kalerkantho


এসএমই ঋণ বাড়লেও নারীর অংশগ্রহণ কমছে

শেখ শাফায়াত হোসেন   

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



এসএমই ঋণ বাড়লেও নারীর অংশগ্রহণ কমছে

২০১৬ সালে সামগ্রিকভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) ঋণ বিতরণ বাড়লেও ঋণপ্রাপ্ত নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা ৭৭.৮৬ শতাংশ কমে ৪১ হাজার ৬৭৫ জনে নেমেছে। অথচ ২০১৫ সালে মোট নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা ছিল এক লাখ ৮৮ হাজার ২৩৩ জন। ইসলামী ব্যাংক পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের (আরডিএস) আওতায় বিতরণকৃত নারী উদ্যোক্তাদের ঋণের অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে বাদ পড়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, ২০১৫ সালের জানুয়ারি-মার্চ ও এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে আরডিএসের আওতায় বিতরণকৃত ঋণ সিএমএসএমই খাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যা কটেজ খাতের শিল্প উপখাতে ও নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছিল। কিন্তু এ স্কিমের আওতায় প্রাপ্ত ঋণগ্রহীতাদের সবার ট্রেড লাইসেন্স না থাকার কারণে (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৫) ত্রৈমাসিক হতে এ ধরনের প্রতিবেদন বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং আগের হিসাবের সমন্বয় করা হয়। ফলে ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে ঋণ প্রাপ্ত মোট উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা ও শিল্প খাতে মোট উদ্যোক্তার সংখ্যা কমেছে।

গত বছরে (২০১৬ সালে) এসএমই খাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ ৪১ হাজার ৯৩৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, যা ২০১৫ সালের বিতরণ করা ঋণের তুলনায় ২৬ হাজার ৬৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা বা ২২.৪৯ শতাংশ বেশি। ২০১৬ সালের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বিতরণের হার ১২৫.০৫ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রগ্রামস বিভাগের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

মোট বিতরণকৃত ঋণের মাত্র ৩.৭৭ শতাংশ পেয়েছেন নারী উদ্যোক্তারা। গত বছরে নারী উদ্যোক্তাদের ৪১ হাজার ৬৭৫টি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ পাঁচ হাজার ৩৪৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

টাকার অঙ্কে নারী উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিতরণকৃত ঋণের হার পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ২৬.৪৬ শতাংশ বেশি। তবে প্রাপ্ত ঋণ মোট বিতরণকৃত ঋণের মাত্র ৩.৭৭ শতাংশ, যা হতাশাজনক।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, বিনিয়োগ মন্দার মধ্যেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ঋণ বিতরণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। ফলে এ খাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে। তবে এসএমই খাতের নামে ঋণ নিয়ে যেন অন্য খাতে ব্যবহার না হয়, সে জন্য তদারকব্যবস্থাও জোরদার করার পরামর্শ দেন তাঁরা।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৬ সালের (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) সময়ে মোট এক লাখ ৪৬ হাজারের বেশি নতুন উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব উদ্যোক্তার মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ বিতরণ করেছে দুই হাজার ৯৮১ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১৩ হাজার ৭৪২ জন নতুন নারী উদ্যোক্তা এক হাজার ৯২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ঋণ পেয়েছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য (এনবিএফআই) ২০১৬ সালে এসএমই খাতে এক লাখ ১৩ হাজার ৫০৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকার ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। বছর শেষে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। ২০১৫ সালে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০.৭৯ শতাংশ বেশি ঋণ বিতরণ হয়েছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৬ সালে সেবা খাতে ১৬ হাজার ২১৯ কোটি ১৯ লাখ টাকার ঋণ বিতরণ হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে বিতরণ হয়েছিল ১১ হাজার ৮৫৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এতে এক বছরে সেবা খাতে ঋণ বেড়েছে চার হাজার ৩৬২ কোটি বা ৩৬.৭৯ শতাংশ। আর ব্যবসা খাতে ৯০ হাজার ৫৪৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকার ঋণ বিতরণ হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭৩ হাজার ৫৫১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। সে হিসেবে ব্যবসা খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৩.১১ শতাংশ। প্রতিবেদনে আরো দেখা যায়, শিল্প খাতে ৩৫ হাজার ১৬৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩০ হাজার ৪৬২ কোটি ০২ লাখ টাকা। সুতরাং শিল্প খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫.৪৫ শতাংশ।

এ সময় সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ হয়েছে সেবা খাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রগ্রামস বিভাগের মহাব্যবস্থাপক স্বপন কুমার রায় বলেন, ‘দেশে চলমান বিনিয়োগ মন্দার মধ্যেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ঋণ বিতরণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। ’ ফলে এ খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়ছে। বিতরণের এ গতি অব্যাহত থাকলে চলতি বছরেও বেশি ঋণ বিতরণ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। অন্যান্য বছর ঋণের বড় অংশ ব্যবসা খাতে গেলেও এবার সেবা খাতে সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সব সময়ই উতপাদনশীল খাতে ঋণ বিতরণ বাড়াতে জোরালো মনিটর করে আসছে। এসএমই খাতে উচ্চ সুদ প্রদান সম্পর্কে তিনি বলেন, নারী উদ্যোক্তারা ১০ শতাংশে ঋণ পাচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনরর্থায়ন কর্মসূচির বেশির ভাগই ১০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণের ঋণ বিতরণ করছে, যদিও তার সুদের হার আগের তুলনায় কমে এসেছে।


মন্তব্য