kalerkantho


জনবান্ধব কর প্রশাসন নির্মাণ সম্মেলনে ড. ফরাস উদ্দিন

কৃষিতে কর আরোপের সময় এসেছে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



কৃষিতে কর আরোপের সময় এসেছে

কৃষিতে কর আরোপের পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারপারসন ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর অফিসার্স ক্লাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয়োজিত  উপকর কমিশনার সম্মেলন ১৭-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ পরামর্শ দেন।

বক্তৃতায় এই অর্থনীতিবিদ বলেন, কৃষি এখন আর শুধু প্রান্তিক কৃষকের বেঁচে থাকার অবলম্বন নয়। বিগত কয়েক বছর থেকে নতুন অনেক প্রতিষ্ঠান কৃষিতে যোগ দিয়ে ভালো করছে। কৃষিতে আধুনিকতা এসেছে। কৃষিতে করারোপের সময় হয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান। ড. ফরাসউদ্দিন সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে ‘জনবান্ধব আধুনিক কর প্রশাসন বিনির্মাণ : আমাদের উদ্যোগ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (ঢাকা) কমিশনার মো. আলমগীর হোসেন। জনবান্ধব আধুনিক কর প্রশাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রথমবারের মতো এনবিআর ‘উপকর কমিশনার সম্মেলন’ আয়োজন করেছে।

এডিআর (বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি) নিয়ে এনবিআরকে নতুনভাবে ভাবতে হবে—এমন মত জানিয়ে ড. ফরাসউদ্দিন আরো বলেন, সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব আটকে আছে অনিষ্পত্তি হওয়া মামলায়। বিষয়টি এনবিআর কর্মকর্তাদের আরো ভালোভাবে বুঝতে হবে।  

সাবেক এই গভর্নর বলেন, ভবিষ্যতে বাজেট আরো বড় হবে। এডিআরের মাধ্যমে এনবিআর বড় বাজেট বাস্তবায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এতে দেশের উন্নয়ন হবে। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হবে।

মোবাইলে অর্থ লেনদেনে গ্রাহকের কাছ থেকে বেশি হারে টাকা নেওয়ার সমালোচনা করে ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং নিয়ে তামাশা হচ্ছে। কম্পানিগুলো এক ধরনের প্রতারণা করছে। ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে কয়েক গুণ বেশি অর্থ কাটছে। বিষয়টি নিয়ে আর সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। এখনই এনবিআরের বিবেচনায় আনা উচিত। জনগণের সঙ্গে প্রতারণা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া উচিত নয়।

ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, ‘মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ১০০ টাকা পাঠাতে লাগে এক টাকা ৮৬ পয়সা। মতলবটা কত বদ আপনি চিন্তা করেন। এক টাকা ৮৬ পয়সা মানেই দুই টাকা। দুই টাকা দিয়ে যিনি পাঠাবেন তার তো অ্যাকাউন্ট নেই। ’ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে মোবাইল ব্যাংকিং সম্পর্কে তাঁর এই ধারণা হয়েছে জানিয়ে ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, ‘ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠাতে যদি ১০০ টাকায় মাত্র ৪০ পয়সা লাগে, তাহলে মোবাইল ট্রান্সফারে কেন এক টাকা ৮৬ পয়সা বা দুই টাকা লাগবে? কিন্তু বিদেশিরা ধন্য ধন্য দিচ্ছে আমাদের মোবাইল ব্যাংকিং চলছে। এগুলো খুব ভালো করে চিন্তা-ভাবনা করে সরকারকে বুঝতে হবে। ওই জায়গায় হাত দিতে হবে। ’

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘মোবাইল ব্যাংকিং সিস্টেমের ফলে বিদেশি কম্পানিগুলো লাভবান হচ্ছে। আমাদের সম্পদ বিদেশে চলে যাচ্ছে। এসব বন্ধ করতে হবে। ’

গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবের গোপনীয়তা রক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে ফরাসউদ্দিন বলেন, ‘প্রয়োজন না হলে কোনো গ্রাহকের ব্যাংক হিসাব দেখা উচিত নয়। কেবল সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে দেখা যেতে পারে। এটা মানুষের আমানত, তা রক্ষা করতে হবে।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের একজন মানুষের মাথাপিছু গড় আয় ছিল ৬৮৭ টাকা—এমন তথ্য দিয়ে ফরাসউদ্দিন বলেন, এখন একজন নাগরিকের মাথাপিছু আয় এক লাখ তিন হাজার ৮৭৬ টাকা। অর্থনীতির পরিধি বেড়েছে ১৭৪ গুণ। মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৭৫ ভাগ। ১৯৭২ সালে কর আদায় হয়েছে ১৬৬ কোটি টাকা। বাজেট ছিল ৭৮২ কোটি টাকার। অথচ আজকে বাজেট আড়াই লাখ কোটি টাকার।

এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, এ বিষয়ে আরো প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আইনি সহায়তা দিয়ে সাহায্য করতে হবে। এডিআর থেকে সরে বা পিছিয়ে না আসার পরামর্শ দেন ব্যবসায়ী এই নেতা। তিনি আরো বলেন, এমন একটা সময় ছিল যখন এনবিআরের  লোকজন দেখলে মানুষ ভয় পেত। আজ এ পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে।

সম্মেলনে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, দেশের মোট কর রাজস্বের ৯৫ শতাংশ এবং মোট রাজস্বের প্রায় ৮৬ শতাংশ সংগ্রহ করছে এনবিআর। জোগান দিচ্ছে জাতীয় বাজেটের প্রায় ৬০ শতাংশ।

একসময় এনবিআর আয়কর থেকে সংগ্রহ করত মোট রাজস্বের ১০ শতাংশেরও কম। বিভিন্ন সংস্কারের মাধ্যমে এনবিআরের নানামুখী পদক্ষেপের ফলে বর্তমানে এ উৎস থেকে আয়ের পরিমাণ ৩৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০২০-২১ সালে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে এনবিআর। করদাতা, ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ফলে আয়কর খাত রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সম্ভাবনাময় হয়ে উঠেছে। এ জন্য নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন গঠনমূলক কর্মসূচি। প্রথমবারের মতো উপকর কমিশনার সম্মেলন জনমুখী কর প্রশাসনের আরেকটি নতুন অভিযাত্রা।


মন্তব্য