kalerkantho


বাংলাদেশের পরিবর্তনে মুগ্ধ এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট

উন্নত দেশে যেতে পাঁচ বাধা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



উন্নত দেশে যেতে পাঁচ বাধা

গ্রামীণ মেঠোপথের দুই ধারে সারি সারি গাছ, মসৃণ সড়ক, অসম্ভব সুন্দর ফুলের বাগান, নারীদের কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে চলা—গ্রামবাংলার এমন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনে মুগ্ধ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়েনচাই ঝাং। তিন দিনের ঢাকা সফর শেষে বিদায় বেলায় গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সম্পর্কে মূল্যায়ন করলেন এভাবে, ‘বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে নারীরা কর্মক্ষেত্রে অনেক এগিয়েছে। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, পোশাক কারখানায় নারীদের প্রচুর কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলেও নারীদের কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। গ্রামীণ সড়ক, স্বচ্ছ ফুল, শীতের সবজির বৈচিত্র্য দেখে সত্যিই চোখ জুড়িয়ে গেছে। ’

ওয়েনচাই ঝাং বলেন, ‘প্রথম ২০১২ সালে বাংলাদেশ সফরে এসেছি; এরপর ২০১৫ সালে। এবারসহ মোট তিনবার এ দেশে এসেছি। গত পাঁচ বছরে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। ’ তিন দিনের সফরে ‘যানজট’ যে বেশ ভুগিয়েছে, সেটিও বলতে ভোলেননি এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট। সরকার মধ্যম ও উন্নত বিশ্বের কাতারে পৌঁছানের যে স্বপ্ন দেখছে, সেখানে যেতে পাঁচটি বাধা দেখছেন ওয়েনচাই ঝাং। আরো বললেন, অবকাঠামো, গ্যাস-বিদ্যুৎ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন—এই পাঁচটি খাতে বেশ পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।

এই পাঁচটি খাতে উন্নতি করতে পারলে মধ্যম ও উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছাতে সক্ষম হবে বলে মন্তব্য করেন ওয়েনচাই ঝাং।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সফরে আসেন এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট। সফরকালে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। একই সঙ্গে এডিবির অর্থায়নে যেসব প্রকল্প চলমান আছে, তার মধ্যে কয়েকটি পরিদর্শন করেন তিনি। বিদায়ের আগে সংবাদ সম্মেলনে তিন দিনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘যেখানেই কথা বলেছি, চাকরির কথা শুনেছি। সবাই কর্মসংস্থান চায়। এটি নিশ্চিত করতে হবে। আর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে মানবসম্পদ উন্নয়ন ঘটাতে হবে। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ কর্মসংস্থান তৈরিতে কারিগরি শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি। ’ তিনি বলেন, বাংলাদেশে বেশির ভাগই তরুণ। বুড়োদের হার খুবই কম। তরুণরা চাকরি চায়। আর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়নে এডিবি সহযোগিতা করতে চায়। সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে ঢাকায় নিযুক্ত এডিবির আবাসিক প্রধান কাজুহিকো হিগুইচি উপস্থিত ছিলেন।

এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্টের মতে, ভৌগোলিক কারণে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্য আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা জরুরি। আঞ্চলিক যোগাযোগের গুরুত্ব অনুধাবন করে এডিবি এরই মধ্যে এই খাতে অর্থায়ন শুরু করেছে। বাংলাদেশের মানুষ অনেক কর্মঠ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গ্রামীণ মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে আমরা নজর দিয়েছি। ১৫ বছর মেয়াদি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে শহরের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ মানুষেরও জীবন-জীবিকার উন্নতি করতে হবে। না হলে এসডিজি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। ’ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের একটি। বিষয়টি তিনি নিজেও জানেন উল্লেখ করে ওয়েনচাই ঝাং বলেন, এখানে প্রতিবছর ঝড়, জলোচ্ছ্বাস লেগেই থাকে। সিডর, আইলায় অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। সে জন্য এখানে জলবায়ুসহিষ্ণু অবকাঠামো নির্মাণ জরুরি। এডিবি সেই খাতে সহযোগিতা করতে চায়।

উন্নয়নের পথে কী কী বাধা আছে সেটি উল্লেখ করে ওয়েনচাই ঝাং বলেন, জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। সঙ্গে সরকারি বিনিয়োগও। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিবেশ সূচকেও অগ্রগতি আনতে হবে। দেশি ও বিদেশি ব্যবসায়ীরা এখানে যাতে সহজে ব্যবসা করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশে দক্ষতার অভাব আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিবছর এডিবির অর্থ সহায়তা বাড়ছে। আগে প্রতিবছর ১১০ কোটি ডলারের মতো দেওয়া হতো। এটি বেড়ে ১৫০ কোটি ডলারের বেশি হবে। সামনের দিনগুলোতে এডিবির সহযোগিতা বাড়বে। সে জন্য প্রকল্পের বাস্তবায়ন দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।  

ওয়েনচাই ঝাং বলেন, সরকার ২০২১ সাল নাগাদ মধ্যম আয়ের দেশ আর ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশের কাতারে যেতে চায়। সেটি বাস্তবায়ন করতে হলে সড়ক, সেতু, রেলসহ জ্বালানি খাতে জোর দিতে হবে। মানবসম্পদ উন্নয়নও জরুরি। ভারতের কাছ থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে এডিবি ঋণ দিয়েছে। পরিবেশের দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশের জন্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কতটা জরুরি—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘জ্বালানি খাতে সরকার বৈচিত্র্য আনতে চায়। শুধু গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, এর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে ঝুঁকছে। তবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে হলে অবশ্যই পরিবেশের দিকটা মাথায় রাখতে হবে। যতটুকু শুনেছি, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সরকার সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলেছে। এটি নিশ্চিত করা গেলে পরিবেশের ওপর ঝুঁকি কমবে। ’

ওয়েনচাই ঝাং বলেন, ‘গ্রামে রাস্তাঘাট ভালো হওয়ায় কৃষকরা তাদের পণ্য সহজে বাজারে নিতে পারছে। আমার কাছে বিষয়টি বেশ ভালো লেগেছে। তবে ঢাকার যানজট বেশ ভুগিয়েছে। এদিকেও সরকারের নজর দেওয়া উচিত। ’


মন্তব্য