kalerkantho


এডিপি বাস্তবায়নে সমস্যা

জানা কারণের সমাধান বহুদূর

আরিফুর রহমান   

২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



জানা কারণের সমাধান বহুদূর

সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের সমস্যাগুলো যুগ যুগ ধরেই জানেন মন্ত্রী, আমলা ও সংশ্লিষ্টরা। বারবার সেসব সমস্যা সমাধানের কথা তাঁরা আওড়ান বাজেট বক্তৃতায়, সভা-সেমিনারে।

কিন্তু সমস্যা দূর করার সমাধানের পথে হাঁটেন না তাঁরা। সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগও (আইএমইডি) প্রতিবছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড (এডিপি) বাস্তবায়নের সমস্যাগুলো প্রতিবেদন আকারে তুলে ধরে সমাধানের উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তাদের কাছে পাঠায়। সেসব সুপারিশ প্রতিবেদন আকারে ছাপানো বইয়ের মলাটের ভেতরেই আটকে থাকে, সমাধানের পথ আর বের হয় না। ফলে আগের বছরগুলোর মতো চলতি অর্থবছরেও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল উন্নয়নে ব্যতিক্রমী যেসব উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সাত মাস পেরিয়ে গেলেও তার ছিটেফোঁটা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

বিগত বছরের ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে এডিপি বাস্তবায়নে ১৮টি সমস্যার কথা প্রতিবেদন আকারে তুলে ধরেন আইএমইডির পরিচালক হাবিবুল ইসলাম। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, এডিপি বাস্তবায়নে অন্যতম প্রধান সমস্যা—কোনো ধরনের সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প নেওয়া। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে জটিলতায় পড়তে হয়। এ কারণে দফায় দফায় প্রকল্প সংশোধন করতে হয়। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এডিপি বাস্তবায়নে জমি অধিগ্রহণ আরেকটি সমস্যা।

এ ছাড়া প্রকল্পের বিপরীতে অপ্রতুল বরাদ্দ, ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক বদলি, অনভিজ্ঞ পিডি নিয়োগ, তদারকির অভাব, বছরভিত্তিক অডিট নিষ্পত্তি না হওয়ার কথা তুলে ধরেন। অথচ যে সমস্যাগুলোর কথা তিনি তুলে ধরেছেন, সেগুলো আগের বছরগুলোতেও উল্লেখ ছিল।

তাহলে জানা কারণ কেন সমাধান হয় না—এমন প্রশ্নে সাবেক সচিব ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড একটা বৃত্তের মধ্যে ঢুকে গেছে। এখান থেকে বের হওয়া কঠিন। এসব সমস্যার সঙ্গে পুরোপুরি রাজনীতি জড়িত। তাই রাজনীতিবিদরা যত দিন ঠিক না হবেন তত দিন এসব সমস্যার সমাধান হবে না। পিডি নিয়োগ হয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে। যাঁরা পিডি হন তাঁরা সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন তদবিরে। আবার কেউ যদি ভালো কাজ করেন, তাঁর কোনো পুরস্কার নেই। বরং তাঁকে বেশি দিন রাখা হয় না। আইএমইডিরও আছে দুর্বলতা।

এডিপি বাস্তবায়নে গতি আনতে দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল উল্লিখিত সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মন্ত্রীর ঘোষণা ছিল, প্রকল্প পরিচালকদের (পিডি) প্রকল্প এলাকায় থাকতে হবে। প্রকল্প এলাকায় না থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পদ্মা সেতু, মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী নদীর নিচে টানেল নির্মাণসহ বড় বড় প্রকল্পের পিডিরা ঢাকায় অবস্থান করছেন। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বাভাবিক গতি আসে না।  

সরকারের তরফ থেকে ঘোষণা ছিল, বড় প্রকল্পে একজন পূর্ণকালীন পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হবে। একজনকে একের অধিক প্রকল্পে পিডি নিয়োগ দেওয়া হবে না। তিন বছরের আগে কোনো পিডিকে তাঁর কর্মস্থল থেকে বদলি করা যাবে না। পিডি নিয়োগ হবে সাক্ষাত্কারের মাধ্যমে। প্রকল্প পরিচালক হবেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

জানতে চাইলে সাবেক সচিব হাবিব উল্লাহ মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসলে এডিপি বাস্তবায়নে কোথায় কোথায় সমস্যা, সেটি কমবেশি সবাই জানেন। কিন্তু উন্নয়ন কর্মকাণ্ড একটা বৃত্তের মধ্যে ঢুকে গেছে। তাই এই বৃত্ত থেকে বের হওয়া অনেক জটিল। ’ তাঁর মতে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, এলজিইডি, গণপূর্তসহ সরকারের অন্যান্য সংস্থার কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ে থেকে প্রকল্প তদারকি করলে সেই প্রকল্পে গতি আসে।

সাবেক এই সচিব আরো বলেন, অনেক পিডি আছেন তাঁর কাজে ভালো করেন। কিন্তু তাঁর ভালোর জন্য পুরস্কারের পরিবর্তে বদলি করা হয়। নতুন একজন এসে বুঝতে অনেক সময় চলে যায়। তাঁর মতে, এসব সমস্যা সমাধান করতে পারলেই এডিপি বাস্তবায়নে গতি আসবে। একই সঙ্গে গুণগত মানও নিশ্চিত হবে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, প্রকল্প পরিচালকদের সংশ্লিষ্ট এলাকায় অবস্থান করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। গত বছরের ১২ মে অনুষ্ঠিত এনইসি সভায় এসংক্রান্ত অনুশাসনও ছিল। একই বছরের ১০ জুলাই এক সভায় পিডিদের এলাকায় থাকতে আবারও নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশ বাস্তবায়নে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। এত কিছুর পরও প্রধানমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রীর নির্দেশ মানছেন না পিডিরা। আইএমইডির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়নে নেওয়া একটি প্রকল্প, কক্সবাজার থেকে দোহাজারী হয়ে ঘুনধুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ, কর্ণফুলী নদীর নিচে টানেল নির্মাণের মতো বড় বড় প্রকল্পের পিডিরা ঢাকায় অবস্থান করছেন।

আইএমইডি সূত্র বলছে, যেকোনো প্রকল্প শুরুর সময় টাকার মারাত্মক সংকট থাকে। সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ সারতে প্রজেক্ট প্রিপারেটরি ফান্ড করার ঘোষণা রয়েছে। কিন্তু সেটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ওই ফান্ডে ১০০ কোটি টাকা রাখা হবে। যে টাকা দিয়ে প্রকল্পের সমীক্ষা, জমি অধিগ্রহণসহ প্রাথমিক কাজগুলো করা হবে। কর্মকর্তারা জানান, ভূমি আইন সংস্কার করার কথা বহু দিন ধরে। কিন্তু সে আইন এখনো সংশোধন হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বিস্তারিত সমীক্ষার নিদের্শনা রয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু এই নির্দেশনাও মানে না মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। ফলে বারবার প্রকল্প সংশোধন করতে হয়। এদিকে গত মঙ্গলবার আইএমইডি থেকে যে ১৮টি সমস্যার কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, বর্তমানে যে প্রক্রিয়ায় প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়, সেটি অনেক পুরনো ফরম্যাটে করা হয়। এটিকে মানসম্মত করার পরামর্শ দিয়েছে আইএমইডি।


মন্তব্য