kalerkantho


১৪ মে এফবিসিসিআই নির্বাচন

সরাসরি ভোটে নেতৃত্ব চান ভোটাররা

এম সায়েম টিপু   

৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সরাসরি ভোটে নেতৃত্ব চান ভোটাররা

দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) নির্বাচন জমে উঠেছে। সরকারের আনুকূল্য পেতে ইতিমধ্যেই প্রার্থীরা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন।

তবে বরাবরের মতো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার সভাপতি চাচ্ছেন না ভোটাররা। সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে আগামী নেতৃত্ব বাছাই করতে চান তাঁরা, যাতে সব সময় সরকারের তল্পিবাহকের ভূমিকায় না থেকে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে নতুন নেতৃত্ব।

আগামী ১৪ মে নির্বাচনকে সামনে রেখে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এফবিসিসিআইয়ের বর্তমান প্রথম সহসভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন ও সংগঠনটির সাবেক প্রথম সহসভাপতি মো. জসিম উদ্দিন। তাঁদের মধ্যে মহিউদ্দিন পোশাক মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ছিলেন। আর জসিম উদ্দিন বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। আসছে নির্বাচনে জয়ী সভাপতি ও পর্ষদ সদস্যরা আগামী ২০১৭-১৮ এবং ২০১৮-১৯ মেয়াদে দুই বছর দায়িত্ব পালন করবেন।

সাধারণ ব্যবসায়ীরা জানায়, নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে ইতিমধ্যে মাঠে নেমে পড়েছেন সফিউল ইসলাম ও জসিম উদ্দিন। ইতিমধ্যে তাঁরা বিভিন্ন স্বপক্ষীয়দের নিয়ে বৈঠক করছেন।

সাধারণ ব্যবসায়ীদের দাবি, এফবিসিআইয়ের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ তাদের স্বার্থরক্ষা করতে পারেনি।

ভ্যাট আইনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে তারা। গত এক-দেড় বছরে ব্যাংকঋণের সুদের হার কমলেও তাতে এফবিসিসিআইয়ের তেমন কোনো ভূমিকা দেখছে না তারা। চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার দিনই ভ্যাট আইন সম্পর্কে কোনো রকম ধারণা ছাড়াই এফবিসিসিআই বাজেটের প্রশংসা করে বক্তব্য ও বিবৃতি দিয়েছে। বাজেটের পরে আবার ভ্যাট আইন নিয়ে ব্যবসায়ী ঐক্য ফোরামের ব্যানারে সমাবেশ করেছে। ব্যবসায়ীরা আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে কার্যকর এফবিসিসিআই গড়ে তুলতে চান, যাতে নতুন নেতৃত্ব সাধারণ ব্যবসায়ীদের শক্ত অবস্থান নিতে পারে। নতুন নেতৃত্ব এফবিসিসিআইকে একটি শক্তিশালী গবেষণাকেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পূর্বাভাস ও দেশীয় বাণিজ্যনীতি নির্ধারণে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে।

এফবিসিআিইয়ের বর্তমান পর্ষদের সদস্য নাজ ফারহানা আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের এ শীর্ষ সংগঠন তার পুরনো ঐতিহ্য হারিয়েছে। বড় বড় নেতা হয়ে গদি দখল করলেও সাধারণ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণে তাঁরা তেমন কোনো কাজ করেন না। পাঁচতারা হোটেলগুলোতে বড় আয়োজন করে, সরকারের সমর্থন নিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চান। ফলে কোটারি স্বার্থ সংরক্ষণ এবং এফবিসিসিআইকে ব্যক্তিগত অফিসে পরিণত করে ফেলেন তাঁরা। আগামী নির্বাচনে টাকার ব্যবহার বন্ধ করে সাধারণ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে—এমন বলিষ্ঠ নেতৃত্ব চাই আমরা। ’

আরেক পরিচালক মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘এফবিবিসিআই প্রকৃতপক্ষে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। নির্বাচনে জিতেও ব্যবসায়ীদের স্বার্থে পরিচালকরা কোনো ভূমিকা রাখতে পারছেন না। যিনি সভাপতি নির্বাচিত হন, তিনি সব কিছুই তাঁর ইচ্ছামতো করেন। ফলে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা হয় না। বর্তমান পর্ষদও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। ’ তিনি আরো বলেন, পরিচালনা বোর্ডে অর্ধেক পরিচালক সরাসরি কোনো নির্বাচন ছাড়া প্রতিনিধিত্ব করায় স্বেচ্ছাচারিতার প্রভাব পড়ে।

পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আবু মোতালেব কালের কণ্ঠকে বলেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভ্যাট সমস্যা সমাধানে পুরো ব্যর্থ হয়েছে বর্তমান বোর্ড। এ জন্য বর্তমান কমিটির শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের জীবনমান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতেও ব্যর্থ হয়েছে তারা। তিনি বলেন, ‘এফবিসিসিআইয়ের ব্যর্থতার কারণেই ভ্যাট আইন নিয়ে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছে ব্যবসায়ীরা। এখনো এই ভ্যাট আইন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে ব্যবসায়ীরা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের অপতত্পরতায় আমরা অস্থির হয়ে পড়ছি। ’

এফবিসিসিআইয়ের বিরুদ্ধে সাধারণ ব্যবসায়ীদের ব্যর্থতার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে আগামী নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রার্থিতা ঘোষণাকারী সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এফবিসিসিআই ব্যবসায়ীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক কাজ করে। অনেক সময় কাজ করার পরও প্রত্যাশিত ফল পেতে অপেক্ষা করতে হয়। তেমনই একটি কাজ ভ্যাট আইন। সরকারকে এফবিসিসিআই মতামত দিয়েছে। এনবিআরও এসব মতামতে একমত হয়েছে। তবে এখনো সুফল পাওয়া যায়নি। ট্রেড লাইসেন্সের ফি বাড়ানোর কারণে ব্যবসায়ীদের যে সমস্যা হচ্ছিল, তা কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে আনা সম্ভব হয়েছে। ’

এফবিসিসিইয়ের সভাপতি হলে ব্যবসায়ীদের স্বার্থে তাঁর কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সভাপতি হলে আমার কাজ হবে এফবিসিসিআইকে আন্তর্জাতিক মানের সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলা। ’ তিনি আরো বলেন, ‘একজন সাংগঠনিক হিসেবে আমার দায়িত্ব হবে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া। এ ছাড়া এফবিসিসিআইতে গবেষণাকেন্দ্রকে যুগোপযোগী করা, ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নে কৌশল নির্ধারণ ও উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। ’

আরেক সভাপতি প্রার্থী জসিম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে জানান, দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক খাতের উত্থানসহ সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে এফবিসিসিআইয়ের বড় অবদান আছে। তবে গত কয়েক বছরে বিশ্ব অর্থনীতি ও বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য যেভাবে এগিয়েছে, সে তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে সংগঠনটি। এটি হয়েছে এফবিসিসিআইয়ের দুর্বল নেতৃত্বের কারণে। আর সংগঠনটির নির্বাচন পদ্ধতির ত্রুটির কারণেই এটি হচ্ছে। তিনি জানান, দেশের অর্থনীতিকে বিকশিত করার ক্ষেত্রে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক অনেক নেতারই বড় অবদান রয়েছে। তাঁদের উদ্যোগের ওপর ভর করেই বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হচ্ছে। তাঁদের নেওয়া নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে কাজ করবেন তিনি।

সভাপতি নির্বাচিত হলে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাদের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেবেন জানিয়ে জসিম বলেন, তাদের সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় সামর্থ্য সংগঠনটির নেই। এফবিসিসিআইকে আরো যুগোপযোগী করে বিশ্বমানে নিয়ে যাওয়া হবে, যাতে উপযুক্ত গবেষণা সেল স্থাপন ও জ্ঞানভিত্তিক, তথ্যসমৃদ্ধ সংগঠনে পরিণত হয় এটি।

গত  ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে সংগঠনটি। গত ২৯ জুন এফবিসিসিআই বোর্ড সভায় নির্বাচন বোর্ড ও আপিল বোর্ড গঠন করা হয়। নির্বাচন বোর্ডের প্রধান করা হয় সংসদ সদস্য প্রফেসর আলী আশরাফকে। আর নির্বাচন আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয় বিটিএমএর সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর আলামিনকে।

এফবিসিসিআই বাংলাদেশের এলাকাভিত্তিক চেম্বার ও পণ্যভিত্তিক অ্যাসোসিয়েশনগুলোর ফেডারেশন। এবারের নির্বাচনে ৬০ জন পরিচালক নির্বাচিত হবেন। এর মধ্যে চেম্বার থেকে ৩০ এবং অ্যাসোসিয়েশন থেকে ৩০ জন। তাঁদের মধ্যে ১২ চেম্বার এবং ১২টি অ্যাসোসিয়েশন থেকে ২৪ জন পরিচালক সরকার কর্তৃক সরাসরি মনোনীত করে থাকে। অর্থাৎ বাকি ৩৬টি পদে নির্বাচন হবে। নির্বাচিত ও মনোনীত ৬০ পরিচালক ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সভাপতি ও দুজন সহসভাপতি নির্বাচিত করেন। এবারের নির্বাচনে সভাপতি হবেন অ্যাসোসিয়েশন থেকে। প্রথম সহসভাপতি হবেন চেম্বার ও সহসভাপতি হবেন অ্যাসোসিয়েশন থেকে।


মন্তব্য