও মেশিনারিজ রপ্তানিতে চুক্তির বিষয়টি নজরে এলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে বিনিয়োগকারীরা। বিবিএস ক্যাবলস ইউনিট-২ পৃথক কম্পানি হলেও একই কম্পানির ভেবে বিবিএস ক্যাবলসের শেয়ার দাম আকাশচুম্বী হয়। ১০ টাকার শেয়ার দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ১৫ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। সঠিক তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর নিম্নমুখী হয়েছে কম্পানিটির শেয়ার দাম। ঊর্ধ্বমুখিতার সময় সর্বশেষ কেনা ব্যক্তির শেয়ার দাম কমে যাওয়ায় ক্ষতিতে পড়েছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। আর কারসাজি চক্র বেশি মুনাফা তুলে শেয়ার বিক্রি করে সটকে পড়েছে। অল্প সময়ে শেয়ার দাম বহু গুণ বৃদ্ধি পাওয়াকে অস্বাভাবিক মনে করে তদন্তে কমিটি গঠন করেছে বিএসইসি।

বিবিএস ক্যাবলসের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘চুক্তি হওয়া কম্পানিটি আমাদের পৃথক কম্পানি। বিবিএস ক্যাবলসের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। বিজ্ঞাপনের স্বার্থে বিবিএস ক্যাবলসের লোগো ব্যবহার করা হয়েছে। এখন এই তথ্য দেখে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কিনলে আমরা কী করতে পারি। কেবল লোগোটিই ব্যবহার করা হয়েছে। ’

বিএসইসি সূত্র বলছে, পুঁজিবাজারে ৩০ লাখ বিনিয়োগকারীর মধ্যে বেশির ভাগই ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, যথাযথ বিনিয়োগ শিক্ষায় শিক্ষিত নয়। কম্পানির আর্থিক বিবরণী ও তথ্যাদি সঠিকভাবে বিশ্লেষণে অক্ষম হওয়ায় গুজব, ধারণা ও আবেগের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করে। বড় বিনিয়োগকারীকে অনুসরণ করে বিনিয়োগ করে। এতে কারসাজির সম্ভাবনা বহু গুণে বাড়ে।

চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে সিঅ্যান্ডএ টেক্সের মালিকানা পরিবর্তন নিয়ে গুজব চাউর হয়। মালিকানা পরিবর্তনের ‘অসত্য’ তথ্যে শেয়ার কিনতে চাপ বেশি থাকায় অস্বাভাবিকভাবে শেয়ার দাম বৃদ্ধি পায়। এদিকে জানুয়ারি-মার্চ তৃতীয় প্রান্তিকে কম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় কমলেও ৪ জুলাই দাম বাড়ার বিষয়ে জানতে চায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ। জবাবে কম্পানি জানায়, দাম বাড়ার বিষয়ে অপ্রকাশিত কোনো সংবেদনশীল তথ্য নেই। এদিকে বস্ত্র খাতের তুংহাই নিটিং অ্যান্ড ডায়িং লিমিটেডের মালিকানা পরিবর্তন নিয়েও গুজব ছড়ায় বাজারে। ব্রোকারেজ হাউস থেকে বিনিয়োগকারী পর্যন্ত এই তথ্য ছড়িয়ে যায়। এতে বিনিয়োগকারী শেয়ার কেনা শুরু করে। তথ্য সঠিক না হলেও শেয়ার দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছে, কারসাজি চক্র কৌশলে গুজব ছড়িয়ে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করে। একটি কম্পানির মালিকানা বদল কিংবা ম্যানেজমেন্ট পরিবর্তনে শেয়ার দামে কোনো প্রভাব পড়ার কথা নয়, তবুও হুজুগেই শেয়ার দাম বাড়তে থাকে। বাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ বলেন, ‘আর্থিক হিসাব বিবরণীই একটি কম্পানির ভিত্তি। বছর শেষে শেয়ারপ্রতি আয় দেখেই শেয়ার কিনতে হবে। গুজব কিংবা অসমর্থিত তথ্যে প্রভাবিত হলে পুঁজি হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে। বিনিয়োগকারীর উচিত কম্পানির সক্ষমতা ও সঠিক তথ্য জেনেই কম্পানিতে বিনিয়োগ করা। তবে আমাদের বাজারে সব বিনিয়োগকারী আর্থিক হিসাব বিবরণী পর্যালোচনা না করেই গুজবে নির্ভর করে শেয়ার কেনে। ’

বিএসইসির এক কর্মকর্তা বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কমিশন বিনিয়োগকারীকে আর্থিক স্বাক্ষর করতে বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন বিনিয়োগকারী কম্পানির ফান্ডামেন্টালস বা কম্পানির আর্থিক বিষয়াদি বিশ্লেষণ ও জানতে পারে।

ডিএসইর পরিচালক রকিবুর রহমান বলেন, ‘বিনিয়োগকারীকে নিজেই পুঁজি টিকিয়ে রাখতে হবে। কোন কম্পানিতে বিনিয়োগ করলে মুনাফা আসবে কিংবা কম্পানির আর্থিক সক্ষমতা কেমন, সেটি দেখেই বিনিয়োগ করতে হবে। গুজব কিংবা মিথ্যা তথ্যে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা উচিত নয়। ’


মন্তব্য