kalerkantho


সরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাদের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সচিব

ভালো ঋণগ্রহীতা পেতে দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভালো ঋণগ্রহীতা পেতে দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে

রূপালী ব্যাংকের বার্ষিক ব্যবসায়িক সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। ছবি : কালের কণ্ঠ

দেশে কার্যরত সরকারি ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। বর্তমানে সামগ্রিক ব্যাংক খাতে যে পরিমাণ খেলাপি ঋণ রয়েছে তার বেশির ভাগই সরকারি ব্যাংকগুলোর। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে হলে ঋণের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। আর এ জন্য ব্যাংক কর্মকর্তাদের উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। ঋণ বিতরণ বাড়াতে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে প্রতিযোগী ভাবতে হবে। ঋণগ্রহীতাকে দেখলে বেসরকারি কর্মকর্তারা যেভাবে এগিয়ে এসে স্বাগত জানান, সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদেরও একই রকম আচরণ করতে হবে। কাজ না করলে সরকারি ব্যাংকের চাকরি যাবে না, মাস শেষে ঠিকই বেতন পেয়ে যাব—এমন মানসিকতা পরিহার করতে হবে। তা ছাড়া আগের কর্মকর্তার বিতরণ করা ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে ওই সব খেলাপি ঋণও আদায় করতে চেষ্টা করতে হবে।

গতকাল ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের ‘বার্ষিক ব্যবসায়িক সম্মেলন ২০১৭’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. ইউনুসুর রহমান এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির।

গভর্নর ফজলে কবিরও সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ঋণ ঝুঁকি কমিয়ে আনার পাশাপাশি এ খাতের ব্যাংকগুলোকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে ঋণ বিতরণ বাড়াতে বলেন। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ঋণ বা ভোক্তা ঋণের মতো এসএমই ঋণের ক্ষেত্রেও জামানতবিহীন ঋণ দিতে পরামর্শ দেন তিনি। সে ক্ষেত্রে দক্ষ এসএমই উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ সনদকেই জামানত হিসেবে বিবেচনা করার পরামর্শ দেন গভর্নর। তিনি বলেন, এসএমই খাতে অনেক উদ্যোক্তা আছে যারা জামানতের জন্য ঋণ নিতে পারছে না। তাই দক্ষ উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ সনদকে জামানত হিসেবে বিবেচনা করে ঋণ দেওয়া যেতে পারে। কনজ্যুমার ঋণে যদি স্যালারি স্টেটমেন্ট জামানত হিসেবে ব্যবহার হয়, তাহলে দক্ষ উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ সনদ কেন জামানত হতে পারবে না।

সরকারি ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি তুলে ধরতে গিয়ে গভর্নর বলেন, ‘গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতে ৬৫ হাজার ৭৩১ কোটি টাকার ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। যা বিতরণ করা ঋণের ১০.৩৪ শতাংশ। এর মধ্যে ২২ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা অর্থাৎ ৩৩.৯ শতাংশ খেলাপি ঋণ সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী এই চার ব্যাংকের। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ সোনালী ব্যাংকের, ২৭ শতাংশ। অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৫.৬২ শতাংশ। রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১৮.৭ শতাংশ, যা জনতা ব্যাংকের থেকে বেশি। ’

মো. ইউনুসুর রহমান বলেন, ‘সরকারি ব্যাংকে কোনো কোনো শাখায় জনবল প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। আবার গ্রামের শাখাগুলোতে ১০ জন কর্মকর্তার জায়গায় তিনজন কর্মকর্তা দিয়ে ব্যাংক চালানো হচ্ছে। এই সমস্যা দূর করতে হবে। তা ছাড়া ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের জন্য তহবিল পাওয়া যায় না। অথচ ব্যাংকের অলস তারল্য পড়ে থাকে, ঋণ দেওয়ার লোক পাওয়া যায় না। এটা চলতে পারে না। ’

অনুষ্ঠানে উপস্থিত রূপালী ব্যাংকের ৫৬২টি শাখার প্রধানদের উদ্দেশে চেয়ারম্যান মনজুর হোসেন বলেন, ‘ব্যাংকের কার্যক্রমে গতি আনতে আমরা আপনাদের সহযোগিতা চাই না। আমরা চাই ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পক্ষ থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হবে সেটা আপনারা নিজেদের দায়িত্ব বলে মনে করবেন। তাহলেই ব্যাংকটি এই বছরের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। ’

স্বাগত বক্তব্যে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আতাউর রহমান প্রধান বলেন, ‘প্রতিষ্ঠার পর রূপালী ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে যাবে, এমনটাই ভাবা হতো। তবে মাঝখানে বেশ কিছুকাল এই ব্যাংকটি কিছুটা দীনতার মধ্য দিয়ে গেছে। এখন ব্যাংকটি আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ২০১৫ সালে ব্যাংকটি লাভজনক না থাকার পরও মুনাফা দেখানো হয়েছে। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে এসে ব্যাংকটি ২৪৪ কোটি টাকা লোকসানে পড়ে। ২০১৬ সাল শেষে এই লোকসান কমে ৫২ কোটিতে নেমে এসেছে। লোকসানি শাখার সংখ্যাও ১৪৪ থেকে কমে ৮০-তে নেমে এসেছে। গত বছর আমাদের ১৫০ কোটি টাকার মতো অতিরিক্ত বেতন দিতে হয়েছে, সেটাও লোকসানের একটি কারণ। ’

তিনি আরো বলেন, ‘রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অনেক বেড়ে গিয়েছিল। এখন সেটা কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে আমরা ব্যাংকের ১০টি বিভাগীয় অঞ্চলের প্রধানদের নিয়ে বৈঠক করে নির্দেশনা দিয়েছি। নতুন বিতরণ করা ঋণের মান বজায় রাখার চেষ্টা করছেন তাঁরা। তবে রূপালী ব্যাংকের ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সীমা বেঁধে দেওয়া আছে। ’ সেটা বাড়িয়ে ২২ শতাংশ করার দাবি জানান তিনি।

বর্তমানে সামগ্রিক ব্যাংক খাতের গচ্ছিত আমানতের ২৬ শতাংশ সরকারি চার ব্যাংকের (সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী) নিয়ন্ত্রণে। মোট ঋণের ১৭ শতাংশ বিতরণ করেছে এই চারটি ব্যাংক। দেশে কার্যরত ৫৬টি ব্যাংকের দেশব্যাপী ৯ হাজার ৬৫৪টি শাখার মধ্যে এই চারটি ব্যাংকের শাখা রয়েছে তিন হাজার ৬০৩টি। যা মোট শাখার ৩৭ শতাংশ।

অনুষ্ঠানে রূপালী ব্যাংকের পরিচালক অরিজিৎ চৌধুরী, অধ্যাপক ড. হাসিবুর রশিদ, আবদুল বাসেত খান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ফজলুল হক প্রমুুখ বক্তব্য দেন।


মন্তব্য