kalerkantho


৬ মাসে ২৩৪৭৩ কোটি টাকা নিট বিনিয়োগ সঞ্চয়পত্রে

শেখ শাফায়াত হোসেন   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



৬ মাসে ২৩৪৭৩ কোটি টাকা নিট বিনিয়োগ সঞ্চয়পত্রে

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের শঙ্কা কাটেনি। ব্যাংকের আমানতের সুদের হার নিম্নমুখী। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগের আশায় অনেকেই ঝুঁকছেন সঞ্চয়পত্রে। ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে উল্লম্ফন দেখা গেলেও চলতি অর্থবছরে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে যে পরিমাণ ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) তার চেয়েও ২০ শতাংশ বেশি বিনিয়োগ এসেছে এই খাত থেকে। এই বিনিয়োগ আগের অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আসা নিট বিনিয়োগের প্রায় দ্বিগুণ।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ এসেছে ২৩ হাজার ৪৭৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যা গোটা অর্থবছরের জন্য সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ১১৯.৭০ শতাংশ। অর্থবছরের পুরো সময়ের জন্য সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ এসেছে প্রায় দ্বিগুণ। গত অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে নিট বিনিয়োগ ছিল ১৩ হাজার ৩০৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। সেই হিসাবে চলতি অর্থবছরের ছয় মাসে প্রায় ১০ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা বেশি ঋণ এসেছে সঞ্চয়পত্র থেকে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সব ধরনের সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে মোট ৩৩ হাজার ৭৪৩ কোটি ২৮ লাখ টাকার। এই সময়ে সঞ্চয়পত্র ভাঙিয়ে নেওয়ার ফলে মূল বাবদ সরকারকে পরিশোধ করতে হয়েছে ১০ হাজার ২৬৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা। আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের মুনাফা বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে ছয় হাজার ৯৫৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা। নিট বিনিয়োগ দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৪৭৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের মূল ও মুনাফা পরিশোধের পর যে পরিমাণ অর্থ অবশিষ্ট থাকে তাকে বলা হয় নিট বিনিয়োগ। বিনিয়োগের ওই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতি মাসে মুনাফা দিতে হয়। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর মাসে তিন হাজার ১৫৪ কোটি টাকা নিট বিনিয়োগ এসেছে সঞ্চয়পত্র থেকে। তবে গত নভেম্বরে নিট বিনিয়োগ আরো বেশি ছিল। ওই মাসে সঞ্চয়পত্র থেকে নিট বিনিয়োগ এসেছিল চার হাজার ৪০৩ কোটি টাকা, একক মাস হিসেবে যা রেকর্ড।

বেশি মুনাফাপ্রাপ্তিকেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের এই উল্লম্ফনের প্রধান কারণ মনে করছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। তা ছাড়া নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাওয়াটাও একটি বড় কারণ বলে তাঁরা মনে করছেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক ও অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মূলত ব্যাংকের আমানতের সুদহার কমে যাওয়ার কারণেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়ছে। পুঁজিবাজার যদি স্থিতিশীল হয় তাহলে হয়তো সেখানে কিছু বিনিয়োগ যাবে। ’ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়ায় সামাজিক কিছু সুবিধা থাকলেও সরকারের সুদ পরিশোধজনিত ব্যয়চাপ বাড়ে বলেও উল্লেখ করেন অর্থনীতির এই গবেষক। তা ছাড়া ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ কমে যাওয়ায় বাজারে মুদ্রার সরবরাহ কমে যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

দেশে কার্যরত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে স্থায়ী আমানত রাখলে গড়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশ হারে সুদ পাওয়া যাচ্ছে, যা সঞ্চয়পত্রের সুদের তুলনায় অনেক কম। ২০১৫ সালের মে মাসে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদ বা মুনাফা গড়ে ২ শতাংশ হারে কমানোর পরও সব স্কিমের বিপরীতে এখনো ১১ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত সুদ পাওয়া যাচ্ছে।

সম্প্রতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণাকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, সরকার এখন সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ বেশি নিচ্ছে। তাতে সরকারের সুদব্যয় কিছুটা বাড়লেও সমাজে এর ইতিবাচক ফল রয়েছে। তবে অন্যান্য সঞ্চয়ী স্কিমের তুলনায় সঞ্চয়পত্রের মুনাফার উচ্চ হারের কারণে দেশের বন্ডবাজার বিকাশে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) ড. মোজাফফর আহমদ চেয়ার অধ্যাপক খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা বেশি থাকায় স্বল্প আয়ের লোকজন ও অবসরে যাওয়া বৃদ্ধরা এক ধরনের সামাজিক সুরক্ষা পাচ্ছে। সেদিক থেকে সুদব্যয় বাড়লেও এটা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের সীমা সঠিকভাবে পরিপালন হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

২০১৫-১৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিল ১৫ হাজার কোটি টাকা। ওই বছর সুদের হার কমানোর পরও সঞ্চয়পত্র বিক্রি না কমায় সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ২৮ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়। অর্থবছর শেষে দেখা যায়, সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ৩৩ হাজার ৬৮৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঋণ এসেছে।

দেশি-বিদেশি উভয় উৎস থেকেই ঋণ নিয়ে  বাজেট ঘাটতি মেটায় সরকার। অভ্যন্তরীণ উেসর মধ্যে আগে বেশি ঋণ আসত ব্যাংকব্যবস্থা থেকে। সাম্প্রতিককালে বেশি ঋণ আসছে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে। ব্যাংকবহির্ভূত উেসর মধ্যে রয়েছে এই সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য কিছু বন্ড।


মন্তব্য