kalerkantho


সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফ

উচ্চ সুদের সঞ্চয়পত্র আর্থিক খাত আধুনিকায়নে বড় বাধা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



উচ্চ সুদের সঞ্চয়পত্র আর্থিক খাত আধুনিকায়নে বড় বাধা

গতকাল সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফের এশিয়া-প্যাসিফিক বিভাগের প্রধান ব্রায়ান এইটকেন

বাৎজেট ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্রের মতো উচ্চমূল্যের বিনিয়োগের ওপর সরকারের নির্ভরতা দেশের  আর্থিক খাতের আধুনিকায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

ঘাটতি মেটাতে ব্যবহৃত এই হাতিয়ারটি (জাতীয় সঞ্চয়পত্র) সরকারের ট্রেজারি বন্ড বা অন্যান্য সিকিউরিটিজের বাজার উন্নয়নেও বাধার সৃষ্টি করছে বলে মনে করে সংস্থাটি। এর থেকে ভালো কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ এবং তুলনামূলক কম খরচের বিকল্প, যা আর্থিক বাজারকে ধ্বংস না করেও সামাজিক নীতি লক্ষ্য অর্জন করতে পারে, এমন বিনিয়োগ গ্রহণ করার বিষয়টি বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ।

গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফের এশিয়া-প্যাসিফিক বিভাগের প্রধান ব্রায়ান এইটকেন এ পরামর্শ দেন।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৮৯৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৭৪ শতাংশ বেশি। আর বাজেটে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেশি।

গত জানুয়ারিতেও রেকর্ড পরিমাণ বিনিয়োগ এসেছে সঞ্চয়পত্র থেকে। ওই মাসে সব মিলিয়ে পাঁচ হাজার ৪২০ কোটি ৫৯ লাখ টাকার নিট বিনিয়োগ এসেছে এ খাত থেকে। আগের মাস ডিসেম্বরে এই বিক্রির পরিমাণ ছিল তিন হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বেড়েছে দুই হাজার ২৬৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বা ৭২ শতাংশ।

আইএমএফ গঠনের সময় থেকে ‘আর্টিকেল ৪’-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সদস্য দেশগুলোর সামষ্টিক অর্থনীতি, সমপর্যায়ের দেশগুলোর অবস্থা ও বিশ্ব অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক নিয়ে মতামত ব্যক্ত করে সংস্থাটি। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ব্রায়ানের নেতৃত্বে আইএমএফের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে আসে। এই দলটি অর্থমন্ত্রী, অর্থসচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিআইডিএ) প্রধান নির্বাহী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এই সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরতেই গতকাল সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

ব্রায়ান এইটকেন বলেন, সঞ্চয়পত্র থেকে নির্ভরতা কমিয়ে এর পরিবর্তে বন্ড মার্কেট উন্নত করা যেতে পারে। বন্ড মার্কেট উন্নত হলে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ আসবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ব্রায়ান আরো বলেন, রাজস্ব আহরণে গতি সৃষ্টি, সরকারি বিনিয়োগ ও কাঙ্ক্ষিত আর্থিক প্রবৃদ্ধির জন্য করব্যবস্থায় ব্যাপক আধুনিকায়ন প্রয়োজন। আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকরে নিশ্চিতভাবেই রাজস্ব আহরণ বাড়বে। এর মাধ্যমে সরকার নানাবিধ উপকার নেওয়ার সুযোগ পাবে। এতে কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাবে। একই সঙ্গে কর প্রদানকারীর অভিযোগ কমে আসবে। আইএমএফের এই প্রতিনিধি মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতি এখনো রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে চলছে। বিগত কয়েক বছর ধরে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা অর্থনীতির স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রাখার জন্য পর্যাপ্ত।

ব্রায়ান বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের বড় চাহিদা রয়েছে। এখানকার অব্যবহৃত সঞ্চয় বিনিয়োগে আনতে মধ্যস্থতার ভূমিকা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সীমিত নীতিমালার মধ্যেও বিনিয়োগ চাঙ্গা করার সক্ষমতা রয়েছে। দেশটির পুঁজিবাজার উন্নত হলে বেসরকারি খাতে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ আসবে। যা বাড়তি অর্থনেতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারবে।

এক প্রশ্নের জবাবে ব্রায়ান বলেন, রাষ্ট্রীয় খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি। কোনো কোনো বেসরকারি ব্যাংকেও এই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারকে উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেন বেরিয়ে যাওয়া এবং ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য কোনো অশনি সংকেত আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির বেশির ভাগ এই দুই অঞ্চলে হয়। ব্রেক্সিটের পর এই অঞ্চলে অনেক দেশের রপ্তানি কমে গেছে। এখন বাংলাদেশকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। রপ্তানির বহুমুখীকরণ ও নতুন বাজার সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। তবে খুব বেশি প্রভাব পড়বে বলে এখনো মনে হচ্ছে না। ’

ব্রায়ান বলেন, ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার বিনিময়মূল্য অনেক দিন ধরেই স্থিতিশীল রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও পর্যাপ্ত। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক ইতিবাচক রয়েছে। তবে মূলধন হিসাব উন্মুক্তকরণে আরো ভেবে এগোতে হবে। এ ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো কোন ভূমিকায় আছে সেটাও দেখতে হবে। তা ছাড়া এখানকার অর্থনীতিতে বাইরের আর্থিক প্রতিঘাত সহনশীলতা কতুটুকু সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে।

চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উেসর ঋণের জন্য ব্যাংকব্যবস্থার ওপর সরকারের কোনো চাপ দিতে হচ্ছে না। বরং সরকার আগের ঋণ পরিশোধ করছে। ব্যাংকবহির্ভূত উৎস অর্থাৎ সঞ্চয়পত্র থেকে বেশি ঋণ আসায় এমনটা ঘটছে। এতে সরকারের বাজেট ঘাটতি পূরণের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। কেননা বর্তমানে ব্যাংকের আমানতের সুদের হারের চেয়ে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার অনেক বেশি, প্রায় দ্বিগুণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক আমানতের গড় সুদহার বর্তমানে ৫.১৩ শতাংশ। যেখানে সঞ্চয়পত্রের সুদহার গড়ে ১১ শতাংশের ওপরে রয়েছে।


মন্তব্য