kalerkantho


হিলিতে পাথর আমদানি বেড়ে দ্বিগুণ

পণ্যজটের মাসুল গুনছে অন্য ব্যবসায়ীরা

স্বপন চৌধুরী, হিলি স্থলবন্দর ঘুরে   

৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



পণ্যজটের মাসুল গুনছে অন্য ব্যবসায়ীরা

ভারত থেকে রেকর্ড পরিমাণ পাথর আমদানি হচ্ছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম হিলি স্থলবন্দর দিয়ে। দিন দিন বাড়ছে এই পাথর আমদানি। প্রতিদিন দেড় কোটি থেকে দুই কোটি টাকার পাথর বিক্রি হচ্ছে হিলি স্থলবন্দরে। দেশের নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুসহ অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজে পাথরের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আমদানি বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এতে বেড়েছে রাজস্বের পরিমাণও। তবে বন্দর দিয়ে পাথরের আমদানি বেড়ে যাওয়ায় পণ্যজটসহ নানাবিধ কারণে বিপাকে পড়েছে অন্য পণ্যের আমদানিকারকরা।

হিলি স্থলবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পানামা হিলি পোর্ট লিংক লিমিটেড সূত্রে জানা যায়, ইতিপূর্বে বন্দর দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০টি ট্রাকে পাথর আমদানি হতো। বর্তমানে বন্দর দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ৮০ থেকে ৯০টি ট্রাকে পাথর আমদানি হচ্ছে। চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুলাই মাসে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে এক হাজার ১৩০টি ট্রাকে ৫১ হাজার ১০৫ মেট্রিক টন পাথর আমদানি হয়েছিল। আগস্ট মাসে আমদানি হয় এক হাজার ৭২৯টি  ট্রাকে ৭৮ হাজার ৫৫৫ মেট্রিক টন। সেপ্টেম্বরে এক হাজার ১১টি ট্রাকে ৪৫ হাজার ৬৫৫ মেট্রিক টন পাথর আমদানি হয়েছিল।

অক্টোবর মাসে তা কমে এসেছে ৭৮৭টি ট্রাকে ৩০ হাজার ৩৮৩ মেট্রিক টন। নভেম্বর মাসে আবার বেড়ে দুই হাজার ১৫৮টি ট্রাকে পাথর আমদানি হয়। পাথরের পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ৭৪৬ মেট্রিক টন। ডিসেম্বর মাসে আমদানি হয়েছিল দুই হাজার ২৫৪টি ট্রাকে ৯৮ হাজার ৯১১ মেট্রিক টন পাথর। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দুই হাজার ১১টি ট্রাকে ৮৮ হাজার ৭৪০ মেট্রিক টন পাথর আমদানি হয়। এভাবে চলতি অর্থবছরের গত সাত মাসে ভারত থেকে ১১ হাজার ৮০টি ট্রাকে চার লাখ ৮৭ হাজার ৫৫০ মেট্রিক টন পাথর আমদানি হয় হিলি স্থলবন্দর দিয়ে। আমদানীকৃত পাথরের মধ্যে রয়েছে বোল্ডার, পাকুর ও চিপস জাতের পাথর।

সরেজমিন হিলি স্থলবন্দর ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে এই বন্দর দিয়ে ভারত থেকে এত বেশি পাথর আমদানি হচ্ছে যে অন্যান্য আমদানীকৃত পণ্য রাখারই জায়গা মিলছে না। যেন পাথরের বন্দরে পরিণত হয়েছে হিলি স্থলবন্দর। বন্দরের ওয়্যারহাউসের এক-তৃতীয়াংশ জায়গাজুড়েই রয়েছে শুধু পাথর আর পাথর।

পাথর আমদানিকারক ফেরদৌস রহমান ও মেহেদুল ইসলাম জানান, দেশে নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুসহ অন্যান্য উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে পাথরের চাহিদা বেড়েছে। ফলে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে দেশে বেশি পরিমাণ পাথর আমদানি করছে আমদানিকারকরা। তাই পাথরে ভরে গেছে বন্দরের ভেতরের পানামা ওয়্যারহাউসের পুরো মাঠ।

হিলি স্থলবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট রাশেদুল হক বলেন, ‘বর্তমানে বন্দর দিয়ে যেভাবে পাথর আমদানি হচ্ছে আর আমদানীকৃত এসব পাথর বন্দরের ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হচ্ছে, তাতে অন্যান্য পণ্য আমদানি করে বিপাকে পড়ছে আমদানিকারকরা। ’ এ সমস্যা নিরসনে বন্দর দিয়ে আমদানীকৃত পাথরবাহী ট্রাকগুলোকে একটি নির্দিষ্ট জায়গা নির্ধারণ করে দেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। যেখানে ট্রাক দাঁড়ানো থেকে শুরু করে পাথর ওঠানো-নামানোর ব্যবস্থা করবে তারা। সেই সঙ্গে বন্দর দিয়ে পেঁয়াজ, চাল, রসুন, আদা, ভুসি, গম, ভুট্টা, খৈল জাতীয় পণ্যের জন্য আলাদা একটি ফাঁকা জায়গা নির্ধারণ করে শুধু ওই সব স্থানে এসব মালামাল ওঠানো-নামানোর ব্যবস্থা করা হলে বন্দর দিয়ে কোনো পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি হবে না।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পাকুর, চিপস ও বোল্ডার জাতের পাথর আমদানি হচ্ছে ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্য থেকে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতারা এসে দেখেশুনে নির্মাণকাজের জন্য এসব পাথর কিনে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন এই বন্দরে প্রায় দেড় কোটি থেকে দুই কোটি টাকার পাথর বিক্রি হচ্ছে।

হিলি স্থলবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পানামা হিলি পোর্ট লিংক লিমিটেডের জনসংযোগ কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন মল্লিক জানান, বন্দরের জন্য অধিগ্রহণকৃত নতুন জমিতে বালু ভরাটসহ বাউন্ডারি দেয়াল নির্মাণের কাজ চলছে। এটি সম্পন্ন হলে বন্দরের জায়গা স্বল্পতা কমতে পারে।

হিলি স্থল শুল্ক স্টেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা (সাবেক কাস্টমস সুপার) আবদুল মোতালেব জানান, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে চার লাখ ৮৭ হাজার ৫৫০ মেট্রিক টন পাথর আমদানি হয়েছে। আর আমদানীকৃত এসব পাথর থেকে সরকারের রাজস্ব এসেছে ৩৩ কোটি ২৯ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪৪ টাকা। তিনি বলেন, পাথরের আমদানি এভাবে অব্যাহত থাকলে হিলি স্থলবন্দর থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি রাজস্ব আসবে।

এই রাজস্ব কর্মকর্তা আরো বলেন, এই স্থলবন্দর দিয়ে পাথর আমদানি বেশি হওয়ায় স্বাভাবিক কাজকর্মের কিছুটা ব্যাঘাত ঘটছে। বিশেষ করে এই বন্দরে অবকাঠামোগত তেমন সুবিধা না থাকায় যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে এবং আমদানীকৃত অন্য পণ্য যেমন পেঁয়াজ, চাল, রসুন, আদা, ভুসি, গম, ভুট্টা, খৈল জাতীয় পণ্যের ট্রাক লোড-আনলোডে বিঘ্ন ঘটছে। আমদানিকারকরাও কিছুটা সমস্যায় পড়েছে। তবে বন্দর সম্প্রসারণের কাজ চলছে। আগামী তিন-চার মাসের মধ্যে হয়তো এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।


মন্তব্য