kalerkantho


ব্যাংকে বাংলা ভাষার ব্যবহার হচ্ছে ইংরেজির পাশাপাশি

শেখ শাফায়াত হোসেন   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ব্যাংকে বাংলা ভাষার ব্যবহার হচ্ছে ইংরেজির পাশাপাশি

অনেক ব্যাংকই সাইনবোর্ডে এখন ইংরেজি নামের পাশাপাশি বাংলা নাম দিচ্ছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

শুধু ভাষার প্রতি ভালোবাসা নয়, সহজ যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবেও বাংলাকে ব্যবহার করছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। গ্রাহকরা যাতে দেখামাত্রই বুঝতে পারে এটা একটি ব্যাংক শাখা, সে জন্য কোনো কোনো ব্যাংক এখন নামফলক বা সাইনবোর্ডে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাও ব্যবহার করছে। সরকারি ব্যাংকগুলো এই দিক দিয়ে এগিয়ে রয়েছে। পিছিয়ে নেই বেসরকারি ব্যাংকগুলোও। কোনো কোনো বেসরকারি ব্যাংক ইংরেজি অক্ষরে লেখা নামের পাশে সমান ফন্টের বাংলা অক্ষরে ব্যাংকের নাম লিখে পরিচিতি বাড়াচ্ছে। কোনো কোনো ব্যাংক এটা করতে এখনো লজ্জা পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, ইংরেজি হরফে লেখা নামের পাশে ছোট্ট করে বাংলা হরফে ব্যাংকের নাম লিখছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যেও দু-একটি ব্যাংক বাংলায় নাম লেখা সাইনবোর্ড টানাতে পারলেও বেসরকারি খাতের সব ব্যাংক এখনো সেটা করে উঠতে পারেনি।

মতিঝিল, গুলশানসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর প্রধান প্রধান সড়কের পাশে নিজস্ব ভবন অথবা ভাড়া করা ভবনে অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখা গড়ে উঠেছে। সারা দেশে ৫৭টি তফসিলি ব্যাংকের শাখা রয়েছে সাড়ে ৯ হাজারের বেশি। শিক্ষিত, স্বল্পশিক্ষিত ও অশিক্ষিত—সব ধরনের গ্রাহক এই শাখাগুলোর মাধ্যমে ব্যাংকিং লেনদেন করছে। গ্রাহকই এসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রাণ, অর্থপ্রবাহের উৎস—এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে গ্রাহকদের কাছে নিজের প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য বাংলায় প্রচার চালাচ্ছে ব্যাংকগুলো।

কয়েক বছর ধরে ব্যাংকের সাইনবোর্ডে ইংরেজি অক্ষরের পাশাপাশি বাংলা অক্ষরেও প্রতিষ্ঠানের নাম লেখার প্রচলন দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর মতিঝিলে বেশ কিছু ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় রয়েছে। এসব ব্যাংকের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, রূপালী, অগ্রণী ও জনতা ব্যাংকের নাম বাংলায় লেখা। বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে সাউথইস্ট ও প্রাইম ব্যাংকের নাম লেখা রয়েছে বাংলায়। অন্য অনেক ব্যাংকের নাম ইংরেজি অক্ষরে লেখা।

গুলশানে এসে দেখা গেল বিদেশি খাতের ‘স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া’ ইংরেজি, বাংলা এবং হিন্দি তিনটি ভাষায়ই নাম লেখে সাইনবোর্ড টানিয়েছে। একই ভবনে বেসরকারি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকও বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় নাম লিখেছে। বেসিক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, আইএফআইসিসহ অনেক ব্যাংকই এখন ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় নাম লিখছে। তবে ইস্টার্ন, ব্র্যাক, সিটি, ট্রাস্টসহ অনেক ব্যাংকের ক্ষেত্রে তেমনটা দেখা যায়নি।

