kalerkantho


খাদ্যে বিষাক্ত দূষকের সর্বোচ্চ মাত্রা নির্ধারণ

শওকত আলী   

২০ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



খাদ্যে বিষাক্ত দূষকের সর্বোচ্চ মাত্রা নির্ধারণ

মানুষের কাছে বিষ হিসেবে পরিচিত নানা রাসায়নিক পদার্থ আজকাল খাদ্যপণ্যে ব্যবহার করা হয়।

পণ্যের পচন রোধে উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে এগুলোর ব্যবহার বাড়ছে।

তাই রাসায়নিক পদার্থের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের সর্বোচ্চ মাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি নিরাপদ খাদ্য আইনের একটি ধারার ওপর ভিত্তি করে দেশে নিয়মিত ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থগুলোর সর্বোচ্চ মাত্রা নির্ধারণ করে একটি প্রবিধানমালা জারি করা হলো। এর উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী ও ব্যবহারকারীরা যাতে করে খাদ্যদ্রব্যে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক প্রয়োগ না করে। যে সর্বোচ্চ মাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে এর বেশি পরিমাণ রাসায়নিক যদি খাদ্যদ্রব্যে পাওয়া যায় তাহলে সেটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং ব্যবহারকারীকে আনা হবে শাস্তির আওতায়। এই মানদণ্ডকে ব্যবহার করে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে।

জানা গেছে, এই প্রবিধানমালার নামকরণ করা হয়েছে নিরাপদ খাদ্য (রাসায়নিক দূষক, টক্সিন ও ক্ষতিকর অবশিষ্টাংশ) প্রবিধানমালা, ২০১৭। এতে ভৌত দূষকের উপস্থিতি কোন পর্যায়ে থাকতে পারে, খাদ্যদ্রব্যে ভারী ধাতু বা অন্য ধাতব পদার্থের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, নাইট্রেডের ব্যবহার, পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বনগুলোর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইল ও ডাইওক্সিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, রেডিওনিউক্লাইডের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, টক্সিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যদ্রব্যে ক্ষতিকর অবশিষ্টাংশের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যদ্রব্যে পশু বা মৎস্য রোগের ওষুধের ক্ষতিকর অবশিষ্টাংশের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং এসব ব্যবহারে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের বিষয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

ভারী ধাতুর মধ্যে রয়েছে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, কপার, সিসা, নিকেল, টিন, জিংকের মতো পদার্থ। আর্সেনিকের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ভোজ্য তেল ও চর্বি, পরিশোধিত জলপাই তেল, জলপাই তেল ভার্জিন, অশোধিত সবজি তেল, ভোজ্য সবজি তেলে সর্বোচ্চ ০.১০ পিপিএম হলো সহনীয় মাত্রা।

আবার লবণ, খাদ্য লবণে ০.৫০ পিপিএম ও প্রাকৃতিক খনিজ পানিতে ০.০১ পিপিএম আর্সেনিক থাকতে পারবে। পরিশোধিত চিনিতে ক্রোমিয়ামের সর্বোচ্চ মাত্রা থাকতে পারবে ০.০২ পিপিএম। যেকোনো প্রকার ফল ও ফলজাত দ্রব্যে কপারের সর্বোচ্চ মাত্রা হবে ৫ পিপিএম। হলুদ এবং গুঁড়া হলুদে সর্বোচ্চ ৫ পিপিএম পরিমাণ কপার উপস্থিতি হবে গ্রহণযোগ্য মাত্রা। এর চেয়ে বেশি মাত্রায় থাকলে সেটি হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এ ছাড়া শিশুখাদ্য ও শিশুদের দুধের বিকল্প খাদ্যে সর্বোচ্চ ১৫ পিপিএম কপার থাকতে পারবে তবে এটি কোনোভাবেই ২.৮ এর নিচে থাকতে পারবে না। কৌটা বা বোতলজাত ফলের রস যেমন কমলা, আঙুর, আপেল, টমেটো, আনারস এবং লেবুর রসে সর্বোচ্চ ৫ পিপিএম কপার থাকলে সেটাকে সহনীয় মাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কালো ও সবুজ চায়ে ১৫০ পিপিএম পর্যন্ত কপার থাকাটা নিরাপদ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারী ধাতু ব্যবহারের মধ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় সিসার উপস্থিতি নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পণ্যকে শাস্তির আওতায় আনা হয়ে থাকে। তবে কী পরিমাণ সিসার উপস্থিতি থাকলে তা সহনীয় তার কোনো মাত্রা এত দিন ছিল না। প্রবিধানমালায় বলা হয়েছে, দুধের মধ্যে সর্বোচ্চ ০.০২ পিপিএম, দুগ্ধজাত পণ্যেও ০.০২ পিপিএম, কৌটাজাত বিভিন্ন ফল যেমন আঙুর, ম্যান্ডারিন অরেঞ্জ, আম, আনারস, স্ট্রবেরি এবং কৌটাজাত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফলের সালাদে সর্বোচ্চ ১ পিপিএম পর্যন্ত এবং জাম ও জেলি, আমের আচারে একই মাত্রায় সিসার উপস্থিতি হবে গ্রহণযোগ্য। এ ছাড়া বোতলজাত বা কৌটাজাত বা প্যাকেট করা সবজি, গাজর, বরবটি, পরিপুষ্ট মটরশুঁটি, মাশরুম, মিষ্টি ভুট্টা এবং টমেটোতে ১ শতাংশ পর্যন্ত সিসা থাকতে পারবে।

আবার চাল, গম, বীজ, মাছ, মাংস, ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, মসলা, সবজি, সকল ভোজ্য তেল, পানীয় ও খাবার পানিসহ বেশ কিছু খাদ্যদ্রব্যে সর্বোচ্চ ৫০ পিপিএম পর্যন্ত তেজষ্ক্রিয়তাসম্পন্ন পদার্থ বা প্রাকৃতিক বা অন্য কোনোভাবে সমজাতীয় পদার্থের উপস্থিতি থাকতে পারবে। গুঁড়া দুধ বা দুগ্ধজাত পণ্য যেমন ঘন করা দুধ, পনির, ঘি, বাটার, সেরেলাক, ওভালটিন, মালটোভা, হরলিক্স, ফারলাকে এ ধরনের পদার্থের উপস্থিতি থাকতে পারবে ৯৫ পিপিএম পর্যন্ত।

এ বিষয়ে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য প্রফেসর ড. মো. ইকবাল রউফ মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, বিভিন্ন রাসায়নিক ও ভারী ধাতুর ব্যবহারে আমরা একটি নীতি নির্ধারণ করতে পেরেছি। বাংলাদেশের খাদ্যদ্রব্যের মান নিয়ে অনেক কথাই আছে। এখন এসব পদার্থের ব্যবহার নির্দিষ্ট করে দেওয়া হলো। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটা ল্যাবে পরীক্ষা করা হবে। কোনো খাদ্যদ্রব্যে এসব মাত্রার পদার্থ ব্যবহারে ব্যতিক্রম ঘটলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া উৎপাদক পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সচেতন করে তুলতেও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কাজ করছে বলে জানান তিনি।


মন্তব্য