kalerkantho


জামানত ছাড়া ঋণ ২৫ লাখ টাকা থেকে বাড়ানোর দাবি

ঋণ পেলে বৃহৎ শিল্পেও সাফল্য দেখাবে নারী উদ্যোক্তারা

শেখ শাফায়াত হোসেন   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ঋণ পেলে বৃহৎ শিল্পেও সাফল্য দেখাবে নারী উদ্যোক্তারা

বাংলাদেশ মহিলা সমিতিতে আয়োজিত মেলায় পণ্য দেখাচ্ছেন এক উদ্যোক্তা। ছবি : কালের কণ্ঠ

নািরী উদ্যোক্তারা ঋণ নিয়ে ব্যবসা বড় করছেন। ব্যাংকগুলোরও নারীদের ওপর বিশ্বাস বাড়ছে।

কেননা নারীরা ঋণ নিয়ে সময়মতো ফেরত দিচ্ছে। এখন তাদের আরো ‘বড় অঙ্কের ঋণ’ দেওয়ার সময় এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁরা বলছেন, ব্যবসার পরিধি বাড়িয়ে নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষুদ্র শিল্প থেকে মাঝারি শিল্পে এবং মাঝারি শিল্প থেকে বৃহৎ শিল্পের দিকে নিয়ে যেতে হবে। যত দ্রুত এটা সম্ভব হবে নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার সুফল ত্বরান্বিত হবে।

নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য প্রদর্শনের জন্য বিভিন্ন সময় মেলার আয়োজন হয়। কিন্তু এসব পণ্য বেশি করে তৈরি করতে গেলে যে পরিমাণ পুঁজির দরকার হয় তা নারী উদ্যোক্তাদের থাকে না। কেউ কেউ সাহস করে ব্যাংকের দ্বারস্থ হন ঋণের জন্য। কিন্তু প্রকৃত চিত্র হলো শিক্ষিত ও প্রশিক্ষত নারী উদ্যোক্তা ছাড়া ঋণ পাওয়াটা এতটা সহজ হয় না।

এমনই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরলেন ঢাকার মিরপুরের ‘চন্দ্রবিন্দু’ নামের একটি বুটিক ফ্যাশন হাউসের উদ্যোক্তা মিরানা জাফরিন চৌধুরী।

স্নাতকোত্তর পাস করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে ২০০৬ সালে ওই ফ্যাশন হাউস দাঁড় করান তিনি। এর এক বছরের মাথায় আরো বড় পরিসরে ব্যবসার পরিকল্পনা নিয়ে ব্যাংকে যান ঋণের জন্য। নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী ঋণের জন্য আবেদন করেন কয়েকটি ব্যাংকে।

মিরানা জাফরিন বলেন, ‘প্রথমে কোনো ব্যাংকই আমাকে ঋণ দিতে চায়নি। নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর তারা আস্থা রাখতে পারছিল না। আমি যদি লোকসানে পড়ে যাই তবে ব্যাংকের টাকা আদায় হবে না। এমন অনেক কথা তারা বলত। একপর্যায়ে বাংলাদেশ ওমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (বিডাব্লিউসিসিআই) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতায় একটি ব্যাংক আমাকে ঋণ দিতে রাজি হয়। প্রথম ১৫ লাখ টাকা আমাকে ঋণ দিয়েছিল। সেটা পরিশোধ করে আমি আবার নতুন করে সম্প্রতি ২৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছি। তবে এবার আমাকে তৃতীয় পক্ষের গ্যারান্টার জোগাড় করতে হয়। ব্যাংক আমার ওপর বিশ্বাস করে আমার স্বামীকেই গ্যারান্টার করেছে। ’

বিভিন্ন সভা-সেমিনারে নারী উদ্যোক্তাদের বেশি করে ঋণ দেওয়ার কথা বলা হলেও এখনো পর্যন্ত নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রাপ্তির হার পুরুষ উদ্যোক্তার তুলনায় অত্যান্ত নগণ্য। ২০১৬ সালে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিতরণকৃত ঋণের মাত্র ৩.৭৭ শতাংশ পেয়েছেন নারী উদ্যোক্তারা। গত বছরে নারী উদ্যোক্তাদের ৪১ হাজার ৬৭৫টি প্রতিষ্ঠান ঋণ পেয়েছে। ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ৩৪৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। ওই বছর এসএমই খাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা।

সম্প্রতি রাজধানীর বেইলি রোডে বাংলাদেশ মহিলা সমিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে শুরু হয়েছে ছয় দিনব্যাপী নারী উদ্যোক্তাদের প্রস্তুতকৃত পণ্যের প্রদর্শনী। গত সোমবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ২১ নারী উদ্যোক্তাকে মোট সাড়ে ৭ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে ২১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক। একজন নারী উদ্যোক্তা কোনো ধরনের জামানত ছাড়াই ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা ঋণ নিতে পারেন। ‘চন্দ্রবিন্দু’ স্বত্বাধিকারী মিনারা জাফরিন বলেন, ‘নারী উদ্যোক্তাদেরই বেশির ভাগই ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের মধ্যে পড়ে। তাদের পুঁজি কম। লাভজনক ব্যবসা পরিকল্পনা নিয়ে অনেকেই এখন ক্ষুদ্র থেকে মাঝারি শিল্পের দিকে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলোকে এদের পাশে দাঁড়াতে হবে। ’

গত সোমবার প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, ‘ব্যবসাকে এত দিন শুধু পুরুষের কাজ মনে করা হতো, যা ইতিমধ্যেই নারী উদ্যোক্তারা ভুল প্রমাণ করেছেন। অনেক পুরুষ উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত দেন না, কিন্তু নারীদের এমন দুর্নাম নেই। নারী উদ্যোক্তাদের তাই এখন বড় আকারের ঋণ দেওয়া উচিত। ’

একই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে ব্যাংকের দায়িত্ব রয়েছে। যেসব নারী শিক্ষিত ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তাদের জামানত ছাড়াই ঋণ দেওয়া দরকার। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে ব্যাংক জামানত হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।

নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিডাব্লিউসিসিআইর সভাপতি সেলিমা আহমাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্যাংকগুলো এখন নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা আগ্রহী হয়েছে। তবে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য এ খাতে উদ্যোক্তাদের আরো সহজ শর্তে আরো বেশি পরিমাণে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।

জামানত ছাড়া ঋণের পরিমাণ ২৫ লাখ টাকা থেকে বাড়ানোর জন্যও আমরা বিভিন্ন সময়ে দাবি জানিয়ে এসেছি। ’


মন্তব্য