এ ছাড়া ব্যাংকের ভেতরেও ক্যাশ কাউন্টার বা অভ্যর্থনা ডেস্কসহ বিভিন্ন নির্দেশনা ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় লেখা থাকে, যা দেখে সহজেই গ্রাহকরা বুঝতে পারে তাকে কোথায় যেতে হবে। এদিকে আগামী ১ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিটি ব্যাংককে গ্রাহকের হিসাব খোলার জন্য অভিন্ন আবেদন ফরম ও গ্রাহক পরিচিতি সম্পর্কিত ফরম (নো ইওর কাস্টমার-কেওয়াইসি প্রোফাইল ফরম) চালু করতে বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) যে নির্দেশ দিয়েছে, তাতে বলা হয়েছে ফরম বাংলা অথবা ইংরেজি অথবা উভয় ভাষাতেই মুদ্রণ করা যাবে। তবে ফরমে আবশ্যিক ক্ষেত্রগুলোতে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষার প্রচলন বাড়লে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রম, অর্থাৎ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে ব্যাংক খাতের সঙ্গে আরো বেশি হারে যুক্ত করা সম্ভব বলে মনে করতেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। তবে দাপ্তরিক কাজে আইনগত কারণে সব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশেষ করে ব্যাংক গ্রাহকদের কাছে যেসব নোটিশ বা মাসিক বিবরণী পাঠায় এগুলোর বেশির ভাগই থাকে ইংরেজিতে, যা বুঝে উঠতে অনেক শিক্ষিত গ্রাহককেও বেগ পেতে হয়।

ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কয়েক বছর ধরে ঊর্ধ্বতন একটি পদে চাকরিরত মাসুদুর রহমান বিদেশি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডধারী একজন গ্রাহক। তিনি বলেন, ‘প্রতি মাসে আমার কাছে একটি বিবরণী পাঠায় ব্যাংকটি। যার ভাষা ইংরেজি, কিন্তু লেখার ধরন অনেক কঠিন। একটি বাক্য অনেক বড়। একজন শিক্ষিত গ্রাহকের পক্ষেও এর পাঠোদ্ধার কঠিন বলে আমার মনে হয়। তাহলে স্বল্পশিক্ষিত গ্রাহকদের জন্য কি এই ব্যাংকটি ক্রেডিট কার্ড সেবা দিতে চায় না?’

অনেক ব্যাংকই এটিএম সেবায় বাংলা ভাষার সংযোজন করেছে। এর মধ্যে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও ইসলামী ব্যাংক অন্যতম। এ ছাড়া মোবাইল ব্যাংকিং সেবাতেও বাংলা যোগ হচ্ছে। আইএফআইসি ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন পুরোটাই ইংরেজির বিকল্প হিসেবে বাংলা ভাষায় করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

মেঘনা ব্যাংকের এমডি ও সিইও মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, ‘যেহেতু আমরা এখন শহরের সঙ্গে আনুপাতিক হারে গ্রামেও শাখা খুলছি, আমাদের উদ্দেশ্যই ব্যাংককে সব শ্রেণির মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া, সেহেতু ব্যাংক সেবায় বাংলা ভাষার প্রচলন বাধ্যতামূলক করাই উচিত। এখন বাংলাদেশ ব্যাংকও আমাদের অনেক চিঠি বাংলাতেই লেখে। আমরা অনেক ক্ষেত্রে চিঠির জবাবগুলো ইংরেজিতে দিতে বাধ্য হই। তবে গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগে আমার মনে হয় বাংলা ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এ বিষয়টি সব ব্যাংকের জন্য বাধ্যতামূলক করে তবে আমাদের মানতে আপত্তি নেই। ’

ব্যাংক খাত বিশ্লেষক মামুন রশিদ বলেন, ‘ব্যাংক সেবার সব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহারের সুযোগ নেই। কেননা এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক লেনদেন হয়। তবে গ্রাহককে যেসব বিবরণী পাঠানো হয় সেগুলো বাংলায় করা যেতে পারে। ’

 


মন্তব্য